আবার ঘুমোতে চেষ্টা করলেন তিনি। হেলানো সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বুঝলেন। খুব স্বস্তি পেলেন না। তাঁর ভিতর থেকে কে যেন বলছে–ঠিকই শুনেছিলে। বাঁশি বেজেছিল।
এবার তিনি মৃদু হাসলেন। মাথা নাড়ালেন আপন মনে। জানেন, তিনি জানেন। নিয়মভঙ্গের জন্য কোথাও কে যেন বাঁশি বাজিয়েছে। ঠিক কখন নিয়মভঙ্গ ঘটেছে তা তিনি জানেন না। ফাউল? না হ্যান্ডবল? অফসাইড নয় তো?
এসব নয়। তিনি তা জানেন। খেলার মাঠটা আর ছোট থাকছে না। বড় ছড়িয়ে পড়ছে এবার। বিশাল তার পরিধি। সারা পৃথিবীময় আকাশময়, খেলাও এবার কত বিচিত্র! কত নিয়ম, কত অনিয়ম! অলীক রেফারি তাঁকে জানিয়ে দিচ্ছে, সতর্ক করছে।
প্রসন্ন মনে তিনি মাথা নাড়লেন।
খেলার ছল
মিঠুর গোলগাল মোটামোটা দুটো পায়ের একটা জীবনের বুকের ওপর, আর একটা তার শোয়ানো হাতে। তার বুকের ওপর কাত হয়ে শুয়েছে মিঠু, ঘাড়ের কাছে মাথা আর ল্যাভেন্ডারের গন্ধময় চুল। জীবন কানের ওপর মিঠুর দুরন্ত শ্বাস-প্রশ্বাস আর কবিতা–আবৃত্তি শুনতে পাচ্ছিল : ‘ঝরনা তোমার স্ফটিক জলের স্বচ্ছ ধারা, তাহারি মাঝারে দেখে আপনার সূর্যতারা। তারি একধারে আমার ছায়ারে আনি মাঝে-মাঝে দুলায়ো তাহারে, তারি সাথে তুমি হাসিয়া মিলায়ো কলধ্বনি…’ একটা ছোট নরম হাতে মিঠু তার বাবার গাল ধরে মুখটা ফিরিয়ে রেখেছে তার দিকে। জীবন অন্যমনস্ক ভাব দেখালেই মুখ টেনে নিয়ে বলছে ‘শোনো না বাবা!’
মিঠুর ভারী শরীর, নরম তুলতুলে। বুকের ওপর যেখানে মিঠুর পা সে জায়গাটা অল্প ধরে আসছিল জীবনের। পা-টা একবার সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে মিঠু দাপিয়ে উঠল। পরমুহূর্তেই উঠে এল জীবনের বুকের ওপর, দুই কনুইয়ের ভর রেখে জীবনের মুখের দিকে চেয়ে হেসে হঠাৎ অকারণে ডাকল ‘বাবা!’
‘উ’।
‘তুমি শুনছ না।’
‘শুনছি মা-মণি।’ জীবন চোখ খুলে তার ছয় বছরের শ্যামবর্ণ মেয়েটির দিকে তাকালে হঠাৎ তার বুক কানায়-কানায় ভরে ওঠে। চুলে ল্যাভেন্ডারের গন্ধ, চোখে কাজল, মুখে অল্প পাউডারের ছোপ–এত সকালেই মেয়ে সাজিয়েছে অপর্ণা। না সাজালেও মিঠুকে দেখতে খারাপ লাগে না। কী বড়-বড় চোখ, আর কী পাতলা ঠোঁট মিঠুর! জীবন মিঠুকে আবার দু-হাতে আঁকড়ে ধরে বলে, ‘তোমার কবিতাটা আবার বলল ।’ মিঠু সঙ্গে-সঙ্গে দুলে ওঠে, ‘ঝরনা তোমার স্ফটিক জলের স্বচ্ছ ধারা…’ শুনতে-শুনতে সকালের গড়িমসির ঘুম–ঘুম ভাবটা আবার ধীরে-ধীরে জীবনকে পেয়ে বসতে থাকে। বলতে কি সারাদিনের মধ্যে মিঠু আর তার বাবাকে নাগালে পায় না, সকালের এটুকু সময় ছাড়া। তাই এটুকুর মধ্যেই সে পুষিয়ে নেয়। ধামসে, কামড়ে, কবিতা বলে, গান গেয়ে বাবার আদর কেড়ে খায়। জীবনের মাঝে-মাঝে বিশ্বাস হতে চায় না যে এই সুন্দর, সুগন্ধী মেয়েটা তার!
মাঝখানের ঘর থেকে অপর্ণার গলা পাওয়া যাচ্ছিল। চাপা গলা, কিন্তু রাগের ভাব। মিঠু মাথা উঁচু করে মায়ের গলা শুনবার চেষ্টা করে বাবাকে চোখের ইংগিত করে বলল , ‘মা!’ নিঃশব্দে হাসল ‘মা আদিকে বকছে। রোজ বকে।’ জীবন নিস্পৃহভাবে বলে ‘কেন’! মিঠু মাথা নামিয়ে আনল জীবনের গলার ওপর, তার থোকা থোকা চুলে জীবনের মুখ আচ্ছন্ন করে দিয়ে বলল , ‘আতরদি রোজ কাপডিশ ভাঙে। সকালে দেরি করে আসে। মা বলে ওকে ছাড়িয়ে দেবে। বলতে-বলতে টপ করে জীবনের বুক থেকে পিছলে নেমে যায়, মশারি তুলে মেঝেয় লাফিয়ে পড়ে। জীবন ওকে ধরবার জন্য হাত বাড়িয়ে বলে ‘কোথায় যাচ্ছ, মা-মণি!’ দরজার কাছে এক ছুটে পৌঁছে গিয়ে মিঠু ঘাড় ঘুরিয়ে বলে ‘দাঁড়াও, দেখে আসি।’
গোয়েন্দা! এই মেয়েটা তার পুরোপুরি গোয়েন্দা। বাড়ির সমস্ত খবর রাখে, আর সকালে বাবাকে একা পেয়ে সব খবর চুপিচুপি বলে দেয়। বিশেষত অপর্ণার খবর। মিঠু তার সহজ বুদ্ধিতে বুঝে গেছে যে, বাবা মায়ের খবরটাই বেশি মনোযোগ দিয়ে শোনে। গতকাল তাদের মোটরগাড়িটার জ্বর হয়েছিল কিনা, কিংবা তিনশো ছিয়ানব্বই নম্বর বাড়িতে কুকুরটার কটা বাচ্চা হল এসব খবরে বেশি কান দেয় না। মিঠুর উলটো হচ্ছে মধু–জীবনের তিন বছর বয়সের ছোট মেয়ে। সে মায়ের আঁচল ধরা। জীবনকে চেনে বটে, কখনও-সখনও কোলেও আসে কিন্তু থাকতে চায় না। দুই মেয়ের কথা ভাবতে-ভাবতে জীবন উঠে সিগারেট ধরাল। মাথা ধরে আছে কাল রাতের হুইস্কির গন্ধ এখনও যেন ভেঁকুরের সঙ্গে অল্প পাওয়া যাচ্ছে। কেমন ঘুমে জড়িয়ে আছে চোখের পাতা। কিছুতেই মনে পড়ে না কাল রাতে ‘বার’ থেকে কী করে সে ঘরের বিছানা পর্যন্ত পৌঁছোতে পেরেছিল। কোনওদিনই মনে পড়ে না। কাল বিকেলে কারখানা থেকে তার ড্রাইভার তাকে ‘বার’ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গাড়ি নিয়ে ফিরে এসেছিল। বার–এ দেখা হয়েছিল দুজন চেনা মানুষের সঙ্গে। আচার্য আর মাধবন। তারপর!’
মিঠু ছোট পায়ে দৌড়ে এসে মশারি তুলে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল জীবনের কোলে। হাঁফাচ্ছে। এত বড়-বড় চোখ গোল করে বলল , ‘আমাদের বেড়ালটা না বাবা ফ্রিজের মধ্যে ঢুকে ছিল। মরে কাঠ হয়ে আছে।’ একটু অবাক হয়ে জীবন বলল , ‘সে কী!’ তার হাত ধরে টানতে-টানতে মিঠু বলল , ‘চলো দেখবে। নইলে এক্ষুনি আতরদি ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসবে।’ কৌতূহল ছিল। না, তবু মিঠুকে এড়াতে পারে না জীবন, তাই হাই তুলে বিছানা ছাড়ল।
