ছেলেটা দেখল, অন্ধকার স্টেডিয়ামে লক্ষ-লক্ষ ভূত বসে তাকে দেখছে আর খুব হাসছে। তারা তাদের দীর্ঘ হাত নেড়ে তাকে বাহবা দিচ্ছে।
ছেলেটা মাথা নীচু করে বসে রইল। চোখে জলের ধারা। মনে হল, তার আজকের দুঃখ আর কোনওদিনই ঘুচবে না। এইখানেই তার জীবন শেষ হয়ে গেল।
*
উড়োজাহাজ বম্বেতে নামল। ইভান দেখল, এখনও সমুদ্রের ওপর অন্ধকার আকাশে বুঝি সূর্যের খুব ক্ষীণ একটা রেশ রয়ে গেছে। কিংবা মনের ভুল।
এখানে কয়েকঘণ্টা বিশ্রাম। ইভান প্লেন থেকে নামতে না নামতেই প্রোটোকল শুরু হয়ে যায়। লোকজন ঘিরে ধরে তাকে। অনবরত ক্যামেরার ফ্ল্যাশে চমকাচ্ছে। সিকিউরিটি দু-পাশ থেকে তাকে চেপে ধরে। অনবরত তাকে শেকহ্যান্ড করতে হয়। অনেক লোকের সঙ্গে। যান্ত্রিকভাবে পরিচিত হতে থাকে সে।
ভি আই পি লাউঞ্জে সাংবাদিকরা ঘিরে ধরে তাকে। অনর্গল ইজরায়েল, আরব দেশ, মধ্যপ্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, চিন আর ইউরোপ সম্পর্কিত প্রশ্ন করা হতে থাকে তাকে।
ইভান রাষ্ট্রসঙ্রে প্রতিনিধি, বিশ্বশান্তির অন্যতম দূত। সব উত্তরই তার জানা আছে। সে যন্ত্রের মতো উত্তর দিতে থাকে। তার দক্ষ সেক্রেটারি পাশেই বশংবদ বসে থেকে অবিরল তাকে নানা পরিসংখ্যান বলে দিতে থাকে।
নানা কথার মধ্যে ইভান কেবল বলে—আমরা শান্তি চাই, আমরা ক্ষুধার নিবৃত্তি চাই, আমরা চাই অভাবমোচন, স্বাধীনতা। আমরা মানুষকে সবরকম অভাব থেকে মুক্তি দিতে বদ্ধপরিকর।
বলতে-বলতে ক্লান্ত ইভান টের পায়, সে কতবার জীবনে এইসব কথা বলছে। আজও বলছে। কিন্তু আজ তার ভিতরটা যেন এক জনশূন্য হলঘরের মতো ফাঁকা। সে যখন মুখে ‘শান্তি, শান্তি’ বলছে তখন তার ভিতরের হলঘর থেকে প্রতিধ্বনি বলছে—’মৃত্যু, মৃত্যু।’
কেন বলছে? ইভান খুবই অবসাদ বোধ করে। তার কোনও অভাব নেই, ব্যক্তিগত কিছুই আর চাওয়ার নেই, সেই জন্যই কি অবসাদ? ইভান মুখে চমৎকার সব উত্তর দিয়ে যাচ্ছে আর তখন তার মন তাকে বলছে বাস্টার্ড, ইউ বাস্টার্ড, ইউ হ্যাভ ডান এনাফ টু মেক হেল। নাউ ডাই। প্লিজ।
ইভান ভাবে, সে এবার একদিন কি দু-দিন উপোস করে থেকে দেখবে ক্ষুধা কাকে বলে। সে সাতদিন মেয়েমানুষের শরীর ছোঁবে না। সে একদিন দূর কোনও দরিদ্র দেশের গ্রামের পথে পথে হেঁটে বেড়াবে যেমন হাঁটত মিশনারিরা। সেই প্লেন থেকে দেখা ধূসর মাঠটায় সে কোনওদিন যেতে পারবে কি?
.
শেষবেলায় ওয়াক তুলে সেই যে বমি করছিল বউটি তারপরই তার গর্ভর্যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল।
সূর্য ডুবে গেল নিঝুম হিম নেমে এল চারধারে। এতক্ষণ তারা দীর্ঘ পথ হেঁটেছে রোদে, তাই শীত গায়ে লাগেনি। কিন্তু এখন বউটিকে ঘিরে যখন তারা উদাস মাঠের মাঝখানে বসে আছে, তখন গভীর শীতে সবাই ঠকঠক করে কাঁপে। পেটে প্রকাণ্ড অন্ধকার খিদে, দেহে তুচ্ছ আবরণ। বউটা গর্ভর্যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।
মাঠ পেরিয়ে একটা পাগল লোক এল এ সময়ে। তাদের কাছে এসে বলল—বাবারা, সারাদিন খাওয়া জোটে না আমার। তোমরা একবার হরিবোল-হরিবোল বলল, আমার পেট পুরে যাবে। এই ভিক্ষা চাই।
অবোধ লোকগুলি তার দিকে চেয়ে থাকে কেবল। তারা ভাষা ভুলে গেছে। কথা আসে না মুখে।
শুধু তাদের দলের সবচেয়ে প্রবীণ লোকটি বলে—আমরা বড় কাঙাল। কিছু নাই। হরির নাম
নিতে পারি, আর কিছু চেয়ো না।
—তাই বলো বাবা। তারপর চলো, দুনিয়াটা দখল করি।
সবাই হাসল। দুঃখে, শোকে।
*
মেলবোর্নের ছোকরা ক্রিকেট খেলোয়াড়টি ঘাসের ওপর শুয়েছিল। জ্যানেট তাকে আর ভালোবাসবে কি? টেস্ট খেলতে আর কখনও তাকে ডাকা হবে কি? সে নিজেও কি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে?
শুয়ে থেকে সে টের পায় অন্ধকার স্টেডিয়াম থেকে ভূতেরা নেমে আসছে। তাদের দীর্ঘ কালো শরীর বাতাসে দোল খায়। বাতাসে লতিয়ে লতিয়ে তারা চলে। অন্ধকারে হাজার-হাজার ভূত এসে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তারা তার কানে-কানে বলল—চলো, খেলবে।
চোখের জল মুছে ছেলেটি ওঠে। ভূতেরা তাকে প্যাড পরায়, গ্লাভস পরায়, হাতে ব্যাট ধরিয়ে দেয়। তারপর মহানন্দে হাততালি দেয় তারা।
ছেলেটি পিচের ওপর এসে স্ট্যানস নেয়। অন্ধকারে দেখা যায় আম্পায়ারের বদলে কেবল টুপি আর সাদা কোট দাঁড়িয়ে আছে। একটা ভূত এশিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে একটা নরমুণ্ড ছিঁড়ে আনে, তারপর দৌড়ে এসে বল করার ভঙ্গিতে ছুড়ে দেয় তার দিকে। ছেলেটা চমৎকার একটা কাট মারে, মুণ্ডুটা ছিটকে যায় মহাকাশে। মহারোল ওঠে চারধারে, হর্ষধ্বনি শোনা যায়। আবার আফ্রিকার দিকে হাত বাড়িয়ে একটা নরমুণ্ড ছিঁড়ে নিয়ে আর একজন দৌড়ে আসে।
এই রকমভাবে খেলা চলে আর চলে। এ খেলা আর শেষ হতে চায় না। যেন অনন্তকাল ধরে এই শেষহীন খেলা চলবেই। সে কোনওদিন আউট হবে না।
ছেলেটির আর দুঃখ থাকে না।
.
অনেক রাতে একটা গোয়ালঘরের মেঝের খড়ের ওপর গর্ভবতী বউটি এক নির্জীব শিশু ছেলেকে প্রসব করছে। জন্মের পর ছেলেরা কাঁদে, এ শিশুটিও কাঁদল। কিন্তু উপোসী মার শুষ্ক গর্ভ থেকে সে সামান্যই জীবনীশক্তি আনতে পেরেছে, তাই তার অতিক্ষীণ কান্নার আওয়াজ তার মাও শুনতে পেল না।
সে মুমূর্ষ কণ্ঠে জিগ্যেস করে—ও দিদি, বেঁচে আছে তো!
.
বাইরে বিপুল অন্ধকার। পুরুষেরা বাইরে বসে আছে হাঁ করে। আজ তাদের রেলগাড়ি করে শহরে যাওয়া হল না। কবে হবে কে জানে! আর একটা পেট বাড়ল।
