বলতে-বলতে তিনি চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ করলেন, তাঁর দেহরক্ষী অধৈর্য হয়ে পড়ছে, এগিয়ে আসতে চাইছে। উটকো এই লোকটা যদি কোনও বেতাল নড়াচড়া করে তবে তাঁর দেহরক্ষী ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
তিনি তাই তাড়াতাড়ি বললেন–আপনি অটোগ্রাফ চাইছিলেন না?
–হ্যাঁ। হ্যাঁ। বলে লোকটা একটা দশ টাকার নোট বের করে পকেট থেকে। একটা ডটপেনও।
তিনি দশ টাকার নোটটা নিয়ে পকেটে ভরে নিশ্চিন্তে হাঁটতে লাগলেন। এ রকম মজা তিনি। প্রায়ই করেন। লোকটা চোরের মতো পিছু পিছু আসছে আর মাঝে-মাঝে হেঁ–হেঁ শব্দ করছে।
তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন–টাকাটার জন্য ধন্যবাদ। এটা দিয়ে আমার বাল বাচ্চার জন্য কিছু কিনে নিয়ে যাব।
লোকটা হাত কচলে বলে–সম্রাট, আপনাকে আমার কিছুই দেওয়ার থাকতে পারে না। আমি কী দেব আপনাকে? দয়া করে আমাকে লজ্জা দেবেন না।
তিনি হাসলেন। তোলা হাঁটুতে নোটটা রেখে ডটপেন দিয়ে বারো অক্ষরের নাম সই করে দিলেন অভ্যস্ত দ্রুত বেগে।
তারপর সামান্য ক্লান্তি ও গরম বোধ করে ফিরে এলেন ঘরে। স্ত্রী এমন চমৎকারভাবে সেজেছেন। অপেক্ষা করছেন প্রাতঃরাশের জন্য। তিনি স্ত্রীকে একটু চুমু খেলেন। স্ত্রী উজ্জ্বল মুখ করে তাকালেন তাঁর দিকে। সেই চোখের দৃষ্টিতে সুগভীর তৃপ্তি ও অহংকার তাঁর স্বামীকে নিয়ে।
স্ত্রী বললেন–ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে এত খেলার ধকল এবার সত্যিই শেষ হচ্ছে।
তিনি বিছানায় শুয়ে থেকে বললেন হ্যাঁ। আজ আমার শেষ খেলার আগের খেলাটি।
–তুমি কি নামবে মাঠে?
–নিশ্চয়ই?
–খুব সাবধান। এদের মাঠ ভালো নয় শুনেছি।
তিনি হাসলেন। বললেন–আমিও শুনেছি। তুমি কিন্তু অকারণে দুশ্চিন্তা কোরো না। এটা আর একটা খেলা মাত্র। খেলাই, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। যুদ্ধে সৈন্যরা এর চেয়ে অনেক শক্ত কাজ করে।
প্রাতঃরাশের পর তিনি ঘুমোলেন।
বেশিক্ষণ নয়। একটু বাদেই দরজায় টোকার শব্দ। বিশিষ্ট লোকরা আসছেন। ফোনে খবর নিচ্ছেন। অন্য সব খেলোয়াড়রা দেখা করতে চাইছে। আসছে সাংবাদিক, ফোটোগ্রাফার, টি ভি বা রেডিওর লোক, আসছে ম্যাসাজ করতে মেসেউয়ার।
তাঁর স্ত্রী বহুক্ষণ এই ভিড় ঠেকিয়ে রাখলেন, আর ভিড় ঠেকাল তাঁর মজবুত দেহরক্ষী। তবু এক সময়ে তাঁকে উঠতে হয়। হাসতে হয়। কথা বলতে হয়।
দুপুর গড়াতে না গড়াতে খেলা–পাগল এক শহর ভেঙে পড়ে স্টেডিয়ামে। কী গভীর আনন্দের চিৎকারে ভরে ওঠে পরিমণ্ডল।
তিনি মাঠে নামেন এগারো জনের সঙ্গে। সবই অভ্যস্ত তাঁর। সেই জয়ধ্বনি, ক্যামেরা, ভিড়।
তারপর সব সরে যায়। হঠাৎ দেখেন, তিনি স্বক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছেন। দাবার খুঁটির মতো সাজানো বাইশজন খেলোয়াড় দুদিকে। মাঝখানে সেই ফুটবল। পৃথিবীর মতো গোল। এই বল তাঁকে সব দিয়েছে যা হয়তো সবটাই পাওনা ছিল না।
শরীরে এতটুকু ক্লান্তি বা অসুস্থতা ছিল না। মাঠ যথেষ্ট ভালো না হলেও কিছুটা খেলা যায়। চারদিকের আকুল চোখগুলি তাঁর দিকেই চেয়ে আছে তিনি জানেন। সমস্ত ক্যামেরার লেন্স তাঁরই দিকে নিবদ্ধ তিনি জানেন। সমস্ত ভাষ্যকার কণ্ঠ বারংবার তাঁরই নাম উচ্চারণ করছে তিনি জানেন। তাঁর সমস্ত চলাফেরা, ছোটা, বল ধরা বা মারা এ সবগুলিই বারংবার দেখানো হবে, বর্ণিত হবে, ব্যাখ্যা করা হবে। মাঠের বাইশজনের মধ্যে বাদ বাকি একুশজনের কোনও গুরুত্বই নেই এই হাজার লক্ষ কোটি মানুষের কাছে।
এত দিয়েছি তোমাদের–তবু কেন চাও? এবার চোখ ফিরিয়ে নাও আমার দিক থেকে। ফিরিয়ে নাও। আমি যে কখনও নিজমনে থাকতে পারি না।–এই কথা তিনি মনে-মনে বললেন।
চেষ্টাহীন রইলেন সারাক্ষণ। ছুটলেন না, উদ্যোগ করলেন না, বল কেউ কেড়ে নিতে এলে সহজেই ছেড়ে দিলেন। জানেন, তিনি চেষ্টা করলে কিছুতেই ওরা কেড়ে নিতে পারবে না। জানেন, তিনি যদি বল পায়ে ছোটেন তবে এরা বৃক্ষরাজির মতো স্থির হয়ে যাবে। তিনি অনায়াসে গোলরক্ষককে ঠেকিয়ে বল পাঠাতে পারেন জালে। কিন্তু কেন তা করবেন তিনি? আরও হাজার লক্ষ কোটি চোখকে নিজের ওপর টেনে আনতে? আরও অনির্জন, একাকিত্বহীনতাকে বরণ করবেন? ভক্তের মৃগয়া কি এক সময়ে শেষ করা উচিত নয়? ওরা ভাবুক তিনি জাদুকর নন, স্বাভাবিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ মাত্র।
খেলা শেষ হল। ড্র। তিনি বুঝলেন, তাঁর দল ম্লানতার ছায়ায় ফিরে যাচ্ছে ড্রেসিং রুমে। সবাই বলছে–উনি আজ খেলতে পারেননি।
তিনি হাসলেন আপনমনে। আজ একরকম আনন্দ হয় তাঁর। আনন্দটা নিখাদ নয়। একটু বিষাদের বিষ তাতে মিশে থাকে।
পরদিন রাতে সুদুর স্বদেশের দিকে ধাবমান বিমানে বসে ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুমের মাঝখানে অকারণে জেগে উঠলেন একবার। কেন জাগলেন তা বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু জাগলেন। মনে হল, খুবই ক্ষীণ একটা বাঁশির আওয়াজ যেন ঘুমঘোরে শুনেছেন তিনি। কোনও নিয়মভঙ্গের জন্য রেফারি যেমন বাঁশি বাজায়।
তিনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে চারদিকে চাইলেন। সবাই ঘুমে। বাইরে নীল রাত্রির আকাশ তীর বেগে উঠে যাচ্ছে।
নিয়ম ভঙ্গ ঘটল নাকি কিছু? কখন? কোথায়? তিনি ভাবলেন, খুঁজলেন মনে-মনে। তাঁর সারামুখে, শরীরের অজস্র শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতের বন্ধুরতা। ডান গালে একটি প্রিয় ক্ষত চিহ্নে তিনি প্রায়ই আঙুল বুলিয়ে নেন। এখনও নিলেন, কিছু মনে পড়ল না।
