সেক্রেটারি ডেথ কথাটা কেটে দিল।
.
ন’পাড়ার অবস্থা ভালো নয়। ধানভাসি বান এসেছিল এবার। দশ দিন ঠায় জল দাঁড়িয়ে রইল মাঠে আহাম্মকের মতো। ধান পচে গোবর। ছোট্ট জায়গার ছোট্ট মানুষ সব, কে তাদের খবর রাখে।
হাতে মাথায় পোঁটলা পুঁটলি নিয়ে একটা পরিবার উদোম মাঠটা পেরোচ্ছে পিঁপড়ের মতো। গোটা দুই দুরকম বয়সি বউ, ছ’রকম বয়সের ছ’টা ছেলেমেয়ে, তিনটে এক বয়সি বুড়ি, একটা বুড়ো, তিনটে মরদ।
শঙ্খচূড় সাপের খোলস সজনের ডালে লটকে আছে। বানের সময় ওই অত উঁচুতে উঠেছিল সাপটা। একটা ছেলে ঢেলা মারল। পাতলা কাগজের মতো খোলসটা হাওয়ায় উড়ছে ফুরফুর করে। ঢেলাটা লাগল বটে, খোলসটা পড়ল না। ঢেলাটা বুরুশ করে চলে গেল।
এক বউয়ের দশমেসে পেট। সে বলল—আস্তে চলে।
তার বর থেমে একটু মুখ ঘুরিয়ে দেখে নেয়। বলল বাবুদের রেলগাড়ি কি তোর মতো চাষানির জন্য বসে থাকবে নাকি।
–না থাকল। এখানে পড়ে থাকব কোথাও। তোমরা যাও।
—অত ঢিসকোতে-ক্সিকোতে হাঁটিস না। কদমের আর-একটু জোর কর।
বউটা বলে—পারব না।
–পোঁটলাটা আমার হাতে দে।
–তোমার তো আরও পুঁটলি আছে, নেবে কোথায়। হাত দুটো বই তো নয়।
—পারব।
মরদটার তেমন জোরবল নেই, কাঁকলাশের মতো চেহারা। তবু কোত্থেকে যেন তিন নম্বর আর একটা হাত বের করে পোঁটলাটা নিয়ে নিল। গলাটা চেপে বলল—পেটের বোঝাটা ব ঠিকমতো।
অপরূপ এক বিকেলবেলা চারধারে। কোদালে মেঘের চাপগুলো চুন হলুদ রং মেখে পশ্চিমের আকাশে ছয়লাপ হয়ে আছে। রূপকথার রাঙা আলোয় চারধারে স্বপ্নের মতো জগৎ। শিশুরা এই সৌন্দর্যের মধ্যে চেঁচিয়ে কথা বলে। বড়রা গম্ভীর, চুপ। রোদে পোড়া গাছপালার বন্য গন্ধ আসছে। এ সময়ে একটা বিশাল উড়োজাহাজ ঝুম করে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। সবাই হাঁ করে দেখে একটু। কারা যায় ওইসব কলের পাখি করে?
পেটে খিদে মরে গিয়ে একটা গোঁতলানি এল গর্ভবতী বউটির। বুক চেপে সে মাঠের মধ্যে বসে পড়ে। তার পেট থেকে ওয়াক তুলে কেবল জল বেরিয়ে আসে।
এখানে কিছু তালগাছের জড়াজড়ি। তার মাঝখানে ছোট্ট একটু পুকুর। জল শুকিয়ে অনেকখানি কাদাজমি বেরিয়ে আছে দাঁতের মাড়ির মতো। মাঝখানে ছোট্ট একটু জলের চাকতি। বউয়ের বরটা কাদামাটির ওপর দিয়ে পা টিপেটিপে নামছিল। চারধারে পাখিরা ক্যাচাল করছে। পোকামাকড়ের শব্দ। নিথর জলের কাছে এসে লোকটি ঘটি ডোবানোর আগে স্থির জলে নিজের ভূতুড়ে মুখের ছায়া দেখল। এ মুখ একটা মুখ মাত্র। মানুষের মুখ বলে বোঝা যায় ঠাহর করলে। ঘটিটা ডোবাতেই হিজিবিজি হয়ে শতখান হয়ে গেল মুখখানা। লোকটা বলল—যা শেষ হয়ে যা!
.
মেলবোর্নের ক্রিকেট মাঠে এখন রাত্রি। অনেকক্ষণ আগে দিনের খেলা শেষ হয়ে গেছে। শূন্য স্টেডিয়াম, অন্ধকার মাঠ, কেউ কোথাও নেই। শুধু একজন তরুণ কোনও ফাঁকে এসে মাঠে ঢুকেছে। প্যাভিলিয়ানের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সে অস্থির হাতে একটা সিগারেট ধরাল। আকাশে তারা ঝিকমিক করছে। মৃদু বাতাস।
ছেলেটা মাঠের সীমানার ধারে, সামনে পা ছড়িয়ে বসল। তার চোখে জল। জীবনের প্রথম টেস্টম্যাচ খেলতে নেমেছিল সে। প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়ে যায়। ড্রেসিংরুমে ফিরে এলে ক্যাপ্টেন পিঠ চাপড়ে বলেছিল—বব, ঘাবড়াবার কিছু নেই। সেকেন্ড ইনিংসে সেঞ্চুরি করবে।
দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে নেমেছিল আজ লাঞ্চ-এর পর। তার প্রেমিকা জ্যানেট স্ট্যান্ডে বসে খেলা দেখছে। দেখছে মা বাবা বন্ধুরা। নতুন টেস্ট খেলোয়াড়ের জন্ম দেখছে লক্ষ দর্শক, স্টেডিয়ামে বা টিভি-তে।
তার খেলা দেখে সকলেই বলত—এ হবে দ্বিতীয় ব্র্যাডম্যান।
ছেলেটিরও তাই বিশ্বাস ছিল। জীবনের প্রথম টেস্ট ম্যাচে খেলতে নেমে সে ভেবেছিল, আর পিছু ফিরে তাকানোর কিছু নেই।
দ্বিতীয় ইনিংস সে শুরুও করেছিল ভালো। প্রথম চার ওভারে তিনটে চার আর দুটো এক রান। বেশ ভালো শুরু। আধঘণ্টা সে ক্রিজে চমক্কার অবস্থান করছিল। তারপরই একটা বল এল লেগ স্ট্যাম্পের ওপর। মনে হয়েছিল সহজ বল, সুইপ করলে স্কোয়ার লেগ দিয়ে সীমানা পার হবে। করেওছিল সুইপ। কিন্তু ভূতুড়ে বলটা হঠাৎ পিচ থেকে ওপরে না উঠে মাথা নীচু করে মিডলস্ট্যাম্পের দিকে সরে এল। আর তখন স্ট্যাম্প আড়াল করে রয়েছে তার পা। পায়ে বলটা লাগতেই চারদিকে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে বিপক্ষের খেলোয়াড়—হাও! আম্পায়ার বিনা দ্বিধায় আঙুল তোলে। ছেলেটি আম্পায়ারের দিকে তাকায়ওনি। সে জানত আউট হয়ে গেছে সে। যখন প্যাভিলিয়নের দিকে ফিরে আসছিল তখন কেউ হা-হুতাশ করেনি, হাততালিও দেয়নি। শুধু একটা চ্যাংড়া ছেলে একদলা চুইংগাম ছুড়ে মেরেছিল তাকে, সেটা এসে তার বুকে আটকে যায়।
ড্রেসিংরুমে দু-একজন তাকে স্তোক দিয়েছিল। ছেলেটি কিছুই শুনতে পায়নি। ড্রেসিংরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে তরুণী জ্যানেট কাঁদছিল। ছেলেটির বাবা একবার ঘরে এসে তার পিঠে হাত রেখে নীরবে বসে থেকে গেল কিছুক্ষণ। গভীর রাতে হোটেল থেকে চুপিচুপি চলে এসেছে ছেলেটি, মেলবোর্নের অন্ধকার ক্রিকেট মাঠে বসে আছে।
আকাশে একটা তারা খসল।
সিগারেট শেষ হয়ে গেল।
এই মাঠে কাল তারা অবশ্যই হেরে যাবে। হাতে মোট দুটো উইকেট আছে, তুলতেই হবে আরও দুশো রান, ছেলেটির ওপর নির্ভর ছিল দলের। সে পারেনি।
