তুষার অস্থির হয়। অস্থিরতা নিয়ে বেঁচে থাকে।
.
ঠিক যেন এক নদীর পাড়ে বসে আছে পাগল। কী সুন্দর আবছায়া নদীটি। চারদিকে আধো আলো আধো অন্ধকার। অনন্ত সন্ধ্যা। নদীটি বয়ে যায় অবিরল। স্মৃতি বিস্মৃতিময় তার স্রোত। পাগল প্রত্যক্ষ করে। ক্লান্তি আসে না। বকুলের গাছ থেকে পাতা খসে পড়ে, কখনও ফুল, বৃষ্টি আসে, ঝড় বয়ে যায়, আবার দেখা দেয় রোদ। তবু আবছায়ায় নদীটি বয়ে যায়। বয়ে যায়।
পাগল বসে থাকে।
একটা দুটো বেড়াল
চুষিদের বাড়িতে কোনও বেড়াল ছিল না। তবে বেড়ালদের আনাগোনা ছিল। সেসব চোর আর ছোঁচা বেড়ালদের কথা আর বলবার নয়। যতবার মেরে তাড়াও লজ্জা নেই—আবার আসবে। দেওয়ালে বাইবে। জানালায় উঁকিঝুঁকি দেবে। মিহি সুরে ভারী বিনয়ী ডাক ডাকবে। এমনকী শীতের লেপকাঁথা রোদে দিলে তাতে গিয়ে গোল্লা পাকিয়ে শুয়ে রোদ পোয়াবে। খড়ম, ঝাঁটা, ঠাঙার বাড়ি কী খায়নি তারা? ফাঁক পেলে মাছ নিয়ে গেছে, দুধে মুখ দিয়েছে, নোংরা পায়ের ছাপ ফেলে গেছে বিছানার সাদা চাদরে।
বেড়ালের আরও ননাংরা কাণ্ডমাণ্ড আছে। সেসবের জন্য হয় রামু জমাদারকে ডাকতে হয়, নয়তো আলাদা পয়সা দিলে পান্তি ঝি পরিষ্কার করে দেয়।
একটা ভারী বদ হুলো বেড়াল আছে সে কারও তোয়াক্কা করে না। কুঁদো চেহারা, কপাল আর পিঠে খাবলা-খাবলা লোম উঠে গেছে অন্য সব বেড়ালদের সঙ্গে কামড়াকামড়ি করে। হুলোটার চলন খুব ধীর-স্থির, তাড়া করলে দৌড়ে পালায় না, ধীরেসুস্থে অনিচ্ছের সঙ্গে যেন দয়া করে সরে যায়।
চুষির কাকা বিয়ে করবার পর বাড়ির পিছনের বারান্দাটায় দেয়াল তুলে একধারে একটা ঘর হল, বাকিটা হয়ে গেল দরদালান। চুষিদের তাতে খুব আনন্দ। চুষি আর কুসি দুই বোন মিলে তাড়াতাড়ি দরদালানের একধারে পুতুলের ঘর সাজাল। কিন্তু সত্যি বলতে কী পুতুল খেলার বয়স এখন আর চুষির নেই। কুসি ছোট, সে-ই পুতুল খেলে। মাঝে-মাঝে চুষির যখন পড়তে ভালো লাগে না, কিংবা যখন ছুটির দুপুরটা খাঁখাঁ করে, কিংবা মেঘ-বাদলার দিনে ছোট হতে ইচ্ছে যায় তখন গিয়ে কুসির পুতুলঘরে ভাগ বসায়।
শীতের রাত সন্ধে পার করেই সেদিন নিশুত হয়েছে। মফসসল গঞ্জের রাস্তাঘাট নির্জন। কুয়াশা জড়ানো ঘুম-ভাবে চারদিক ঝিমোচ্ছে। বাড়ির দরজা জানালা সব শীতের ভয়ে আঁট করে বন্ধ! ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ দরদালানে হুড়ম-দুড়ুম শব্দ। রান্না সারা। পুরুষরা বাড়ি ফেরেনি বলে তখনও খাওয়া হয়নি। মা বসে ময়দার চষি পাকাচ্ছিল। পান্তি মেঝেয় পড়ে ঘুম।
মা পান্তিকে ডেকে বলল—দ্যাখ তো। ঘুমচোখে উঠে পান্তি দেখতে গেল। পড়া ফেলে চুষিও। চুষির পিঠোপিঠি ভাই কানু এক হাতে খেলনা পিস্তল, অন্য হাতে দরজার আলগা বাটামটা নিয়ে সবার আগে গিয়ে দরজা খুলে চেঁচাল—কোই হ্যায়?
সবাই জানে এই ভরসন্ধেয় চোর আসে না। তবু তা বলে ভয়টা তো থাকেই। পান্তি হারিকেন তুলে আলো ফেলতেই চুষি বলল—এঃ মাঃ দেখেছ!
কাণ্ড কাকে বলে! রাংতা এনে কত কষ্টে আজ পুতুলের বিয়ের বাসর সাজিয়েছে! রঙিন কাগজের শিকলি, পিচবোর্ড দিয়ে খাট, বর বউ সত্যিকারের ফুলছাড়ানো বিছানায় শুয়ে। সেই সাজানো বাসর ছয় ছত্রখান করে গুন্ডা হুলোটা দরদালানের বন্ধ জানালার তাকে উঠে বসে আছে।
কানু চেঁচিয়ে বলল—এ হচ্ছে কে এন সিংয়ের কাজ।
কে এন সিংটা যে কে তা আজও ভালো করে কেউ জানে না। তবু–কানু বলে—কে এন সিং হল ভিলেন।
কেউ কিছু গোলমেলে কাণ্ড করলেই কানু চেঁচাবে—এ হল কে এন সিং। একবার বাবাকেও কে এন সিং বলে ফেলেছিল কানু। কারণ, কপিখেত তৈরি করার সময় ভুল করে মায়ের লাগানো একটা দোলনচাঁপা গাছ উপড়ে ফেলে দেয়। মা রাগারাগি করাতে বাবা বলেছিল—ফুলগাছ টুলগাছ কোন কাজে লাগে! যত সব মেয়েলি ব্যাপার। বাগান হচ্ছে নরম মনের জন্য। খেত হল শক্ত মনের জিনিস। এই ব্যাখ্যাটা কেউ তেমন মানতে পারেনি। কানু বলে উঠেছিল—কে এন সিং।
বাবা জিগ্যেস করল—কে এন সিং কে?
একজন রাজস্থানী বীর।
–রাজস্থানী বীর? বাবা ভ্রূ কুঁচকে বলল–রাজস্থান না রাজপুতানা? রাজস্থানে আবার বীর হয়। নাকি, সব তো শুনি ব্যাবসা করে।
কানু মরিয়া হয়ে বলে রাজস্থানী।
বাবা আর কিছু বলেনি। ইতিহাস তো আর তেমন মনে নেই।
তা হুলোটা কানুর সেই কে এন সিংই বটে। দুধ নয় যে হাঁড়ি ওলটাবি, মাছ নয় যে খাবলা দিবি, পুতুলের ঘরটা তবে ভাঙতে গেলি কোন আক্কেলে? পুতুল খেলার তুই বুঝিস কী রে পাজি?
কানু বাটামটা ধরে একলাফে এগিয়ে গিয়ে চেঁচাতে লাগলকাম অন কে এন সিং, তুমহারা ইজ্জৎ আজ বহুৎ খতরে মে হ্যায়। আজ তুমহারা টেংরি টুটেগা বিল্লি কা বচ্চে।
চুষি দৌড়ে গিয়ে পুতুলের ঘরের সামনে বসে বড়-বড় চোখে চেয়ে দেখল সব। কান্না পায়! কত কষ্টে সাজিয়েছে। কুসিটা সাঁঝবেলায় ঘুমিয়েছে ভাগ্যিস। কাল সকালে অবস্থা দেখে কাঁদতে বসবে। কানুর হিন্দি শুনে চুষি ধমক দিয়ে বলল—তোমার হিন্দি ছবি দেখা বের করছি কানু। আজই বাবাকে বলব।
–কাম অন কে এন সিং। বলে কানু বাটামটা যেই জানলার তাকে হুলোটার দিকে বাড়িয়েছে অমনি শুরু হল হুলুস্থুল কাণ্ড। এমনিতে হুলোটা ভয় পায় না, কিন্তু এবারটায় যেন মরিয়া হয়ে এক লাফে নেমে কানুকে এক ধাক্কা দিয়েই দরদালানের দরজায় গিয়ে পড়ল। ‘ফু-অ অ’ করে একটা হতাশার শ্বাস ছাড়ল হুলো। দরজা বন্ধ। কানু লাঠি ঠুকতে-ঠুকতে তাকে তাড়া করল ফের, বলল—বিল্লি কা বচ্চে, তুম নে ইনসান নহি, স্রিফ বিল্লি কি এক নানহে মুন্নে বচ্চে হো। তুমহারা। জিন্দগি মে এক গহেরা দাগ দিখাই যাতি হ্যায়।
