বাবা দেখে বলে—ওঃ বাবা, মেয়ের বিয়ের কথা ভাবলেই বুক কেমন করে।
মা বলে—তা বিয়ের খরচের কথা ভাবলে ওরকম অনেকের হয়! মেয়ের বিয়েতে খরচ তো করতেই হবে।
বাবা বিরক্ত হয়ে বলে—সবসময় টাকার কথা ভেবে কথা বলি নাকি। মেয়ের বিয়ে দিতে মনের কষ্টও তো আছে।
—তুমি কি সে ভেবে বলেছ!
আবার মাতে বাবাতে লেগে যায়। মা জেতে। বাবা হেরে গিয়ে রেগে কুয়ো থেকে দশ বিশ বালতি জল তুলে ফেলে।
তুলোর আঁশ বাতাসে উড়ে যায়। উঠোনের রোদে সাদা আর সাদা-কালো বেড়ালছানারা এখন গম্ভীরভাবে বসে থাকে থুপ হয়ে। তুলোর আঁশ দেখলে লাফিয়ে-লাফিয়ে ধরার চেষ্টা করে। ঘর দোরে আসে, বিছানায় ওঠে। ধাড়িটা আর বাচ্চাগুলোর কাছে তেমন ঘেঁষে না, পাড়াবেড়ায় চৌপর দিন।
কাকিমা বাচ্চা কোলে করে ফিরে এল একদিন। বাড়িময় ছুটোছুটি পড়ে গেল। আদর আর কাড়াকাড়িতে বাচ্চাটা ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠে। তার পর চুপ করে যায়। তারপর এর কোলে তার কোলে ঝাঁপ খেয়ে যেতে শিখে যায়।
বাবা বলে—মানুষের বাচ্চার চেয়ে বেড়ালের বাচ্চারা অনেক বেশি সাবালক। তারা খুব তাড়াতাড়ি সেলফ-ডিপেন্ডেন্ট হয়।
ধর ডাক্তার বলে—সাবালক হয়, কিন্তু বেড়াল বাচ্চারা কোনওদিনই মানুষ হয় না কথাটা মনে রেখো।
–বোকার মতো কথা বোলো না। বেড়াল মানুষ হতে যাবে কেন?
তা সে যাই হোক। কথাটা হল, চুষিদের বাড়িতে আগে কোনও বেড়াল ছিল না। এখন বেড়াল হয়েছে।
ওষুধ
উকিলবাবু এখনও আসেননি। মক্কেলরা বসে-বসে মশা মারছে।
দুর্গাপদ খুবই ধৈর্যশীল লোক। সে জানে, বড় অফিসার, বড় ডাক্তার, বড় উকিল ধরলে ধৈর্য রাখতে হয়। যে যত বড় সে তত ঘোরাবে।
দুর্গাপদ রাস্তা পেরিয়ে উলটোদিকের পানের দোকানে গিয়ে লেমনেড চাইল। তেষ্টা পেয়ে রয়েছে অনেকক্ষণ। উকিলবাবুর বাড়ির চাকরের কাছে জল চাইলে দিত নিশ্চয়ই, কিন্তু চাইতে কেমন ভয়-ভয় আর লজ্জা–লজ্জা করছিল তার।
দোকানদার বুড়ো মানুষ। তার দোকানটাও তেমনি কিছু বড় দোকান নয়। ছোট-খাটো, গরিবগুর্বোর দোকান। বিড়ি চাও আছে, পিলাপাতি কালাপাতি চমনবাহার মোহিনী জরদা দেওয়া পান পাবে, ক্যাপস্টান গোল্ড ফ্লেক চাও তাও মজুদ, কম দামি কোল্ড ড্রিংকস রাখতে হয় বলে তাও রাখা, কিন্তু বেশি বায়নাক্কা হলে অন্য দোকান দেখতে হবে।
বুড়ো তার লাল বাক্স খুলে বরফে ঠান্ডা বোতল অনেক বেছে গুছে একটা বের করে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে-এরকম ঠান্ডা হলে চলবে?
অন্যমনস্ক দুর্গাপদ বলে–হুঁঃ।
লজেনচুসের গন্ধওয়ালা ঠান্ডা, মিস্টি ঝাঁজালো জলটা খেতে গিয়ে বুকের জামা ভিজে গেল দুর্গাপদর। কাগজের নল দিয়ে টেনে সে এসব খেতে পারে না। চুরুক–চুরুক খাওয়া তার পছন্দ নয়। ঘঁৎঘঁৎ করে না গিললে তৃপ্তিটা পায় না।
জলটা খেতে-খেতে চেয়ে আছে উলটো দিকের বাড়িটার দিকে। না উকিলবাবু এখনও আসেননি।
কতকগুলো ব্যাপার আছে যা কেবল উকিল ডাক্তার বা অফিসাররাই জানে, আর কেউ জানে। মুশকিলটা সেখানেই। তার ওপর দুর্গাপদ কস্মিনকালে মামলা মোকদ্দমা বা কোর্টকাছারি করেনি। উকিলবাবু আগের দিনই সাফ বলে দিয়েছে–কেউ বিয়ে ভাঙতে চাইলে আটকানো কি যায়? কিছুদিন ঝুলিয়ে রাখতে পারি বড় জোর। আর চাও তো, বেশ ভালো মাসোহারার ব্যবস্থাও করে দিতে পারি। সে এমন ব্যবস্থা যাতে বাছাধনকে দ্বিতীয়বার বিয়ে বসতে খুব ভেবেচিন্তে বসতে হবে।
কিন্তু দুর্গাপদ তার জামাইকে খুব একটা অপছন্দ করে না। লোকটা নরম সরম ভদ্র, বিনয়ী, খরচে ধরনের। বরং তার মেয়ে লক্ষ্মীই ট্যাটন। বিয়ের আগে পাড়া জ্বালিয়েছে। বিয়ের পর বছর দুই যেতে-না-যেতে বাপের বাড়িতে এসে খাদিমা হয়ে বসেছে। জামাই নিতে আসেনি। জামাইয়ের বদলে দিনকুড়ি আগে জামাইয়ের পক্ষের এক উকিলের চিঠি এসেছে। জামাই ডিভোর্সের মামলা আনছে।
তার মেয়ে লক্ষ্মীর তাতে কোনও ভাব বৈলক্ষণ নেই। রেজিস্ট্রি করা খামটা খুলে চিঠিটা তেরছা নজরে পড়ে বারান্দায় ফেলে রেখে পা ছড়িয়ে উকুন বাছতে বসল সরু চিরুনি দিয়ে। বাতাসে উড়ে–উড়ে ঘুড়ির মতো লাট খেয়ে চিঠিটা করুণ মুখে এসে উঠোনে দুর্গাপদর পায়ের পাতায় লেগে রইল। দুর্গাপদ উঠোনে বসে একটা ভাঙা মিটসেফের ডালায় কবজা লাগাচ্ছিল। ইংরিজিতে লেখা চিঠিটা বুঝতে একটু দেরি হল বটে, কিন্তু অবশেষে বুঝল এবং মাথাটা তখনই একটা পাক মারল জোর।
জামাইবাবাজি যে লোক খুব খারাপ নয় তা জানে বলেই দুর্গাপদ কটমট করে তাকাল মেয়ের দিকে। কিন্তু এসব তাকানো–টাকানোয় ইদানীং আর কাজ হয় না। কোনওদিন হতও না।
–বলি ব্যাপারটা কী, শুনছিস? হুঙ্কার দিল দুর্গাপদ।
লক্ষ্মী সূক্ষ্ম চিরুনিতে উঠে আসা চুলের গোছা আলোয় তুলে উকুন খুঁজতে খুঁজতে নির্বিকার গলায় বলে–দেখলে তো, আবার জিগ্যেস করছ কেন?
দুর্গাপদ বুঝল পুরুষকারে কাজ হবে না। গলা নরম করে বলল –স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হয় সে তো দিন রাত্তিরের মতো সত্য। তা বলে উকিলের চিঠি কেন? তেমন কী হল তোদের?
লক্ষ্মীর মা ঘরেই ছিল। বরাবরের কুঁদুলি মেয়েছেলে। সেখান থেকেই গলা তুলে জিগ্যেস করল–কে উকিলের চিঠি দিল আবার?
–নবীন। হাল ছেড়ে দুর্গাপদ বলে।
–জামাই?
–তবে আর কে নবীন আছে?
লক্ষ্মীর মা কিছু মোটাসোটা। ফরসা গোলগাল প্রতিমার মতো চেহারা। বড়-বড় চোখে রক্ত হিম করা দৃষ্টিতে চাইতে পারে। দুর্গাপদর প্রাণ এই চোখের সামনে ভারী ধড়ফড় করে ওঠে।
