আজ এই খুব ভোরে তিনি কিছুটা অনিশ্চয় একা। একা হওয়ার অভ্যাস তাঁর নেই–ই প্রায়। অবশ্য একা বলতে ঠিক যা বোঝায় তা তিনি কখনওই হতে পারেন না। তাঁর দেহরক্ষী ছায়ার মতো পিছু নেয়। তাঁর দু-পকেটে দুটো রিভলভার, মজবুত ও সতর্ক ওই প্রহরীটি তার কর্তব্য পালন করার জন্য কারও অনুমতির অপেক্ষা রাখে না। তাঁরও নয়। কারণ, এই রক্ষীকে নিয়োগ করেছে একটি বিমা কোম্পানি–যে কোম্পানিতে তিনি কয়েক মিলিয়ন ডলারে বিমাবদ্ধ রয়েছেন।
কোনওদিনই ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে নিজেকে তিনি কখনও মুক্ত মানুষ বলে অনুভব করতে পারেন না। তিনি যা বলেন, যা করেন তা সব সময়েই গোচরে বা অগোচরে মানুষ লক্ষ করে। তাই যতক্ষণ জেগে থাকেন তিনি, ততক্ষণ তাঁকে সচেতন থাকতে হয়। নিজের মতো থাকা তাঁর আর হয়ে ওঠে না।
আজ এই ভোরে ইনডোর সুইমিং পুলের ধারে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর জীবনের নানা বেড়াজালের কথা ভাবছিলেন। কিংবা তাও নয়। তাঁর হয়তো ইচ্ছে করছিল, একা একটু রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে। একা ঘুরে-ঘুরে এ শহরটা একটু দেখে আসতে। কিন্তু তা হওয়ার নয়। কাল রাত থেকে হোটেলের বাইরে হাজার হাজার মানুষ চাপ বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই, ক্লান্তি নেই। ওরা একবার তাঁকে দেখতে চায়। বেরোলেই ওই অতি উৎসাহীরা ঘিরে ধরবে, ছোঁবে, ছাপবে, তারপর আদরের উন্মাদনায় শ্বাসরোধ করে ফেলবে তাঁর।
তিনি জানেন, তাঁর কোনও শত্রু নেই। কিন্তু জনপ্রিয়তাই যে কতবড় শত্রু তা তিনি আজ বুঝে গেছেন।
কাল রাতে তাঁর ভালো ঘুম হয়নি। ঘুমহীনতায় কোনও রোগ নেই, উদ্বেগ নেই, দুশ্চিন্তাও নেই। তবু তাঁর ঘুম সহজে আসে না।
নিঃশব্দে স্ত্রীর ঘুম না ভাঙিয়ে তিনি উঠেছেন, কফি খেয়েছেন একা, বেরিয়ে এসেছেন ঘর থেকে। তিনি যেদিকে আছেন হোটেলের সেদিকটা সম্পূর্ণ আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। কোনও অনভিপ্রেত লোকজন আসতে পারে না এদিকে। নিরাপত্তা প্রায় নিশ্চিন্ত।
তত ভোরে সুইমিং পুলের ধারে কেউই নেই। কিন্তু কে জানে, কোনও গুপ্ত জানালা থেকে, কোনও ফাঁক ফোঁকর দিয়ে, কোনও দূর অলিন্দ বা কক্ষ থেকে এই বিশাল হোটেলের কেউ না কেউ তাঁকে দূরবিণ দিয়ে দেখছে না, বা টেলি লেন্সে ফটো তুলছে না? আসলে ওই সন্দেহটাই নিশ্চিত সত্য। কেউ না কেউ সব সময়েই তাঁকে দেখছে। এ পৃথিবীর কোটি কোটি লোক তাঁর অচেনা, কিন্তু তাঁকে চেনে পৃথিবীর প্রায় সবাই। এইটেই সবচেয়ে জটিল ঘটনা।
সুইমিং পুলটা দুবার প্রদক্ষিণ করলেন তিনি। তারপর ভোরের প্রথম জাগ্রত মানুষটির দেখা মিলল।
লোকটা লম্বাটে, এশীয় ড্রেসিং গাউন পরা অবস্থায় একটা পাইপ কামড়ে পকেটে দেশলাই বা লাইটার খুঁজতে-খুঁজতে খুবই উদভ্রান্ত অন্যমনস্কতায় চতুরে বোধহয় এসেছিল। তাঁর দিকে একবার দৃষ্টিক্ষেপ করেই অবহেলা ভরে চোখ সরিয়ে নিল। লাইটার বের করে পাইপ ধরিয়ে আবার একবার চাইল। তারপরই কেমন হতভম্ব আর ফ্রিজ হয়ে চেয়ে রইল তাঁর দিকে।
ধূমপান তিনি পছন্দ করেন না। নাকটা একটু কুঁচকে নিলেন। আর লোকটার ওই হতভম্ব ভাবটা তিনি একটুও উপভোগ করলেন না। বরং ভারী সঙ্কোচ হল তাঁর। অপ্রত্যাশিত তাঁর দেখা পেলে লোকে কেন ভূত দেখে?
যে সৌভাগ্য লোকটা সারাজীবনও কল্পনা করতে পারেনি তিনি আজ ভোরে লোকটার জীবনে সেই সৌভাগ্যের কারণ ঘটলেন। একটু হেসে তিনি বললেন–গুড মর্নিং।
লোকটা তোতলাতে লাগল। সম্পূর্ণ বিকারগ্রস্তের মতো বলতে লাগল–মাই গড!…ইউ.ইউ আর…ওঃ, গুড মর্নিং…গুড মর্নিং! গুড মর্নিং…!
তিনি স্মিত হাস্যে লোকটাকে আনন্দের ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে আবার আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকেন।
লোকটা জানে যে তিনি ধূমপান পছন্দ করেন না। পৃথিবীর সব মানুষই তাঁর পছন্দ অপছন্দের কথা জেনে গেছে। পাইপ নিভিয়ে অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে পিছু–পিছু হাঁটতে-হাঁটতে বলল –আপনার সঙ্গে যে আমার দেখা হয়েছিল একথা তো কেউ বিশ্বাস করবে না! আপনি কি দয়া করে আমাকে একটু স্মারক দেবেন না? ছোট স্বাক্ষর একটি?
তিনি মুখ ফিরিয়ে মৃদু হাস্যে বললেন–এই সাক্ষাৎকার কি আপনার পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ?
–বোধহয় আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা।
–কেন?
–আমি এক সম্রাটের সাক্ষাৎ পেয়েছি যিনি ক্রীড়াজগতে গত বিশ বছর তাঁর অপ্রাকৃত জাদুবিদ্যা দেখিয়েছেন, যাঁর মতো কেউ কখনও জন্মায়নি, আগামী একশো বছরে কেউ জন্মাবেও না।
তিনি বললেন–মানুষের সাধ্য যা নয় আমি তা কী করে করতে পারি? আমি যা করেছি তা মানুষের সাধ্যায়ত্ত নিশ্চয়ই। আর জাদুবিদ্যা আমি কিছুই জানি না, সারাজীবন আমাকে কঠোর অনুশীলন করতে হয়েছে।
–এ সবই আমরা জানি। কিন্তু তবু আপনি অলীকতার সীমারেখা ছুঁয়েছেন। বিশ্বকাপের এক ফাইনালে দেখেছি আপনার ভৌতিক ড্রিবলিং। সে যে না দেখেছে…
খুবই ক্লান্ত লাগে তাঁর। হয়তো এরা ঠিকই বলে। তাঁর মধ্যে কিছু একটা আছে। ধাঁধার মতো, রহস্যের মতো, অলৌকিকত্বের মতো। তিনি নিজে কোনওদিনই তা টের পাননি। কিন্তু অন্যেরা বলে যেসব কৌশলে আর পাঁচজন বড় খেলোয়াড় খেলে তাঁর নিজের কৌশল তার চেয়ে আলাদা কিছু নয়। কিন্তু প্রয়োজনের ক্ষেত্রে হয়তো তিনি বেশি ত্রুটিহীন। আর সেটাই হাজারও লোক। মিরাকল বলে মনে করে। তিনি বললেন–আমি যা করি তা সবই চেষ্টার দ্বারা।
