তোমাদের পরিবারে ছিল চোখের অসুখ। তোমার বাবার একটু বয়েস হয়ে গেলে তাঁরও দৃষ্টিশক্তি খুব কমে এসেছিল। খুব ভারী ঘোলাটে কাঁচের চশমা ছিল তাঁর, তবু ঘড়ি দেখবার জন্য, চিঠি পড়বার জন্য সবসময় তাঁকে একটা আতস কাঁচ ব্যবহার করতে হত। যখন চোখ দিয়ে দেখবার ক্ষমতা আরও ক্ষীণ হয়ে আসছিল তখন সবকিছু দেখবার আগ্রহ ক্রমশ বেড়েছিল তাঁর। তুমি তাঁকে কখনও দেখেছ সিঁড়ির ফাটলের কাছে বসে আতস কাঁচ দিয়ে পিঁপড়ের চলাফেরা লক্ষ করছেন, কখনও আতসকাঁচের ভেতর দিয়ে পিয়ানোর ওপর জমে ওঠা ধুলোর আস্তরণের দিকে অকারণে চেয়ে আছেন। কতদিন তুমি দেখেছ তোমার বাবা বাড়ির দক্ষিণ কোণে ভিতের কাছে তাঁর আতসকাচটি নিয়ে বসে আছেন, তাঁর ধারণা ছিল দক্ষিণ কোণ থেকেই বাড়িটা ভাঙতে শুরু করবে, কেন না ওই কোণ থেকেই বাড়িটার ভিত গাঁথা শুরু হয়েছিল। তোমাকে কাছে ডেকে কখনও-কখনও তিনি বলেছেন, ‘তুমি কি খুব বেশি আয়ু চাও? খুব বেশি দৃষ্টিশক্তি চাও? সুমন, তুমি কখনও খুব বেশি চেয়ো না।’ মাঝে-মাঝে তিনি তোমাকে ঠাকুরমার গল্প বলেছেন। বাড়িতে কারও দৃষ্টিশক্তি ভালো ছিল না, দাদু অন্ধ, জ্যাঠামশাই অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন, তখন সকলের চোখের দেখা তোমার ঠাকুমা একলা দেখতেন। এত বেশি প্রখর হয়েছিল তাঁর চোখ যে তোমাদের মস্ত বাগান থেকে একটু ফুল কেউ তুলে নিলে তিনি টের পেতেন, তোমার প্রায় অন্ধ পিসিমার খেলনার বাক্স থেকে পুঁতির মালা চুরি গেলে তিনি ধরে ফেলতেন। এইভাবে সবকিছুর ওপর তাঁর ভয়ঙ্কর মায়ার সৃষ্টি হয়েছিল বলে মরবার সময় তাঁর প্রাণ বেরোতে অনেকক্ষণ সময় লেগেছিল, আর শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার পরও দেখা গিয়েছিল তাঁর চোখ খোলা রয়েছে। এইভাবে তোমার বাবা তোমাকে প্রায়ই কাছে ডাকতেন, তোমার গলার শব্দ শুনতে চাইতেন। তুমি তোমার বাবার ভিতরে খুব আনন্দ কিংবা খুব বিষাদ কখনও দ্যাখোনি। খুব কাছের কিংবা খুব দূরের বলেও তাঁকে তোমার কখনও বোধ হয়নি। শুধু তাঁর রহস্যহীন পরিষ্কার মুখ-চোখ দেখে তোমার প্রায়ই তাঁকে বড় দূর ভ্রমণকারী বলে মনে হত। তখন তোমার যৌবন আরম্ভের সময়ে তুমি একদিন তোমার প্রথম নীতিবিগহিত যৌন স্বপ্নটি দেখেছিলে, আর-একদিন তুমি অলি নামে মেয়েটিকে প্রথম চুম্বন করেছিলে। সেই সময় তুমি প্রায়ই বড় অন্যমনস্ক ও অস্থির ছিলে। এমনই একদিন যখন তুমি তোমার বাবার ঘরের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলে তখন তিনি চোখ কুঁচকে তোমাকে দেখবার চেষ্টা করে জিগ্যেস করলেন, ‘তুমি কি সুমন?’ তুমি সাড়া দিলে তিনি বললেন, ‘একবার আমার। কাছে এসো।’ তুমি কাছে গেলে বললেন, ‘হাঁটু গেড়ে আমার সামনে বোসো।’ তুমি তোমার বাবার হাঁটুর ওপর হাত রেখে বসলে, তিনি তাঁর আতসকাচটি তুলে নিয়ে ‘দেখি সুমন তোমার মুখখানি’ এই বলে তোমার মুখের ওপর আতসকাচটি ধরলে, তুমি কাঁচের ভিতরে তাঁর মস্ত বড় গভীর চোখগুলি দেখেছিলে। তোমার মনে হয়েছিল বহু দূর বিস্তৃত রয়েছে সেই চোখ, এবং তোমার এই বোধ এসেছিল যে সেই চোখের ভিড়ে ধূসর মাঠ, পর্বতশৃঙ্গ, সমুদ্র ও আকাশ রয়েছে। –একটু ম্লান–কিন্তু এই চোখ তাঁর যিনি কাছের ও দূরের সব কিছু দেখতে পান, যিনি আলো ও অন্ধকারে সমভাবে দেখেন, যিনি ঈশ্বর, এবং তোমার স্রষ্টা। তাঁর ডান হাতখানা তোমার মাথার ওপর স্থির হয়েছিল। খানিকক্ষণ তোমার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল, কেন না তোমার বোধ। হয়েছিল তিনি তোমার ধর্মহীন ক্রিয়াকাণ্ডগুলি, তোমার সামঞ্জস্য শূন্য বোধ ও প্রবৃত্তিগুলোকে প্রত্যক্ষ করছেন। তিনি একবার বিড়বিড় করে বললেন, ‘চোখ বড় মায়ার সৃষ্টি করে।’ তারপর তিনি তাঁর হাত ও আতস কাঁচ সরিয়ে নিলেন। সেই দিনই দুপুরবেলা তোমার বাবা তাঁর আতসকাচটি নিয়ে নিঃশব্দে ছাদে উঠে গিয়েছিলেন এবং শেষবারের মতো আতস কাঁচ দিয়ে। সূর্যকে প্রত্যক্ষ করবার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর দুটো চোখই পুড়ে গিয়েছিল। তাই তারপর থেকে তুমি সবচেয়ে বেশি লক্ষ করেছ মানুষের চোখ। প্রথমে তুমি নিজের চোখ দিয়ে শুরু করেছিলে। জল খেতে গিয়ে তুমি কতদিন গ্লাসের জলে নিজের চোখের ছায়া দেখে চোখ ফেরাতে পারোনি। কতদিন তুমি ইচ্ছে করে চোখ বুজে রাস্তা দিয়ে বহু দূর পর্যন্ত হেঁটে গেছ। বড় রোমাঞ্চকর ও অস্বাভাবিক ছিল তোমার তোমাকে নিয়ে সেই খেলা। কিন্তু ক্রমে–ক্রমে তুমি অন্ধের মতো হাঁটতে শিখেছিলে, তুমি চোখ বুজে দিকনির্ণয় করবার কৌশল আয়ত্ত করেছিলে, এবং অন্ধের যেমন হয় তেমনই তোমার অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলি প্রখর ও স্বৰ্শকাতর হয়ে উঠেছিল। এইভাবে অনেকদূর অগ্রসর হয়ে তুমি ভেবেছিলে এখন তুমি তোমার অন্ধকার দিনগুলির জন্য প্রস্তুত।
তুমি অনেকদিন তোমার বন্ধুদের চোখ বুজে হেঁটে যাওয়া ও দিকনির্ণয় করার কৌশল দেখিয়ে বিস্মিত করেছ। যারা তোমার এই কৌশল দেখেছিল তাদের মধ্যে একমাত্র অতীশ তোমাকে মাঝে-মাঝে বলেছিল যে এই খেলা ভালো নয়। কারণ জিগ্যেস করলে সে সঠিক উত্তর দিতে পারত না, শুধু বলত ‘দ্যাখো তুমি–এ ভালো নয়।’ অতীশ ছিল শান্ত ও নিঃশব্দ প্রকৃতির এবং প্রথম চেনা হওয়ার পর থেকেই তুমি মাঝে-মাঝে লক্ষ করেছিলে যে তার মুদ্রদোষের মতো একটি স্বভাব রয়েছে। কম কথা বলত অতীশ এবং কখনও-কখনও কথা বলতে-বলতে হঠাৎ থেমে যেত সে। যেন কথা ভুলে গিয়ে কী বলছিলাম বলো তো? কেন বলছিলাম?’ এই প্রশ্ন করে বোকার মতো চেয়ে থাকত। তুমি অনেকদিন কথার খেই ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছ কিন্তু অতীশের ধাঁধা কাটত না, সে প্রশ্ন করতে থাকত ‘কেন বলছিলাম? কেন বলছিলাম? কেন?’ তারপর আর সে প্রশ্নও তার থাকত না এবং সে কিছুক্ষণ প্রাণপণে কোনও কথা বলবার চেষ্টা করত, পারত না। অবশেষে সে তার স্বাভাবিকতা ফিরে পেলে বহুদিন লজ্জাবশত উঠে চলে গেছে। অথচ তুমি ক্রমশ বুঝতে পেরেছিলে তোমাদের কুড়ি-একুশ বছর বয়সের সব বন্ধুদের। মধ্যে অতীশ ছিল সবচেয়ে জ্ঞানী ও অনুভূতিপ্রবণ। মাঝে-মাঝে তুমি তার এই স্বভাবটি সম্পর্কে প্রশ্ন করেছ, সে সঠিক উত্তর না দিয়ে হেসে বলত ‘ওটা আমার মনের তোতলামি।’ কিন্তু কতদিন তোমার মনে হয়েছে বহুজনের মধ্যেও অতীশ তোমাকে লক্ষ করছে অতি নিবিষ্টভাবে, যেন গোপনে সে তোমাকে কোনও কথা বলতে চায়। খেলাধুলো করত না অতীশ, কিন্তু তুমি যখন খেলতে নেমে ফুটবলের পিছনে ছুটছ তখনও টের পেয়েছে মাঠের সীমানায় বাইরে ভিড় থেকে অতীশ তোমাকে লক্ষ করছে। যখন তুমি চোখ বুজে পিয়ানোর সঙ্গে গান গাইছ, তখনও টের পেয়েছ অতীশ আর সকলের মতো গান না শুনে তোমাকে লক্ষ করছে। কিন্তু কারণ জিগ্যেস করলে হেসে এড়িয়ে যেত, বলত ‘তুমি বড্ড বেশি স্পোর্টসম্যান সুমন। বোধহয় তুমি সব কিছু নিয়ে খেলতে পারো।’ তুমি উঁচু গলায় হেসে উঠে বলেছ ‘ইয়াঃ!’ খেলা শেষ হয়ে গেলে তুমি আর অতীশ ফাঁকা খেলার মাঠে পাশাপাশি শুয়ে ছিলে, অতীশ বলছিল খেলা শেষ হয়ে গেলে খেলার মাঠ আমার ভালো লাগে।’ তুমি চোখ বুজে ছিলে, উত্তর দিলে না। অতীশ আচমকা কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে উঠে বলল ‘সুমন, আমার একটা খেলার কথা তোমায় বলতে পারি, কারণ তোমার একটা খেলার সঙ্গে আমার খেলাটার বোধহয় মিল আছে।’ তুমি চোখ বুঝে সতর্ক গলায়। প্রশ্ন করলে কী সেটা?’ অতীশ হাসল ‘বলছি। আগে বলো তো কত ছেলেবেলার কথা তোমার মনে আছে!’ তুমি হালকা গলায় বললে, ‘এই ধরো চার-পাঁচ বছর বয়সের কথা কিছু-কিছু মনে। আছে।’ অস্থির গলা শোনা গেল অতীশের, ‘না, অত নয়। ও তো অনেকেরই মনে থাকে, আরও ছেলেবেলার কথা মনে নেই?’ উৎসুক হয়ে তুমি একটু ভেবে দেখলে ‘খুব মনে নেই, তবে আমার একটা নীল রঙের টি–পটের কথা মনে পড়ে, মার হাতে দেখেছিলাম–যখন আমার তিন–সাড়ে তিন বছর বয়স।’ অতীশের ব্যগ্র গলা শোনা গেল ‘আর কিছু আরও ছেলেবেলার?’ তুমি অবাক হয়ে আধ–বসার মতো উঠে অতীশের আবছা মুখের দিকে চেয়ে দেখলে, তোমার মনে হয়েছিল অতীশ এতকাল যা বলতে চেয়েছিল আজ তা বলতে চায়। তোমার ভয় হচ্ছিল অতীশ তার পুরোনো অভ্যাসবশে চুপ করে না যায়। তুমি শান্ত গলায় বললে, ‘বোধহয় একবার জ্বরের ঘোরে আমি একটা থার্মোমিটার ভেঙে ফেলেছিলাম, তখন আমার বয়স বোধহয় আড়াই কি তিন, আবছা মনে পড়ে, আমি থার্মোমিটার ছুঁড়ে ফেলছি, কিন্তু এটা আমার কল্পনাও হতে পারে।’ ‘হতে পারে।’ অতীশ সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর দিল কিন্তু এরকম মনে করবার চেষ্টা করে দ্যাখো আরও ছেলেবেলার কথা তোমার মনে পড়ে কি না।’ তুমি অনেকক্ষণ ভেবেছিলে, তুমি কিছুটা অস্বস্তিবোধ করে বলেছিলে না। কিন্তু আর কী মনে পড়বে। দু-একটা ঘটনার কথা পুরোনো ছবির মতো মনে থেকে যায়। ব্যস।’ অতীশ অস্পষ্ট গলায় বলল ‘দু-একটা ঘটনার কথা নয়, সবকিছু একের–পর–এক স্পষ্ট মনে করার কথা বলছি যা তুমি আর কারও কাছ থেকে শোনোনি, যা কল্পনারও নয়।’ তুমি হেসে উঠেছিলে ‘পাগল! তুমি কি পারো আরও ছেলেবেলার কথা মনে করতে?’ অতীশ হাসল না, ধীর স্বাভাবিক গলায় বলল ‘অনেক, যতদূর যাওয়া যায়।’ তুমি হাসছিলে তার মানে এক-দেড় বছর, ছ’মাস না জন্মমুহূর্ত পর্যন্ত?’ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে উঠল। অতীশের চোখ ‘ঠিক জন্মমুহূর্তটিও মনে পড়তে পারে।’ বলেই সম্ভবত লজ্জায় সে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাতে তুলে বলে উঠল ‘সুমন, ওই দেখ ওরিয়ন।’ সে কথা ঘোরাচ্ছে বুঝতে পেরে সেদিকে তুমি কান দিলে না। ‘ঠিক আছে’ তুমি বলেছিলে ‘কীরকম ছিল তোমার জন্মমুহূর্ত?’ অতীশ মুখ লুকিয়ে খুব আস্তে-আস্তে বলল ‘অন্যরকম, আমাদের রোজকার জীবনের মতো নয়। তুমি নিজেও জানো না কেন অতীশের স্বর শুনে তোমার রোমকূপে কাঁটা দিয়েছিল। অতীশ হাসল ‘মনে করতে-করতে ফিরে যাওয়া যায়। তুমিও চেষ্টা করে দেখতে পারো।’ তুমি বিশ্বাস করোনি, বলেছিলে, ‘কী করে সম্ভব?’ অতীশ হাসছিল ‘ঠিক জানি না, আগে আমি এটা খেলতাম কিন্তু এখন আর আমি ইচ্ছে করে খেলি না, খেলাটাই শুরু হয়ে যায়। তখনই চেনা-পরিচয় মুছে যায়, কথা ভুল হয়ে যায়, আমি ফিরে যেতে থাকি।’ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে তুমি হঠাৎ উঁচু গলায় হেসে উঠলে অতীশ বড় লজ্জা পেয়েছিল। তুমি বিশ্বাস করোনি, কিন্তু তারপর গোপনে তুমি মাঝে-মাঝে অতীশের খেলাটা খেলতে চেষ্টা করেছিলে–কিছুই তোমার মনে পড়েনি। ঠিক স্মৃতিচারণের খেলা নয়। একটু ভিন্ন ও রহস্যময়–ঠিক অতীশের মতো করে সেই খেলা তুমি খেলতে পারোনি। তুমি একা-একা আপন মনে ‘ইয়াঃ’ বলে হেসে উঠেছ। কিন্তু একদিন রোজকার মতোই তুমি খুব ভোরে উঠে খেলার মাঠে গিয়েছিলে। একা-একা আবছা অন্ধকারে তুমি আস্তে গড়িয়ে দিলে তোমার ফুটবল তারপর ছুটতে শুরু করলে। প্রথমে আস্তে আস্তে তারপর তোমার গতি বাড়ছিল। মাঠের সীমানা ধরে তুমি তোমার বলটির পিছনে ছুটছিলে মাঠকে সবসময় বাঁ-দিকে রেখে চক্রাকারে। সাধারণত তুমি চারবার মাঠটিকে ঘুরে এলে ভোর হয়ে যায়। তুমি তিনবার ঘুরে এসে চারের পাক শুরু করেছিলে, তোমার মাংসপেশিগুলি সতেজ ও রক্তস্রোত দ্রুত হয়ে উঠেছিল, ভোরের দম নিয়ে তোমার ফুসফুস পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল–এইভাবে চারের পাক শেষ হয়ে গেল। কিন্তু ভোর হল না। তোমার খেয়াল ছিল না বলটা তোমার পায়ের টোকা খেয়ে গড়িয়ে যাচ্ছিল–তুমি অভ্যাস মতো ছুটছিলে। কিন্তু এক সময়ে তুমি বুঝতে পেরেছিলে তোমার পায়ে বলটা আর নেই–কোথায় গড়িয়ে গেছে। থেমে তোমার খেয়াল হল তুমি অন্তত সাতবার মাঠটাকে ঘুরে এসেছ অথচ ভোর হয়নি। তুমি বলটা খুঁজবার জন্যে মাঠের দিকে তাকালে, সেখানে গাঢ় অন্ধকার জমে আছে, তুমি আকাশের দিকে তাকালে –সেখানে গাঢ় অন্ধকার জমে আছে। মাঠ না, আকাশ না, সূর্য ও নক্ষত্র কিছুই তুমি দেখতে পেলে না। তুমি পা বাড়িয়ে দেখলে, তুমি হাত চোখের সামনে এনে দেখলে–কিছুই দেখা যায় না। তোমার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। তুমি যত্নে শেখা তোমার ইন্দ্রিয়গুলির স্পর্শকাতরতার কথা ভুলে গিয়েছিলে, চোখ বুজে দিকনির্ণয় করবার কৌশলের কথাও তোমার মনে হল না। মনে আছে তুমি আস্তে-আস্তে হাঁটু গেড়ে বসেছিলে, তোমার দুটি হাত কোলের ওপর জড়ো করা, গাল বেয়ে চোখের জল পড়ছে, নিতান্ত তুচ্ছ কারণেই তুমি কাঁদছিলে–কখনও অলি নামে যে মেয়েটিকে তুমি প্রথম চুমু খেয়েছিলে তার জন্য, কখনও বাড়ি ফিরে যাওয়ার পথটির জন্য, মাঠ সূর্য ও নক্ষত্রগুলির জন্য। তুমি চোখ চেয়ে দেখেছ অনেক, তুমি চোখ বুজেও দেখেছ অনেক, আর একধরনের দেখা তোমাকে খেলাচ্ছলে শিখিয়েছিল অতীশ–তুমি অনুভব করলে সেই খেলা। তোমার ভিতরেই গোপনে ছিল একদিন। তোমার ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সেই খেলায় অতি দ্রুত পশ্চাৎগামী রেলগাড়ির মতো তুমি ফিরে যাচ্ছিলে। ক্রমশ আলো ও অন্ধকার লুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল–ক্রমে চেষ্টারহিত তুমি বুঝেছিলে চোখের মতোই তোমার অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলি একে একে নিভে গেল। তুমি আর কিছুই স্পর্শ করো না, কিছুই প্রত্যক্ষ করো না, কিছুই শ্রবণ করো না, তুমি খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করো না, তোমার আনন্দ ও বিষাদ কিছুই নেই–সেইখানে খুব ভোর আকাশের নীচে তোমার প্রিয় মাঠের ওপর তোমার বীজটি পড়ে আছে যার সঙ্গে ‘আমি’ এই বোধটুকু মাত্র ধর্মের মতো সংলগ্ন আছে, আর কিছুই নেই। ‘আমি’ এই বোধটুকু মায়ার মতো। তোমার ইন্দ্রিয়গুলিকে সৃষ্টি করেছিল–অলৌকিক এই শিল্প-নির্মাণ। এ তোমারই। তুমি প্রাণপণে এই বোধ ভেদ করতে চাইছিলে, চিৎকার করে উঠতে চাইছিলে, দৌড়াতে চাইছিলে–পারলে না। কয়েকটি অলীক মুহূর্তের পর কে যেন আবার খেলাচ্ছলে তোমার কোলের কাছে বলটি ঠেলে দিলে তুমি দু-হাতে তুলে নিলে তোমার বল, বুকের মধ্যে চেপে ধরে তাকিয়ে দেখলে –সবুজ বিস্তৃত মাঠ, সূর্য উঠছে। তুমি নড়লে না, তুমি তেমনই বসে রইলে–এতদিন তোমার যা দেখা হয়নি সব কিছুর জন্য অবিরল চোখের জলে তোমার বুক ভেসে যাচ্ছিল। তুমি চোখ মেলে সেই অন্ধকার আর কখনও দেখনি। এরপর দীর্ঘকাল কেটে গেলে একবার বিদেশে থাকতে তুমি জেনেছিলে অতীশ সন্ন্যাস নিয়ে ঘর ছেড়ে গেছে, এই কারণে যে, সে বিয়ে করবার পর নিতান্ত সন্দেহবশত তার বউ মল্লিকার। কৌমার্য হরণ করতে পারেনি বলে মল্লিকা তাকে ত্যাগ করে গিয়েছিল। তারপর অতীশের কথা তোমার আর মনে ছিল না। কিন্তু যখন তুমি বিদেশে প্রবাসে অচেনা রাস্তায় ও মাঠে হেঁটেছে, যখন কোনও নদীর ধারে দাঁড়িয়ে নিসর্গ প্রত্যক্ষ করেছ, যখন সমুদ্র পাড়ি দিয়েছ তখন শৈশব বাল্য ও কৈশোরের কোনও-কোনও ছবি মনে ভেসে উঠলে তোমার অতীশের সেই খেলাটার কথা মনে পড়েছে। তুমি একা-একা আপন মনে ‘ইয়াঃ’ বলে হেসে উঠেছ। এইভাবে তুমি তোমার ঊনত্রিশের জন্মদিন পার হয়ে গেলে একদিন এক পার্টিতে তোমার পরিচিতদের মধ্যে একজন তোমার হাতটা চেপে ধরেই ছেড়ে দিয়ে বলেছিল ‘সুমন, তোমার গায়ের জোর কমে যাচ্ছে।’ তুমি চমকে উঠেছিলে, কেন না তুমি বাস্তবিক অনুভব করেছিলে তোমার জোর অনেক কমে এসেছে। তুমি আগেকার মতো আর ফুটবল নিয়ে দৌড়োও না। খেলাধুলো তুমি প্রায় ছেড়ে দিয়েছ। সেই স্পর্শকাতরতাও তোমার আর নেই। তুমি অনুভব করো তুমি কখনও বির্ধমী, কখনও তুমি ধর্মদ্রোহী–তাই তোমার মধ্যস্থ অলৌকিক এখন তোমার ভিতরে মাঝে-মাঝে ত্রাসের সঞ্চার করে। আর তোমার যা আছে তোমার ধর্মহীন ক্রিয়াকাণ্ড, বোধ ও প্রবৃত্তি–এ সবই তোমার কাছে তুচ্ছ। আপাদমস্তক তুমি তোমার কাছেই গুরুত্বহীন ও সামঞ্জস্যশূন্য। সুতরাং বিপদে কে তোমাকে রক্ষা করে, একাকিত্বে কে তোমাকে সঙ্গ দেয়? আবার তোমার বিশ্বাস এই যে তুমি স্পষ্টতই এক ধারাবাহিকতার সূত্রে গ্রথিত আছ–তুমি প্রাকৃত। তুমি অনেকের দ্বারা রক্ষিত, তুমিই আবার অনেকের রক্ষাকারী। প্রয়োজনশূন্য তুমি নও-তুমি সম্পর্কযুক্ত মানুষ ধারাবাহিক–তুমিও দূরবর্তী ক্রীড়াভূমির দিকে একজন মশালবাহী–তোমার এ বিশ্বাস গথিক গম্বুজের মতো দৃঢ়মূল। সুতরাং অলৌকিক তোমার কাছে নীতিবিগর্হিত অনুপ্রবেশকারী, যেহেতু তুমি আয়নায় প্রায়ই নিজের মুখ প্রতিবিম্বিত দেখেছ, তুমি দোকানে ক্রয়কারী যুবতীদের দেখেছ, তুমি গাছে–গাছে বয়সের ফসল প্রত্যক্ষ করেছ, তুমি ফসলের ক্ষেত্রবর্ষণ, বীজবপন জলসেচন ও পক্য শস্যকে কার্যকারণ সূত্রে গ্রথিত করেছ। তোমার ইন্দ্রিয়গুলি সতেজ ও কর্মক্ষম, তুমি বাহ্যকাম ও ব্যবহারগুলিকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারো, তুমি স্বভাবে আছ, তবে কেন এই অলৌকিক?
খগেনবাবু
নলতাপুরের বাসে ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ সামনের দিকে খগেনবাবুকে দেখতে পেল দিগম্বর। অন্তরাত্মা পর্যন্ত চমকে উঠল। নলতাপুরের বাসে খগেনবাবু কেন? ইদিকে তো ওনার আসার কথাই নয়। তবে কি এত বছর বাদে খবর হয়েছে।
