হুলোটা তাড়া খেয়ে ফের ছুটে আসে রান্নাঘরের বন্ধ দরজায় আছাড় খেতে। হারিকেন তুলে ধরে পান্তিও তাকে হুড়ো দিতে থাকে–যাঃ গ্যাদড়া মুখপোড়া দূর হ।
কিন্তু হুলোটা যাবেই বা কোথা দিয়ে! যাওয়ার কোনও পথ নেই! চুষিও তখন রাগে রি-রি করা গায়ে উঠে গিয়ে বাবার ছাতাটা হাতে করে নিয়ে এল।
মা ভিতর থেকে ডেকে বলল—দেখিস, ভয় পেয়ে যেন আঁচড়ে কামড়ে না দেয়। মায়েরা জানে অনেক। বাস্তবিক হুলোটাযা ভয় পেয়েছিল সে-রাতে।
তিনজন যখন তিন দিক থেকে তাকে ঘিরে ফেলেছে, তখন বারান্দার কোণে দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে বসেছে সেটা। দাঁত বার করে ঘ্যাও-ঘ্যাও করে আওয়াজ ছাড়ছে। ল্যাজটা আস্তে-আস্তে ঢেউ দিচ্ছে। কানু লাঠি বাড়াতেই সেটাকে একটা থাবা দিল জোর। চোখ জ্বলে উঠল হুলোটার।
চুষি বুঝতে পেরেছিল, কামড়াবে। কানু বোঝেনি। সে আর-এক দফা বীরত্ব দেখাতে যেই লাঠি উঠিয়েছে অমনি দেখা গেল হুলোটা বাঘের মতো লাফিয়ে উঠল কানুর গায়ে। একটা থাবা তো দিলই, পায়ের বুড়ো আঙুলে দাঁতও বসিয়ে দিল। কী আক্রোশ তার!
সেই নিয়ে ডাক্তার বদ্যি। মা শুধু এসে বলেছিল—দ্যাখো কাণ্ড, জানলার একটা পাল্লা খুলে দিবি তো! নইলে ও পালাবে কোথা দিয়ে? এই বলে মা জানালা খুলে দিতেই হুলো একলাফে পালাল। বাড়ির পারিবারিক ডাক্তার গুণেন ধরের সঙ্গে বাবার বনিবনা হয় না। কানুকে দেখতে এসে ডাক্তার ধর বললেন—অ্যান্টি টিটেনাস দিতে হবে।
বাবা বললেন,—বেড়াল কামড়ালে অ্যান্টি টিটেনাস কেন? আয়োডিন দাও।
—আয়োডিনও দাও। সঙ্গে এটিএস।
বাবা বললেন—ঘোড়া কামড়ালে এটিএস দেয়। বেড়াল কামড়ালে নয়।
ধর কটমট করে তাকিয়ে বললেন—তবে আমি যাচ্ছি–যা খুশি করো।
রাগ করে ডাক্তার ধর চলেই যাচ্ছিলেন, ঠাকুমা এসে তাঁর গায়ে মাথার হাত বুলিয়ে বাবা, বাছা বলে ঠান্ডা করে। বাবা শুধু বললেন—বেড়াল যে এত ডেঞ্জারাস হয় জানতাম না।
হুলোর জন্য এত সব কাণ্ড।
একদিন সকালের দিকে পুবের বারান্দায় রোদে বাবা দাড়ি কামাতে বসেছে। কামানোর জন্য গরম জল আনতে গেছে চুষি। কিন্তু রান্নাঘরের উনুনে তখন ভাত ফুটছে। এসময় হাঁড়ি নামালে ভাত প্যাঁচপ্যাচে হয়ে যায় বলে মা হাঁড়ি নামাতে রাজি নয়। গরমজলের তাই দেরি হচ্ছে। অধৈর্য হয়ে বাবা বলল—ধুত্তোর, আজ দাড়িই কামাবো না। এই বলে ক্ষুর সাবান আয়না নিয়ে উঠতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময়ে কপিখেতের দিক থেকে ফোঁসফোঁস শব্দ এল।
তারপরই বাবার চিঙ্কার—দেখে যাও সব, দেখে যাও কী ডেঞ্জারাস কাণ্ড হচ্ছে এখানে।
সবাই ছুটে এসে দেখে একটা হাতদেড়েক লম্বা দাঁড়াস সাপের সঙ্গে নিরীহের মতো লালচে রঙের বেড়ালটার লড়াই লেগেছে কপিখেতে। ভারী মজার লড়াই। সাপটা এক একবার বেড়ালটার বুকে পেটে প্যাঁচ মেরে কান কামড়ে ঝুলে থাকে। বেড়ালটা তখন ভেজা বেড়ালের মতো বসে থাকে চুপচাপ। সাপটা অনেকক্ষণ ওরকম থেকে কাঁহাতক আর বেড়ালের কান। কামড়ে থাকা যায়—এই ভেবে প্যাঁচ খুলে নিজের কাজে রওনা হয়। তক্ষুনি বেড়ালটা ভেজাভাব ঝেড়ে ফেলে লাফিয়ে গিয়ে সামনের দুই থাবায় সাপটাকে ধরে টেনে আনে। তারপর সেটাকে ফেলে কাতুকুতু দেয়, গলার নলীতে কামড়ে ধরে আঁচড়ে দেয়। সাপটা মহা হাঙ্গামায় পড়ে ওলটপালট খায়, তারপর ফের প্যাঁচ মেরে ধরে। সেই খেলা দেখতে বাইরের লোকও জমে গেল বেড়ার ধারে।
বেড়ার বাইরের লোকজনের মধ্যে চুষি হঠাৎ বাবুদাকে দেখতে পেল। আজকাল কী যে হয়েছে তার! বাবুদাকে দেখলেই কেমন যেন বুকটা ঝাঁৎ করে ওঠে। সারা শরীরে একটা তানপুরার তার পিড়িং করে বাজে। বাবুদা বেশ দেখতে। তার দিকে তাকায় প্রায়ই। চুষি তাকাতে লজ্জা পায়। যদিও ইচ্ছে করে।
কিন্তু সেদিন বেড়াল-সাপের লড়াইয়ের সময় মজাই হল একটা। সবাই যখন লড়াই দেখছে তখন চুষির নজরে পড়ল, বাবুদা একদৃষ্টে তার দিকে চেয়ে আছে। গায়ে কাঁটা দিল চুষির। শিহরণ যাকে বলে। ভারী লজ্জা-লজ্জা করতে লাগল। যতবার চোখ সরিয়ে নেয় ততবারই চোখটা গিয়ে বাবুদার চোখে আটকে যায়। এরকম কয়েকবার হতে-হতে চুষি আর চোখ সরানোর হাঙ্গামায় গেল না। চেয়েই রইল।
বাগানে তখন কপিখেতের ভেজা মাটিতে সাপটাকে নখে করে চিরে ফেলেছে বেড়ালটা।
এই ঘটনার পর বাবা পড়ল মহা সমস্যায়। বলতে লাগল—আমি জানতাম বেজি আর ময়ুরই সাপের সঙ্গে লড়াই করে। কিন্তু বেড়ালের ব্যাপারটাও বেশ ডেঞ্জারাস দেখছি।
বাবার বন্ধু সুভদ্র তার উত্তরে বলে—তুমি দুনিয়ার জানোটা কী হে? চিরকাল হম্বিতম্বি করে এলে, শিখলে না কিছুই। বেড়ালের ব্যাপারটা আমি আগে থেকেই জানতাম।
—চালাকি কোরো না সুভদ্র। জানলে এতদিন বলেনি কেন?
—বাঃ সব জানার কথাই এসে তোমাকে বলতে হবে নাকি?
এইভাবে ঝগড়া লাগল। তা বাবার সঙ্গে সকলেরই ঝগড়া লাগে। রোজ।
কিন্তু বাবা বলতে লাগল—বেড়াল তো বেশ উপকারী প্রাণী দেখছি।
শুনে কে যেন বলল—খুবই উপকারী। ইঁদুর মারে।
শুনে বাবা বলল—ইঁদুর? ইঁদুর কোনও প্রবলেমই নয়। প্রবলেম হল সাপ।
এই নিয়ে তার সঙ্গে বাবার একটা মনকষাকষি হয়ে গেল। বাবা কিছুতেই স্বীকার করল না যে, সাপ বিপজ্জনক প্রাণী হলেও গৃহস্থের ঘরে ঢুকে উৎপাত করে না, যতটা করে ইঁদুর।
