বিজয় সোরেন চোখ নামিয়ে বলে–চেতনটা কোথায়? ফিরেছে?
–তার খবর কে রাখে?
বিজয় সোরেন একটু গম্ভীর হয়ে গেল। আবার ফিক করে হেসে বলে–কাল বাদলপাড়া। থেকে ফিরতে রাত হয়ে গেল, কুমোরপট্টির ভাঁটিখানায় দেখি একটা মাতাল আকাশের দিকে চেয়ে বসে আছে। সবজিওয়ালা নিধে, জিগ্যেস করলাম, করছে কী? বলে, চেতন এইমাত্র আকাশে উড়ে গেল, এইবার নেমে আসবে।
খুব হাসল বিজয় সোরেন।
পুরুষমানুষের সামনে টিউবওয়েল পাম্প করতে লজ্জা করে। শরীরটা লকড়পড় করে তো। কিন্তু বিজয় সোরেন ওই যে মোড়া পেতে বারান্দায় বসেছে, আর নড়বে না। মিনতি জল নিয়ে গেলে উঠবে, ভাবতে একটু রাগ মেশানো শিহরণ বোধ করে মিনতি। তেমন কুচ্ছিৎ সে এখন আর নয়!
শাড়িটা শক্ত করে জড়িয়ে সে টিউবওয়েলের হাতলটা ধরল। বড় শক্ত হাতল। কষ্টে পাম্প দিতে থাকল। কপালের ওপর চুল উড়ে আসছে। মাঝে-মাঝে চোখে পড়ছে বিজয় সোরেনকে,
একটু চোখাচোখি, একটু আধটু হাসির ছিটে। বড় ভালো লাগে মিনতির।
–এবার যখন ধরব চেতনকে, ছাড়ব না, বলে দিও।
মিনতি ঠোঁট উলটে বলে–ইস! চাল ধরা পুলিশের ক্ষমতা জানা আছে।
বিজয় সোরেন হাসে-ক্ষমতাটা দেখবে একদিন, দেখবে।
–আচ্ছা, জানা আছে।
বাঁ-কাঁখে কলস, ডান হাতে বালতি। জল চলকে পড়ছে ছপছপ। মিনতি দুলকি পায়ে সদর রাস্তা পার হয়ে চক্রবর্তীদের ভাঙা মন্দিরের চাতালে পড়ল। বালতিটা নামিয়ে দম নিল একটু। কাঁখ বদলাবে। ঠিক সেই সময়ে এরোপ্লেনটা এল। অনেক উঁচু দিয়ে কুয়াশার ভিতর একটা ছায়া ধীরে উড়ে যাচ্ছে।
মিনতি কপালের চুল সরিয়ে ঘাড়ের ওপর মাথা ফেলে মুখখানা সম্পূর্ণ আকাশে তুলে দেখল। ধীর, গম্ভীর শব্দ। মিনতি চেয়েই থাকে। ভাবে, একজন কালো চশমা পরা লোক এরোপ্লেনটা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার মাথায় টুপি, ফরসা রং, খুব অহঙ্কারী চেহারা। তার ঘর-সংসার নেই, খাওয়া পরার ভাবনা নেই। কেবল দিন রাত সে তার উড়োজাহাজ নিয়ে উড়ে যায়। উড়ে যায়।
আকাশ থেকে মুখ নামায় মিনতি। কলসটি কাঁখ বদলে নেয়। আবার হাঁটে, জল চলকে পড়ে ছপছপ। শাড়িটা পায়ের কাছে ভিজে যায়। শীত করে।
শাশুড়ি মাঝে-মাঝে তার দিকে সন্দেহের চোখে চেয়ে বলে–কুড়ির বুড়ি তবু বাচ্চা হয় না কেন রে? বাঁজা নোস তো?
মিনতি ঠোঁট ওলটায়। কে জানে! ধামার মতো পেট নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। মাগো! এই বেশ আছে মিনতি। চ্যাপটা শরীর। আর একটু চর্বি হলে চমক্কার গড়ন হবে তার। বাচ্চা কাচ্চার দরকার নেই। সে বড় ঝামেলা। একদিন সে উড়ে যাবে। বিজয় সোরেন কিংবা গগলস–পরা উড়োজাহাজের লোকটা কেউ না কেউ একদিন লুটে নিয়ে যাবে ঠিক।
.
ডাক্তাররা বলে বটে মাঝে-মাঝে জোলাপ নিতে। কিন্তু সেটা কোনও কাজের কথা নয়। নির্গুণহরি জানে, বয়সে মলভাণ্ডং না চালয়েৎ।
দুপুরে জল সরতে গিয়ে বেগ চাপল। কঠিন কোষ্ঠের মানুষ নির্গণহরির কাছে ভারী আনন্দের ব্যাপার সেটা। কদিন বুকটা পেটটা চাপ ধরে আছে। প্রেশারটাও ভালোনা।
গামছা পরে, বালতিতে জল নিয়ে গিয়ে দেখে পায়খানার দরজা বন্ধ।
বারান্দায় এসে ওই অবস্থায় বসে রইল নির্গুণহরি। দরজাটা খুলল না। ভিতরে থেকে থুথু ফেলার আওয়াজ আসছে। ছোটো বউ–টউ কেউ গিয়ে থাকবে। শ্বশুর, ভাসুর যাবে টের পেয়েছে, তাই ইচ্ছে করে বেরোচ্ছে না।
সংসারে শান্তি নেই। কাঁপা ডানহাতে অতি কষ্টে সিগারেটটা পাকিয়েছিল। জ্বলে–জ্বলে শেষ হয়ে গেল সেটা।
নিজেদের আলাদা ব্যবস্থা করার কথা প্রায়ই ভাবে নির্গুণহরি, কিন্তু ব্যবস্থা কি সোজা কথা! সেপটিক ট্যাঙ্ক ফ্যাঙ্ক বসাতে গুচ্ছের টাকা। ছেলেটা শুড়ির হাতে মাস মাইনের অর্ধেক তুলে দিয়ে আসে। অন্য বদখেয়ালও আছে। পাত্তিখেলার জো এসেছে গঞ্জে। সেদিকেও কিছু ঢালে নিশ্চয়ই।
বেগটা চলে গেল। আবার লুঙ্গি পরে ঘরে ফিরে আসে নির্ণহরি। দক্ষিণের জানলার ধারে বসে। নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছ চেতনের মা। গালে পানের ঢিবি। নির্গুণহরি ডানহাতটা তুলে ধরে চেয়ে থাকে। বিশ্বসংসারে সবাই বিশ্রাম নেয়, ঘুমোয় কিংবা চুপ করে থাকে। কেবল এই শুয়োরের বাচ্চারই বিশ্রাম নেই, ঘুম বা চুপ করে থাকা নেই। শালা নড়ছে তো নড়ছেই।
বিকেলের দিকে ঘুম ভাঙতে বালিশটা খাটের বাজুতে খাড়া করে উঁচু হয়ে শুয়েছিল চেতন। হাতে সিগারেট। পূবের জানালার কাছে ধোঁয়াটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজছে মিনতি। খুব মন দিয়ে সাজছে।
একপলক সেদিকে চেয়ে থাকে চেতন। খুব নেশার ঘোরেই বিয়েটা করেছিল সে, সন্দেহ নেই।
আলগা গলায় জিগ্যেস করল–অত সাজগোজ কীসের?
মিনতি ফিরে তাকালও না। বলল কীসের আবার! এমনিই।
–এমনিই কেউ সাজে নাকি?
–মেয়েরা সাজে।
–কেন?
–ভালো লাগে?
–দূর ঢ্যামনা, এমনি সেজে কী হয়? গুচ্ছের পাউডার স্নো নষ্ট।
মিনতি ফুঁসে উঠে বলে–আমারটা নষ্ট হচ্ছে হোক। তোমার কী?
–বাপের বাড়ি থেকে ক’বাক্স রূপটান এনেছিলে? বড় বড় কথা।
মিনতি একটুও মিইয়ে যায় না। সমান তালে বলে–আর কী দাও শুনি? কেবল তো একটু স্নো, পাউডার।
চেতনের শরীরটা এ সময়ে বড় ঢিস মিস করে। ঝগড়া কাজিয়া ভালো লাগে না। হাই তোলে। দু-চারটে কথা কাটাকাটি হলেই মেরে বসবে, থাকগে।
–চা করো তো।
–মা করছে।
–কই, শব্দ পাচ্ছি না তো। মা উঠলে শব্দ পেতাম।
