বেশিক্ষণ লাগল না। অনভ্যাসের মদ তার মাথায় ঠেলা মারতে থাকে। আস্তে আস্তে গুলিয়ে যায় চিন্তা ভাবনা, শরীরের মধ্যে একটা অবোধ কষ্ট হতে থাকে, পা দুটো ভারী হয়ে ঝিন ঝিন করে। এই তো বেশ নেশা হচ্ছে—ভেবে সুবোধ কাউন্টারের কাছে দাঁড়ানো একটি মেয়ের দিকে তাকায়। চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটি পরিচিতার মতো হাসে। সুবোধ হেসে তার উত্তর দেয়। পরমুহূর্তেই গ্লাসে চুমুক দিয়ে চোখ তুলে সে দেখে মেয়েটি তার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে আছে। মেয়েটি কালো, মোটা থলথলে বয়স ত্রিশের এদিক ওদিক। মেয়েটি বলে–বাব্বাঃ তেষ্টায় বুক শুকিয়ে যাচ্ছে। একটু খাওয়াও তো।
কোনো কোনো বন্ধুর কাছে এদের কথা শুনেছে সুবোধ। তাই অবাক হয় না। মেয়েটির জন্যও এক পেগের হুকুম দিয়ে সে জিজ্ঞেস করে—তোমার ঘর কোথায়?
–কাছেই। যাবে?
—মন্দ কী?
–তবে আরো দু পেগের কথা বলে দাও। তাড়াতাড়ি বলো। এরপর বন্ধ হয়ে যাবে।
সুবোধ আরো দু পেগের কথা বলে দিয়ে হাসল—মদ খাও কেন?–তুমি খাও কেন?
আমার বউ চলে গেছে।
-আমারও স্বামী চলে গেছে। বলেই মেয়েটি ভ্রু কুঁচকে বলে–শোনো ঘরে যেতে কিন্তু ট্যাক্সি করতে হবে। হেঁটে যেতে নেশা থাকে না।
—ট্যাক্সি! হাঃ হাঃ। বলে হাসল সুবোধ। তার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। বলল—আমার বৌয়ের গল্প তোমাকে শোনাবো আজ
-খুব ছেনাল ছিল?
–না না। ছোল নয় তবে অন্যরকম—
–চলে গেল কেন?
—সেটাই তো গল্প। —ওরকম আকছার হচ্ছে। তোমার বৌয়ের দুঃখ আমি ভুলিয়ে দেবো।
—দুঃখ! বড় অবাক হল সুবোধ। দুঃখের কোনো ব্যাপারই তো নয় নীলার চলে-যাওয়াটা! তবু নেশার ঘোরে এখন তার মনটা হু-হু করে উঠল। দুঃখিত মনে সে মাথা নেড়ে বলল—হ্যাঁ খুব দুঃখের গল্প—
—কেটে যাবে। বিলটা মিটিয়ে দাও।
বিল মেটাল সুবোধ। তারপরও গোটা ত্রিশেক টাকা রইল ব্যাগে। মেয়েটা আড়চোখে দেখে বলল—তুমি কি আমার ঘরে সারারাত থাকবে?
—মন্দ কী? সুবোধ হাসল।
—ত্রিশ টাকায় হবে না কিন্তু।
—হবে না?
—হয়! বলো না, এই বাজারে…ত্রিশ টাকায় ঘণ্টা দুই, তার বেশি না।
–না। ত্রিশ টাকায় সারারাত।
—পাগল!
—তবে কেটে পড়ো। আমি কেরানীর বেশি কিছু না।
দাঁত বের করে হাসল মেয়েটি। গ্লাস নিঃশেষ করে আঁচলে মুখ মুছল। বলল—মদ খাওয়ালে, ভালবাসলে, ছাড়তে ইচ্ছে করে না।
—কেটে পড়ো।
—ঠিক আছে। চলো। ত্রিশটাকাতেই হবে। আহা, তোমার বৌ চলে গেছেনা? ঠিক আছে। চলো তো দেখি তোমার বৌ ভাল না আমি ভাল। বলতে বলতে সুবোধকে হাত ধরে টেনে তুলল মেয়েটা।
ট্যাক্সিতে সুবোধ মেয়েটির কাঁধে মাথা রেখেছিল। সস্তা প্রসাধন আর তেলের বিশ্রী গন্ধ। তবু মুখ সরিয়ে নিতে তার ইচ্ছে করছিল না। মেয়েটি ট্যাক্সিওলাকে নানা জটিল পথে নিয়ে যেতে বলছে। কথা আর কথায় বুক ভরে আসছিল সুবোধের। সে অনর্গল কথা বলছিলনীলার কথা, কাল রাতের স্বপ্নের কথা, মেজদার কথা, মরা মেয়েটার কথা। কখনো সে বলছিল সে এবার বেড়াতে যাবে হরিদ্বারে, যাবে ঘোড়দৌড়ের মাঠে, ফুটবল ম্যাচ দেখবে। একা একাই থাকবে সে। মেয়েটি কোনো কথাতেই কান দিল না। শুধু মাঝেমাঝে বলল—শুয়ে পোড় না বাপু গায়ের ওপর। পুরুষমানুষগুলো যা ন্যাতানো হয়, একটু দুঃখটুঃখ হলেই গড়িয়ে পড়ে। কথাগুলো ঠিকঠাক বুঝতে পারছিল না সুবোধ! দুঃখ! দুঃখ কিসের! মেয়েটি জানেই না তার মন রঙীন একখানা রুমালের মতো উড়ছে।
ট্যাক্সি যেখানে থামল সে জায়গাটা সুবোধ চিনল না। শুধু টের পেল গোলকধাঁধার মতো খুব জটিল প্রকাণ্ড একটা বাড়ির মধ্যে সে ঢুকে যাচ্ছে। অনেক সিঁড়ি, সরু বারান্দা, আবার সিঁড়ি বিচিত্র অচেনা লোকজন, মাতাল, বেশ্যা, ফড়ের গা ঘেঁষে মেয়েটি তাকে নিয়ে যাচ্ছে। নিয়ে যাচ্ছে নীলার দুঃখ ভুলিয়ে দিতে। অথচ জানে না দুঃখই নেই আসলে। ভেবে সে হাসল—ভাল জায়গায় থাকো তুমি কি যেন নাম তোমার!
মেয়েটি বলল–অনিলা।
হাসল সুবোধ—চালাকী হচ্ছে?
-কেন?
—আমার বৌয়ের নাম তো নীলা।
—ওমা! তাই নাকি! বলোনি ত!
–বলিনি?
–না। মাইরী…
চালাকী হচ্ছে? অ্যাঁ।
মেয়েটি হাসে—সত্যিই আমি অনিলা। তোমার বৌয়ের উল্টো। দেখো প্রমাণ পাবে। খুব সুন্দরী ছিল তোমার বৌ? ফর্সা?
–না। কালোই। মন্দ না।
—খুব কালো?
–না। শ্যামবর্ণ। এই আমার গায়ের রঙ।
—ওমা। তুমি তো ফর্সাই!
–যাঃ–হাসল সুবোধ। লজ্জায়।
ঘরখানা ভালোই। ছিমছাম। বসতে ঘেন্না হয় না। পরিষ্কার বিছানাটাই আগে চোখে পড়ল সুবোধের। ভারী মাথা নিয়ে গড়িয়ে পড়ল। বলল–মদ খেয়ে কিছু হয় না। উত্তেজনা লাগছে না।
—আর খাবে।
–না। পয়সা নেই।
—পয়সা না থাক, ঘড়ি আংটি আছে। জমা রেখে খেতে পারো, পরে পয়সা দিয়ে ছাড়িয়ে নেবে।
-না। আর খেলে ঘুম পাবে, বমিও হবে।
—তবে থাক।
সুবোধ মেয়েটিকে অনাবৃত হতে দেখেছিল। হঠাৎ কি খেয়াল হল, জিজ্ঞেস করল—আজ কি তোমার আর খদ্দের আছে? তাড়াতাড়ি করছ কেন?
মেয়েটি হাসল—আছে। কিন্তু তাতে তোমার কি! তোমাকে আলাদা বিছানা করে ঘুম পাড়িয়ে রাখবো। তুমি টেরও পাবে না।
—পাবো না?
–না।
মেয়েটি কাছে আসে। আস্তে আস্তে উঠে বসে সুবোধ—তুমি তো অনিলা!
—হুঁ।
—দূর। তাহলে হবে না। বলে হাই তোলে সুবোধ।
–কেন?
সুবোধ উত্তর দেয় না! অন্যমনস্ক চোখে চেয়ে থাকে। নীলা! নীলা এখন কোথায়। তার মাথার মধ্যে নানা চিন্তা ঘুরপাক খায়। পৃথিবীময় লক্ষ লক্ষ পুরুষ। তার। মধ্যে নীলা একা কোথায় চলে গেল? কী করছে এখন নীলা?
