অনেকদিন আগে এরকমই মাঠের মধ্যে গোয়ালঘরে, শীত-রাতে কে যেন জন্মেছিলেন, হরিবোল বুড়ো শুনেছে। তিনি কোনও সন্ত পুরুষ, ঈশ্বরের সন্তান।
আকাশে একটা তারা খসল। হরিবোল বুড়ো আস্তে-আস্তে গোয়ালঘর প্রদক্ষিণ করতে থাকে। পায়ের নীচে ঘাস, আশেপাশে গাছগাছালির ডালপালা গায়ে লাগে। হরিবোল বুড়ো গাছগাছালি আর ঘাসদের উদ্দেশ করে বার বার বলে—আহা, লাগল বাবা? ব্যথা পেলে? ঘুম ভেঙে গেল বাবারা সব। একবার হরিবোল হরিবোল হরিবোল বলল সব, কাঙালের খোকাটার পেট ভরে যাক। খোকাটা একটু কাঁদুক।
ক্রীড়াভূমি
নিজের ভিতরই আছে এক অলৌকিক। কখনও-কখনও তাকে টের পাওয়া যায়। স্পষ্ট নয়–কেন না একমাত্র ধর্মের পথেই সেই অলৌকিক স্পষ্ট ও ঈশ্বরের সমতুল হয়। তুমি স্বধর্মে কখনও স্থির থাকো নাসুতরাং তুমি কখনও-কখনও একপলকের জন্য মাত্র সেই অলৌকিককে প্রত্যক্ষ করে বিপদগ্রস্ত হও।
তাই তুমি একবার স্বপ্নে এক জনহীন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে এক নীল অতি সুন্দর বর্ণের উড়ন্ত সিংহকে তোমার নিকটবর্তীহতে দেখে ভয় পেয়েছিলে। অথচ ভয়ের কারণ ছিল না, কেন না সেই সিংহের নীল কেশর, নীল চোখ ও নীল নখ সবকিছুই হিংস্রতাশূন্য ছিল; এবং সেই নীলবর্ণ সিংহের বাসস্থান ছিল না বলে সে অতি নম্রভাবে তোমার সম্মুখের ভূমি স্পর্শ করে তোমার কাছে। একটি বাসস্থানের সন্ধান জানতে চায়, কেন না তুমি এই পৃথিবীর আইনসম্মত বসবাসকারী। তুমি নিজেও জানো না কেন তুমি তাকে উপর্যুপরি গুলি করেছিলে; কেন? সেই গুলির শব্দ শুনে এবং আহত ও ক্রুদ্ধ সেই সিংহ তার ক্ষতস্থান কামড়ে ধরে তোমার দিকেই ফিরে তাকালে তোমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু ঘুম থেকে জাগরণের ভিতরে চলে আসবার সময় যখন তুমি এক অতি সূক্ষ্ম বাধাকে অতিক্রম করছিলে তখন তোমার এক অংশ জাগ্রত ছিল, অন্য অংশকে ভয়ে আর্তনাদ করতে শুনেছিল। স্বকণ্ঠের সেই অলৌকিক স্বপ্নবিষ্ট আর্তনাদ এখনও তোমার পাপবোধকে তাড়িত করে–তুমি গুলি করেছিলে কেন? যদি স্বপ্নে আবার দেখা হয়, যদি কয়েকটি চিহ্নের দ্বারা সেই সিংহ তোমাকে আবার শনাক্ত করে? কিংবা যেন আর একবারও ভিন্ন এক স্বপ্নে তুমি তোমার বন্ধু অতীশকে খুন করেছিলে বলে জাগ্রতবস্থায়ও বহুদিন তুমি বিমর্ষ ছিলে কেন? তোমার প্রশ্ন এই যে, স্বপ্নেও কেন তুমি হত্যাকারী?
কিংবা কয়েক বছর আগে এই শীতকালে টেরিটিবাজারের কাছে তুমি যে মোটর দুর্ঘটনায় পড়েছিলে তার কথা ধরা যাক। সেদিন বিকেলের পার্টিতে তুমি সামান্য হুইস্কি খেয়েছিলে, কিন্তু মাতাল হওনি; সেদিনকার পার্টিতে তুমি অনেকক্ষণ বিদেশি নাচ নেচেছিলে, কিন্তু তুমি ক্লান্ত ছিলে না। এমনকী নাচের সময় যে মহিলা সারাক্ষণ তোমার বক্ষলগ্ন ছিল তার মুখও তোমার ঠিক মনে। পড়েনি। ঠিক কী হয়েছিল তা আজও তোমার জানা নেই। শুধু এইটুকু মনে আছে যে, তখন অনেক রাত, ফেরার পথে টেরিটিবাজারের কাছে রাস্তা ফাঁকা ছিল, গাড়িতেও তুমি ছিলে একা। তুমি জোরে চালিয়ে দিলে তোমার গাড়ি। তোমার পুরোনো আমলের পৈতৃক মোটরগাড়িতে ভয়ঙ্কর ঝঝড় শব্দ হচ্ছিল বলে তুমি মাঝে-মাঝে গালাগাল দিচ্ছিলে, মাঝে-মাঝে তুমি তোমার প্রিয় ফরাসি গান ‘ও-লা–লা ও-লা–লা’ গাইছিলে, অথচ গিয়ার স্টিয়ারিং ক্লাচ ও অ্যাক্সিলেটারের ওপর তোমার হাত পাগুলি নির্ভুল কাজ করে যাচ্ছিল। বিপদের কোনও সম্ভাবনা ছিল না-কেন। না তোমার গাড়িটির গান নেই, অন্যমনস্কতা নেই। তার ধর্ম এই যে, সে শুধু তোমার সঙ্গে যুক্ত হয়, তোমার ইন্দ্রিয়গুলির মধ্যে প্রবেশ করে এবং তার স্বধর্মে তোমাকে টেনে নিয়ে যায়। তোমার গাড়িটির আত্মা নেই, পাপ–পুণ্য নেই, তবু তুমি এই মোটরগাড়িটিকে ভালোবাসো, যেমন, মানুষ তার গৃহপালিতগুলিকে ভালোবাসে, অথচ তোমার গাড়িটি কি প্রতিদানশীল? কী হয়, যদি তুমি। গাড়ির যন্ত্র–সংলগ্ন তোমার হাত-পা তুলে নাও, চোখ বন্ধ করো? এই অলৌকিক চিন্তা হঠাৎ মনে এলে তুমি আপন মনে তোমার হাত-পা কিছুক্ষণের জন্যে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে দেখলে ধর্মান্ধ এই মোটরগাড়ি তোমার ইন্দ্রিয়গুলিকে অধিকার করে আছে, তার কাছে তুমি তুচ্ছ ও অন্তঃসারশূন্য। কিংবা হয়তো তুমি স্বভাবত আত্মরক্ষাকারী, সেইজন্য মোটরগাড়ির সঙ্গে তোমার সম্পর্ক অমোঘ। হতাশ হয়ে তুমি আবার কিছুক্ষণ ফরাসি গান গেয়েছিলেন এবং পরমুহূর্তেই এক অন্যমনস্কতা তোমাকে পেয়ে বসেছিল। অকারণে তোমার মনোরম, ছেলেবেলায় দেখা তোমার। প্রিয় কিশোরীদের মুখগুলি তোমার মনে পড়েছিল। সেই মুখগুলি তোমার আজও প্রিয়, কেন না ফের দেখা হয়নি। তোমার ছেলেবেলায় কবে যেন তোমার একটা মার্বেল হারিয়েছিল, আজও সেই মার্বেলটার কথা মনে রয়ে গেছে, কেননা এখনও মাঝে-মাঝে স্বপ্নে সেই মার্বেলটা তুমি হঠাৎ কুড়িয়ে পাও। সেই মার্বেল তোমার মাথার ভিতরে শব্দহীন গড়িয়ে গেল। তুমি হঠাৎ লক্ষ করেছিলে কবেকার স্বপ্নে দেখা এক নীল সিংহ তোমার মাথার ভিতরে আজও বাসা বেঁধে আছে। অন্যমনস্কভাবে তোমার খেয়াল হয়েছিল যে, তুমি যে, ‘ও-লা–লা ও-লা–লা’ গানটি গাইছিলে, তোমার সেই প্রিয় ফরাসি গানটির সুর ছিল সেইসব গ্রামীণ মানুষগুলির সুরের মতো, যারা গো চারণক্ষেত্রে ও বীজক্ষেত্রে ও নৌবাহনের সময় এরকম গান গায় এবং আত্মপ্রকাশহীন নিজেকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে। এইখানে তুমি কিছুক্ষণের জন্য মোটরগাড়ির সঙ্গে, তোমার গানের বিষণ্ণ গ্রামীণ সুরে আবিষ্ট থেকে যখন এক গভীর নিরাসক্তি তোমাকে পেয়ে বসেছিল তখন ঠিক কী হয়েছিল তোমার মনে নেই। তুমি তোমার জাগ্রত অংশকে ফাঁকি দিয়ে স্বপ্নে পতনশীল মানুষের মতো হঠাৎ যন্ত্র-সংলগ্ন তোমার হাত-পা টেনে নিয়েছিল। তোমার মোটরগাড়ি টাল খেয়ে গেল; পলকের মধ্যেই বিপদ বুঝতে পেরে তুমি সোজা হয়ে বসে গিয়ার স্টিয়ারিং ক্লাচ ও অ্যাক্সিলেটার চেপে ধরতে গিয়ে দেখলে ভয়ঙ্কর স্মৃতিভ্রংশ ঘটে গেছে, তুমি কোনওটারই ব্যবহার জানো না। ইতিমধ্যে চোরাগলি, অন্ধকার, তীব্র বাঁক দেওয়ালের খাড়াই তোমার দিকেই ধাবমান দেখে তুমি চিৎকার করে উঠেছিলে। আবার ঠিক সময়ে ব্রেক চেপে ধরেছিলে তুমিই। তোমার মোটরগাড়ি ভীষণ লাফিয়ে উঠে থামল। কিন্তু স্টিয়ারিংয়ের সঙ্গে দারুণ সংঘর্ষে তোমার পাঁজরার একটা হাড় মট করে ভেঙে গেলে তুমি তীব্র যন্ত্রণায় ঢলে পড়ে অস্ফুট গাল দিলে ‘ইডিয়ট’।
