কিংবা আর-একদিন, যেদিন তোমার ছিমছাম শূন্য বাড়িতে অনেকদিন পর মনোরমা এসেছিল। সন্ধে হয়ে গেলে তুমি আলো জ্বালানি, আধো অন্ধকারেই সুবিধে ছিল তোমার। মনোরমা অনেকক্ষণ গ্রামোফোন বাজাল তারপর ‘ধৎ ভালো লাগছে না’, বলে উঠে গিয়ে পিয়ানোর কাছে বসল জানালার দিকে পিঠ রেখে। যদিও সে পিয়ানো বাজাতে জানত না, তবু ওই জায়গাটা ছিল তার প্রিয়, কেন না ওখান থেকে পুরো ঘরটার দিকে না তাকিয়েও তোমাকে দেখা যায়। তুমি তোমার হেলানো চেয়ারে পড়েছিলে মনোরমার মুখোমুখি। মনোরমা সারাক্ষণ দেখছিল তোমাকে চোখ না খুলেও তুমি টের পাচ্ছিলে। তুমি কেন তাকে ডেকে পাঠিয়েছ তা জানবার কৌতূহল থাকলেও সে কোনও প্রশ্ন না করেই তা জানতে চাইছিল। তুমি কী করে তোমার সেদিনকার হৃদয়হীন কথাবার্তা শুরু করবে তা ভেবে পাচ্ছিলে না। কেন না কথাগুলো বলা হয়ে গেলে মনোরমা চলে যাবে–এই যাওয়াটা তার পক্ষে কত অপমানকর তা ভেবে মনে মনে বড় কষ্ট পাচ্ছিলে তুমি। তুমি একপলক চোখ খুলে দেখলে সে অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে আলমারিতে সাজানো খেলাধুলোয় পাওয়া তোমার ট্রফিগুলো দেখছে। পরমুহূর্তেই উঠে গেল সে, ছায়ার মতো তাকে বইয়ের র্যাকের কাছে, টেলিফোনের কাছে, ড্রেসিং টেবিলের কাছে পরপর। দেখা গেল, আবছা গলা শোনা গেল তার ‘তুমি কি ভীষণ চরিত্রহীন সুমন!’ তুমি ভেবে পেলে না-ও কি করছে। কিন্তু সুযোগ বুঝে তুমি বলতে শুরু করেছিলে ‘শোনো মনোরমা–।’ মনোরমার ছায়াকে আবার পিয়ানোর কাছে দেখা গেল, তুমি আবার বললে ‘শোনো মনোরমা।’ পরমুহূর্তে মাথা নীচু করল মনোরমা, তার ডানহাত কোলের ওপর থেকে শাড়ির আঁচল তুলে নিলে তুমি অতর্কিতে বুঝতে পেরেছিলে মনোরমা কাঁদছে। তুমি তাড়াতাড়ি উঠতে যাচ্ছিলে, তুমি কিছু বলবার চেষ্টা করেছিলে, কিন্তু তার আগেই কান্নার ঝোঁকে ভর রাখতে গিয়ে মনোরমা বাঁ হাত। বাড়িয়ে পিয়ানোর এলোমেলো রিডগুলো ছুঁয়ে গেলে তুমি তড়িদাহতের মতো স্থির হয়ে গেলে। ধীর গম্ভীর স্বরে সেই পিয়ানো তোমাকে চুপ করতে বলল । তুমি আর-একবার উঠবার চেষ্টা করলে। পিয়ানো গর্জন করে উঠল। যেন মনোরমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে ডালা–খোলা প্রকাণ্ড সেই অন্ধকার পিয়ানো তোমার ওপর লাফিয়ে পড়বে। তুমি আবার মনোরমার স্বর শুনতে পেলে ‘সুমন, তুমি চরিত্রহীন–।’ লিতকণ্ঠে তুমি আবার মনোরমার নাম ধরে ডাকলে, ঠিক সেই সময়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মনোরমা ভারসাম্য রক্ষার জন্য আবার পিয়ানোর রিডে হাত রেখেছিল, তার অশিক্ষিত অপটু হাতে পিয়ানো তীব্রভাবে বেজে উঠলে ঘরের সবকিছু প্রাণ পেয়ে গেল। অর্থহীন শ্বেতপাথরের টেবিল, টেলিফোন, বইয়ের রং্যাক, ওয়ার্ডরোব–এ সবকিছুই তোমার ওপর লাফিয়ে পড়বে-এরকম মনে হল। তীব্র ও অলৌকিক ভয় থেকে তুমি দেখলে–এ ঘরের সবকিছুই মনোরমার; তোমার ট্রফিগুলি, হেলানো চেয়ার, গ্রামোফোন, চেস্ট অফ ড্রয়ার্স–এ সবকিছুই মনোরমার, তুমি আগন্তুক মাত্র। মুহূর্তেই হাঁটু গেড়ে এই কথা বলবার অলৌকিক ইচ্ছে হয়েছিল তোমার যে ‘ক্ষমা করো!’ তুমি নড়তে পারলে না। মনোরমা তড়িৎগতিতে তার ব্যাগ কুড়িয়ে নিল, তুমি তার আধভাঙা কথা শুনতে পেলে ‘আমি সব জানি, কিন্তু তুমি কখনও বোলো না সুমন, বোলো না’ পরমুহূর্তেই দরজার কাছে তার দ্রুত অপসৃয়মান অবয়ব একপলকের জন্য দেখা গেল কি গেল না! ইচ্ছে হয়েছিল সিঁড়ি পর্যন্ত দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরা, কিন্তু তখনও ধর্মরক্ষাকারী সেই পিয়ানোর স্বর বাঘের মতো মনোরমাকে পাহারা দিচ্ছিল, ঘরের সবকিছুই ছিল–তখনও মনোরমার, তখন সজীব ছিল তোমার ট্রফিগুলি, টেলিফোন, বইয়ের র্যাক ও হেলানো চেয়ার। কিছুক্ষণ ঠিক কী হয়ে গেল তুমি তা বুঝলে না। এরপর তুমি অনেকদিন পিয়ানোর কাছে বসেছ, কখনও ধীরে কখনও দ্রুতবেগে তোমার শিক্ষিত সপটু আঙুলে রিড চেপে দেখেছ–পিয়ানোর ভিতরে অলৌকিক কিছু নেই। কিন্তু কোথাও ছিল সেই ঘরে, অন্ধকারে, তোমার স্পর্শকাতরতার ভিতরে পিয়ানোর সেই অচেনা ‘নোট’–মনোরমা জেনে কয়েক মুহূর্তের জন্য সেইখানে তার হাত রেখেছিল।
ছেলেবেলায় তুমি যেসব খেলা খেলেছিলে তার মধ্যে একটা খেলা তোমার মায়ের সঙ্গে। অথচ নিতান্ত বালক বয়সেই তুমি তোমার মাকে শেষবার দেখেছিলে। খুব দীর্ঘ চুল ছিল তাঁর এটুকু ছাড়া আর কিছুই তোমার মনে নেই। তোমার মাকে যারা দেখেছিলে তারা বলত তুমি মাতৃমুখী ছেলে–ভাগ্যবান। যে দু-একটি ছবি ছিল তোমার মায়ের তা থেকে চেহারা ভালো বোঝা যায় না, শুধু বোঝা যায়–তোমার মতোই তীব্র চিবুক ছিল, একটু চাপা গাল আর একটু উঁচু কিন্তু খুব সুন্দর নাক ছিল তাঁর। কিশোর বয়সের সমস্ত লক্ষণ শরীরে ফুটে উঠলে একদিন কৌতূহলবশত তুমি শাড়ি পরেছিলে, তোমার মায়ের কিশোরী বয়সের ছবিতে যেমন ছিল তেমনি দু-চোখে কাজল এবং কপালের জ সঙ্গমে কাজলের টিপ পরেছিলে তুমি, তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি তোমার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে চোরাহাসি হেসে আপন মনে প্রশ্ন করেছিলে, ‘এ রকম ছিল আমার মা?’ আয়নায় অচেনা এক কিশোরীর মুখ তোমার দিকে চেয়ে গোপন ও রহস্যময় কোনও কারণে হেসে উঠেছিল। বড় তির্যক ও বিচিত্র ছিল তার দুই চোখ। এ তো তুমি নও! তুমি ভয় পেয়েছিলে। ‘আমি কি সুমন?’ তুমি এই প্রশ্ন করেছিলে, কেন না সেই কিশোরী প্রতিবিম্বের তীব্র ও রহস্যময় টান গোপন স্রোতের মতো তোমাকে সম্ভবত বীজরূপে। আর-একবার তার গর্ভস্থ অন্ধকারের দিকে আকর্ষণ করেছিল। মনে পড়ে তুমি একবার দু-হাত বাড়িয়ে আয়নার ফ্রেমটা ধরবার চেষ্টা করেছিলে, পরমুহূর্তেই তুমি আর ছিলে না। ঠিক কী হয়েছিল তোমার তা জানা নেই, শুধু সন্দেহ হয় কিছুক্ষণের জন্য সেই ঘরে একা এক কিশোরীই ছিল তার প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে, তুমি তার কোথাও ছিলে না। অনেকক্ষণ পর যখন তুমি সচেতন হয়েছিলে তখনও তোমার মনে ‘আমি কি সুমন? এই প্রশ্ন আবছাভাবে খেলা করে গিয়েছিল। মনে পড়ে ক্রমে ভয় ভেঙে গিয়েছিল এবং তুমি তোমার কিশোর বয়সে তোমার কিশোরী মায়ের সঙ্গে আরও কয়েকবার এই খেলা খেলেছিলে। কথার মাঝখানে, খেলার মাঝখানে, ঘুমের মাঝখানে অতর্কিতে সচেতন হয়ে তুমি মাঝে-মাঝে নিজের ভিতরে এক রহস্যময় নারীত্বকে লক্ষ করে ‘আমি কি সুমন?’ এই প্রশ্ন করে মনে-মনে চমকে উঠেছ। কালক্রমে যদিও তোমার শরীর মুষ্টিযোদ্ধাদের মতো পুরুষ ও সুগঠিত হয়েছে তবু তোমার মুখে কোথাও এখনও সেই এক কিশোরীসুলভ রহস্যময় নম্রতা রয়ে গেছে, একপলক আয়নায় তাকালেই তুমি তা ধরতে পারো। এখনও যখন তুমি নানা কাজে থাকো, যখন সিঁড়ি ভেঙে ওঠো, কিংবা সিঁড়ি ভেঙে নামো, যখন দরজা খুলতে হাত বাড়াও, কিংবা কেউ ‘সুমন’ বলে ডাকলে পিছন ফিরে সাড়া দাও, বিদেশি নাচের আসরে যখন অচেনা মহিলাকে হালকা আলিঙ্গনে বদ্ধ করো তখন মাঝে-মাঝে কাকে মুহূর্তের গভীর অন্যমনস্কতা থেকে নিজের ভিতরে হঠাৎ এক। অলৌকিক ‘আমি কি সুমন?’ এই প্রশ্ন শুনে বিস্মিত হয়েছ।
