মেয়েটি বলে—আমার দিকে তাকাও। দেখ না আমাকে।
সুবোধ গরুর মতো নিরীহ চোখে তাকায়। হাসে। বলে—দূর। তোমার দ্বারা হবে না।
-কেন?
-তুমি তো পরিষ্কার মেয়ে। কিছু লুকোনো নেই তোমার। তোমাকে একটুও সন্দেহ হয় না।
বাঃ। তা তুমি চাও কি? সন্দেহ করতে। বলতে বলতে সে সুবোধ। হেসে চোখ ফিরিয়ে নেয়।
ক্রিকেট
হরিবোল বুড়ো এসে ওই বসে আছে শিমুল গাছের তলায়। নিষ্পত্র গাছ, তার ছায়া নেই। গাছের কঙ্কালসার হাতগুলি রোদের দিকে বাড়ানো, ঠিক কাঙাল ভিখিরির হাতের মতো। শীতের শেষে যখন বসন্ত আসবে তখন তার হাত ভরে দেবে ফুলে। কে তার হাত ফুলে ভরে দেয় তা বোঝা যায় না। কিন্তু কেউ দেয়।
হরিবোল বুড়ো একা বসে আছে। ভারী অস্বস্তি তার। পাড়ার ছেলেগুলো এইবেলায় ধারে কাছে ডাংগুলি খেলে, সেগুলো আজ বেপাত্তা। কোথা গেল সব সোনার চাঁদ হাড়হাভাতেগুলো? গাছের ছায়া নেই, রোদ মুখে পড়েছে। তা এ রোদ বড় মিঠে, শীতের রোদ তো, কুসুম গরম।
পেয়াদা বগলাচরণ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, হাঁক পেড়ে বলে,—কে, হরিবোল খুড়ো নাকি? মাগতে বেরিয়েছ?
–বসে আছি বাবা। কিছু অন্যায় হয়নি তো?
—না, কী আর অন্যায় হবে! তবে বলি, ছোঁড়াগুলো যে হরিবোল বললেই তেড়ে মারতে যাও সেটা ঠিক হচ্ছে না। কবে কোনটাকে জখমে করবে, অমনি থানায় গিয়ে এত্তেলা করবে।
—আজ সারাদিন উপোস আছি বাবা, অত কথা ভিতরে সেঁধোচ্ছে না।
–উপোস আছ! বগলাচরণ দু-পা এগিয়ে কোমরে হাত রেখে বলে—সেটা কীরকম? গতকালই তো অধর ভটচার্যের শ্রাদ্ধে সিধে পেলে।
হরিবোল বুড়ো উদাস হয়ে বলে—ভাই, আমি সারাদিন খাইনি, আজ কেউ হরি বলেনি। তুমি একবার হরিবোল-হরিবোল বলো, তবেই আমার পেট পুরে যাবে, এই ভিক্ষা চাই।
–বটে! তবে এই বললুম, হরিবোল-হরিবোল।
হাসতে-হাসতে বগলাচরণ বিষয়কর্মে যায়।
উড়োজাহাজের জানালা দিয়ে ইভান ওয়েলচ খুব নিরাসক্তভাবে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। বোয়িং জেট বিমানটি আকাশ ছিঁড়ে ফেলছে শব্দে-শব্দে। কিন্তু ভিতরে কিছুই টের পাওয়া যায় না। অতি ক্ষীণ একটু থরথরানি, অতি মৃদু একটু গোঙানির আওয়াজ।
একটু আগেই কালো কফি খেয়েছে ইভান, একটু হুইস্কি মিশিয়ে। তবু বড় ক্লান্তি লাগে। টোকিও থেকে সিঙ্গাপুর, দূরপ্রাচ্য, তারপর আবার ভারতের বম্বে শহর ছুঁয়ে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপের দিকে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মস্ত প্রতিনিধি ইভানকে সারা পৃথিবী দৌড়ে বেড়াতে হয়। গোটা এক সপ্তাহেও তার বিশ্রাম নেই। আজ নিউইয়র্ক তো কাল হংকং, দু-দিন বাদে মেলবোর্ন, তারপর বেইরুট কি বার্লিন। বড় ক্লান্ত। বোয়িং-এর গতিকে বড্ড কম বলে মনে হয় ইভানের। কনকর্ড বিমান চালু হলে আরও অনেক বেশি গতিতে উড়ে যাওয়া যাবে। তখন ইভান হয়তো আর একটু সময় পাবে বিশ্রামের। তার বয়স পঞ্চান্নর কাছাকাছি। খুবই শক্ত সমর্থ চেহারা। মাথায় প্রচণ্ড সব চিন্তা। সারা পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যা যেন তার মাথার কম্পিউটারে অনবরত ভরে দেওয়া হচ্ছে। পাশে বসা সেক্রেটারিকে ডিকটেশন দিচ্ছিল ইভান। একটু বাদেই মেসেজটা বম্বে থেকে টেলেক্স করতে হবে। জরুরি। তবু ইভান হঠাৎ থেমে গেল। জানলা দিয়ে দেখতে পেল, এক ধূসরতার ভিতরে সূর্যাস্ত ঘটছে। আকাশে খণ্ড মেঘ, নীচে একটা মাঠ। বিমান কিছু নীচু হয়ে যাচ্ছে। এক পলকের জন্য ইভানের মনে হল, বহু নীচে লম্বা কয়েকটা গাছের ফাঁক দিয়ে ছোট্ট আয়নার মতো জল চকচক করে উঠল। অতখানি মাঠ অত সহজে এক চিলতে পলকে পার হয়ে গেল তার বিমান। পশ্চিমের দিকে সূর্য ডুবছিল, কিন্তু বিমানটি যেহেতু পশ্চিমেই যাচ্ছে সেইহেতু সূর্যাস্ত ঘটল না। বরং বিমানের উন্মাদ গতি সূর্যকে কয়েক ইঞ্চি ঊধ্বাকাশে তুলে আনল যেন। ঝকঝকিয়ে উঠল রোদ। ইভানের জীবনে নিশ্চিত সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত কমই ঘটে। জাপানে একবার সূর্যোদয় দেখে সে আবার সিঙ্গাপুরে দ্বিতীয়বার সূর্যোদয় দেখছে একই দিনে। তার ওমেগা হাতঘড়ি সপ্তাহে সাতবার আন্তর্জাতিক সময়সীমা পার হয়।
খুব ক্লান্ত লাগছিল ইভানের। তার জীবনে বড় অতৃপ্তি। সে যেমনটা চেয়েছিল জীবনটা ঠিক তেমনই হয়েছে। কী আশ্চর্য, সে যা চায় তাই মুহূর্তের মধ্যে পেয়ে যায়। মেয়েমানুষ, টাকা, সৎমান, উচ্চপদ, কিছুই বাকি থাকে না। কে যেন তার জন্য পৃথিবীময় এক ঐশ্বর্যের ভাণ্ডার খুলে দিয়েছে। তার স্বাস্থ্যও অফুরন্ত। সেই কারণেই কি এত অতৃপ্তি?
ইভান ভাবল, এবার একদিন সে উপোস থেকে দেখবে। আর, সাতদিন মেয়েমানুষকে ছোঁবে। আর, গ্রামের দিকে গিয়ে অনেকক্ষণ ঘাসের ওপর হেঁটে-হেঁটে পোকামাকড় আর ফড়িং দেখবে। পাখির শিসের নকল করবে।
ইভান একটা শ্বাস ফেলে বলল—দেন ডেথ!
সেক্রেটারি এ কথাটাও ভুল করে টুকে নিয়ে চমকে বলল—ইয়েস মিস্টার ওয়েলচ? হোয়াট অ্যাবাউট ডেথ?
ইভান সেক্রেটারির ভুল বুঝতে পেরে ভীষণ হেসে ফেলল। এত হাসল যে তার চোখে জল এসে গেল। হাসতে-হাসতে কাশি এল। কাশতে-কাশতে রক্তাক্ত হয়ে গেল মুখ। পাঁচ ডলার দামের রুমাল মুখ চেপে সে বেদম হচ্ছিল। হোসটেস ছুটে এল।
ইভান হাত তুলে তাদের নিবৃত্ত করে নাক ঝাড়ল জোরে। সামলে নিয়ে সেক্রেটারিকে বলল —আই জাস্ট থট অ্যালাউড।
ইভান মনশ্চক্ষে একটু আগে দেখা ধূসর মাঠটাকে আবার যেন দেখতে পেল। মাঠটা দেখেই কি হঠাৎ মৃত্যুর কথা মনে এল তার।
