শীতের দুপুরে যখন রোদে কাঁসাপেতলের রং ধরে তখন সেই রোদের ওম-এ বসে চারজন লুডো খেলে। ঠাকুমা, মা, চুষি আর পান্তি, কখনও কানু। কাকিমা ছেলে হতে বাপের বাড়ি গেছে, নইলে সেও খেলে। দাদু মারা যাওয়ার পরপরই ঠাকুমা আমিষ, পাড়ওলা শাড়ি আর পান-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। তারপর একরাতে স্বপ্ন দেখল, দাদু এসে ঠাকুমার বাঁ-হাতের ওপর ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে বলছে—তুমি যে পান খাও না তাতে আমার বড় কষ্ট হয়। আর কিছু না হোক পানটা অন্তত খেও। সেই থেকে ঠাকুমা আবার পান খাওয়া ধরল।
মুখে রসস্থ পান থাকলে লুডো খেলবার বড় অসুবিধে। মুখ নীচু করলেই কোন ফাঁকে পানের পিক ফুচুক করে বেরিয়ে যায়। ঠাকুমার আবার সামনের দিকে দুটো দাঁত না থাকায় পানের রসে বাঁধ দেওয়ারও উপায় নেই।
ছক্কা চেলে ঠাকুমা তাই উধ্বপানে মুখ তুলে জিগ্যেস করে–কটো?
কানু বা মা বা চুষি চাল দেখে দেয়। ঘর গুনে গুটিও চেলে দেয়। ঠাকুমা ঘাড় কাত করে দেখে। কানু ঠাকুমার গুটি চাললে ঘর চুরি করবেই। মহা চোট্টা।
সেদিন ছুটির দিনের দুপুরে যখন খেলা জমে উঠেছে তখন পান্তি এসে খবর দিল, কাকার ঘরে চৌকির তলায় এক বেড়ালনী মুখে করে-করে তার আঁতুড়েছানা এনে রাখছে।
—তাড়াও! তাড়াও! বলে চুষি লাফিয়ে উঠেছিল।
পাশের ঘর থেকে বাবা উঠে এসে প্লাস পাওয়ার চশমাটা খুলে হাতে নিয়ে বলল—কোথায় বেড়ালছানা দেখি?
সবাই গিয়ে দেখে। বেড়ালের বাচ্চাগুলো দেখতে কিন্তু বেশ। একেবারে পাউডার পাফ-এর মতো। একটার পেটের তলা দিয়ে আর একটা মুখ বের করে আছে। একটা অন্যটার গা বাইছে। আর মিহি স্বরে ‘মিউমিউ’ করে যাচ্ছে অনবরত। ধাড়ি বেড়ালটা বাচ্চা রেখে পালিয়েছে কোথাও। লোকজন সরে গেলে আসবে।
বাবা ঘোষণা করল–বাচ্চাগুলোর খিদে পেয়েছে। ওদের একটু দুধ এনে দে তো চুষি।
মা বলল—দুধ কি ওরা চেটে খেতে পারে? খামোখা দেওয়া!
—আহা, দিয়েই দেখনা। খিদে পেলে বাঘে ধান খায় শুনেছি!
দেওয়া হল। কুসির খেলাঘরের একটা ছোট্ট বাটিতে করে। সে বাটির দিকে ফিরেও তাকাল বাচ্চাগুলো। বরং একটার গায়ে ধাক্কা লেগে বাটি উলটে দুধটুকু পড়ে গেল। পরে ধাড়িটা এসে সে দুধ চেটে খায়।
সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেখা গেল বাবার আর কুসির। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে বাবা চা আর কুসি দুধ খেয়েই গিয়ে কাকার ঘরের চৌকির সামনে উবু হয়ে বসে বেড়ালছানা দেখে। রাতে শোওয়ার আগেও বাবা গিয়ে টর্চ ফেলে দেখে আসে। পান্তিকে বলে—একটা ন্যাকড়া ট্যাকড়া কয়েক ভাঁজ করে ঢেকে দিস ওগুলোকে। শীতে কষ্ট পায়।
মা বলে—হুঁঃ বেড়ালরা কত যেন কোট প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়ায় শীতকালে!
—আঃ হাঃ, তোমার কেবল সব বিষয়ে ফোড়ন কাটা।
মা-বাবার রোজই লেগে যায়। তাতে অবশ্য মা রোজই দুই-তিন গোলে জেতে। ঝগড়ার শেষে মা প্রমাণ করে ছাড়ল যে, জীবজন্তুদের শীত লাগার কথা নয়। বাবা স্বীকার করল না বটে, তবে বেড়ালছানা চাপা দেওয়ার জন্য আর চাপাচাপিও করল না। মা কিন্তু শোওয়ার আগে একটা ঝুড়িতে চট পেতে নিয়ে গিয়ে ধাড়িসুষ্ঠু ছানাগুলোর জন্য চমৎকার বাসা করে দিল।
শুখা বাতাস আর রোদের তাপ কমে চারদিককার শীতভাব শুষে নিতে লাগল। কুয়োর জল অনেক নীচে নেমে গেছে। শিমুলগাছে ফুল এল। বাবুদা ডাকঘরে কেরানির চাকরি পেয়ে বাইরে চলে যাওয়ার আগে একদিন এসে মা-বাবাকে প্রণাম করে গেল। আগে কখনও এরকম প্রণাম ট্রনাম করেনি।
বাবুদা চলে গেলে কী হয় এখন কিন্তু চুষি ঠিক টের পায় তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকবার লোকের অভাব নেই। চুষির বুকের ভিতরে হৃৎপিণ্ড ঝলকে-ঝলকে ফোয়ারার মতো রক্তস্রোত বইয়ে দেয়। শরীর জুড়ে সেই রক্ত ঝরনার মতো ঝরে পড়ে। দিনরাত নিজের শরীরে এক অন্তর্গত ঝরনার শব্দ শোনে সে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গালের একটা ব্রণ টিপল চুষি। টিপতে নেই, তাহলে বাড়ে। তবু গালে একটা টুসটুসে ব্রণ দেখতে পেলে সেটার ভাত বের না করেই বা থাকে কী করে মানুষ?
ব্রণটা গেলে দিয়ে জায়গাটায় একটু ক্রিম ঘষে দিল সে। মুখখানা বারবার ঘুরিয়ে দেখল। একটু নাচের ভঙ্গি করল। আজকাল অনেক কিছু টের পায় চুষি। শরীর, মন মানুষের চোখ।
কখনও কলঘরে গিয়ে নিজেকে খুঁজে দেখে চুষি। দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়। এ কী! এ মা! সে যে কচি মেয়েটা ছিল এতদিন! বড় হয়ে গেল?
মাঝে-মাঝে রোদে হাওয়ায় ভেসে যেতে-যেতে খুব হোঃ হোঃ হাসতে ইচ্ছে করে তার।
আবার এক একদিন এমন হয়, কুয়োতলা ছাড়িয়ে পিছনের লাউমাচার ছায়ায় বসে দুপুরবেলার নির্জনে বিভোর হয়ে কাঁদে। বেড়ালছানাগুলো আজকাল দরদালানে আসে, ঘরে আসে। ঠাকুমা প্রথম-প্রথম তাড়া দিত—যাঃ, যাঃ, এক্ষুনি সব ছুঁয়ে-ছেনে দেবে।
কিছুদিন বাদে ঠাকুমা আর তাড়া দেয় না। বেড়ালরা দালানে ঘোরে। ঘরে খেলা করে। ফুটফুটে ছানাগুলোকে এ ও সে কোলে নিয়ে খানিক আদর করে ছেড়ে দেয়, লুডোর ছক পেতে দিলে বেড়ালছানারা দিব্বি পা দিয়ে ছকটা উলটেপালটে খেলা করে।
কুসিও খেলে। সে আজকাল খুব বউ সাজতে ভালোবাসে। বাবা ছোট ডুরে শাড়ি কিনে দিয়েছে। চুষি তাকে শাড়ি পরিয়ে বউ সাজায়। কুসি পুতুল-ছেলে কোলে করে একদম মায়ের ভাষায় আদর করে শাসন করে। পাকা মেয়ে।
