পাথরবাটিতে মিছরি ভেজানো আছে। দাদাশ্বশুরের দিয়ে যাওয়া একসেরি কাঁসার গ্লাসটা মেজে ঝকঝকে করে রাখা হয়েছে। টাটকা জল আনলে বত হবে।
–বউ, গেলি? শাশুড়ি চেঁচাচ্ছে ঘর থেকে।
–যাই। মিনতি পুবের জানালার ধারে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উত্তর দেয়। হাতে পাউডারের পাফ। মোছা-মোছা করে একটু দিয়ে নেবে মুখে। চুল আঁচড়ে নিয়েছে। ধোঁয়াটে আয়নাটার ওপর ঝুঁকে মুখখানা দেখছিল মিনতি। কালো কুচ্ছিৎই বলা যায় তাকে, চিরকালই সবাই তাই বলেছে। ইদানীং কি একটু জেল্লা লেগেছে তার? চোখের কোল আর তেমন বসা লাগে না তো! রংটা মাজা মাজা হয়েছে যেন একটু! আর জ্বর মাঝখানে একটা কুমকুমের টিপ বসিয়ে নেয় সে।
–কখন থেকে তো যাই–যাই করছিস। ছেলেটা হ–ক্লান্ত হয়ে এসে পড়বে এখখুনি। বাসি জল মেটে কলসিতে পাথর হয়ে আছে, মুখে দিলে দাঁত নড়ে যায়। পা চালিয়ে যা—
–যাই। উত্তর দেয় মিনতি। তবু তার তাড়া নেই। সামনের চুলগুলো হাতের তেলোয় চেপে কপালটা একটু ঢাকবার চেষ্টা করে সে। উঁচু কপাল তার, সহজে ঢাকা পড়ে না। কী ভেবে কাজললতা খুলে চোখের কোলে একটু টেনে দেয়। খুব বেশি সাজগোজ হয়ে গেল নাকি? ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মুখখানা দেখে। মণ্ডলদের বাড়ির কলে জল আনতে গেলে আজকাল মেস-বাড়ির মোটা পুলিশটা তার সঙ্গে যেচে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে। ভাবতেই একটা আনন্দের গুরুগুরুনি ওঠে বুকে। সে খুব কুচ্ছিৎ হলে কি হত এরকম?
সে সাজগোজ করলে শাশুড়ি রাগ করে না, বরঞ্চ খুশি হয়। ভাবে ছেলেকে মজাতে বউ সাজছে। বয়ে গেছে মিনতির। চেতন দেখে নাকি মিনতিকে? কোনওদিন দেখেছে? বিয়ের আগে মিনতি তার কেপ্পন দাদার সংসার আগলাত। গোটা দশেক গরু, পাঁচ সাত বিঘে ধানজমির মালিক তার দাদা পয়সা খরচের ভয়ে বোনের বিয়ের নামও করত না। সেসময়েই এক দোলের দিনে দাদার সিদ্ধি-গেলা একপাল বন্ধু গিয়ে রং মাখিয়েছিল। চেতনের হাতে ছিল রুপোলি তেলরং, লঙ্কা বাটা মেশানো। সেই রং মুখে চোখে ডলে দিয়েছিল খুব। কী কান্না মিনতির! সেই দেখে নেশার ঝোঁকে তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল চেতন। ওর বাপ-মা রাজি হয়নি বিয়েতে। চেতন তখন আর একদিন গভীর নেশা করে পুরুত আর জনকয় বাজনদার আর-এক পাল বন্ধু নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে আনল তাকে। দাদার এক পয়সা খরচ হয়নি। বিয়ের পর মিনতি শ্বশুরবাড়ি রওনা হল–সামনে হ্যাজাক উঁচু করে ধরে একজন হাঁটছে, তার পেছনে রোগা রোগা কয়েকজন বাজনদার ট্যাং টাং করে বাজনা বাজাতে-বাজাতে চলেছে, পিছনে রিকশায় মাতাল চেতনের পাশে কাঠ হয়ে বসে মিনতি। শ্বশুরবাড়িতে কেউ নতুন বউ বরণ করেনি, বরঞ্চ কান্নার রোল উঠেছিল। হিন্দ মোটরের হাতুড়ে চেতন বিড়বিড় করে বলছিল–মালটা যখন এনেই। ফেলেছি তখন তুলেই নাও না। বিয়ে তো করতুমই…
ওকে বিয়ে বলে না। সঠিক বিয়ে মিনতির আজও হয়নি। তবু তার শ্বত্রবাড়ি আছে। শ্বশুর শাশুড়ি দেওর আছে–এ বড় আশ্চর্য!
বালতি আর কলসি নিয়ে বেরোনোর সময়ে খুড়িশাশুড়ির উঁচু গলা শুনতে পায় মিনতি।
–দেখে নাও, নড়া ব্যথা করে সাত সকালে বারান্দা মুছেছি, কাদা মেখে নোংরা করে দিয়ে গেল, শত্তুরের বারান্দা যে…
বাড়িটা ভাগ ভাগ হয়ে গেছে। তিনটে ভিটে জুড়ে ব্যারাকবাড়ির মতো, উঠোন একটা, কুয়ো পায়খানাও একটা করে। হাঁড়ি আলাদা। লেগে যায় প্রায়ই।
দেওর রতন বারান্দায় মাদুর পেতে পড়তে বসেছিল। মাদুরটা তেমনি পড়ে আছে, বই খোলা। সে নেই, একটু আগে বড়–বাইরে সেরে এসে কুয়ো পাড়ে হাত মুখ ধুচ্ছিল, দেখেছে। মিনতি। বোধ হয় কাটা ঘুড়ি ধরতে ওই অবস্থায় ছুটে গেছে খুড়ির বারান্দা দিয়ে ভিজেপায়ে। উঠোনের ধুলোর ছাপ ফেলে গেছে।
শাশুড়ি কুয়োপাড় থেকে ডাল ধুয়ে গামলা হাতে বারান্দায় উঠছিল, তাকে দেখে থমকে বলল –এতক্ষণে সময় হল? ছেলেটা সারারাত বাইরে, চিন্তায় মরি, তোদের প্রাণে ফুর্তি দেখলে মরে যাই! হাঁদানে ছেলেটা এসে পড়বে…বলতে-বলতে গলা নামিয়ে বলে–কে উঠেছিল রে ও বারান্দায়?
–রতন বোধহয়।
–আন্দাজে বলিস না, বলি দেখেছেটা কে? বলেই গলা চালায় শাশুড়ি বলি কার পা সারা বারান্দায় ছাপ ফেলেছে তা কি কেউ গজ ফিতে নিয়ে মেপে দেখেছে নাকি…
গোলমাল থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল মিনতি। একটু হাঁটলে দুগগাপুরের সদর রাস্তা। সেটা পেরিয়ে মণ্ডলদের বিশাল বাড়ি, সতেরো ভাড়াটের হাট। এ অঞ্চলের জল ভালো না। লোহার গন্ধ, ঘোলা, তার মধ্যে মণ্ডলদের বাড়িতেই যা ভালো জল ওঠে। কুয়া দুটো, টিউবওয়েলে পাড়াপড়শি অনেকেই জল নেয়।
নীচের তলায় পুলিশদের মেস। আসল পুলিশ নয়, এরা হচ্ছে কর্ডনিংয়ের পুলিশ, চোর ধরে। মোটা পুলিশটার নাম বিজয় সোরেন। ভুড়ির নীচে বেল্ট বাঁধে, গোঁফের ডগায় মোম লাগায়। অবিকল পশ্চিমা মনে হয়। কথাও বলে ওই রকম টানে–বুঝলে হে চেতনের বউ, এবার যখন চেতনকে তুলে লিব, আর ছাড়ব না, মাতালটাকে বুঝিয়ে দিও। রোজ রাতে শালাদের ডানা গজায়। জায়গাটা মাতালের হাট বানিয়ে দিয়েছে। তোমরা আটকাতে পারো না?
পুলিশের পোশাক পরলে ভারী চমত্তার দেখায় বিজয় সেরেনকে। লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা থাকলে নিরীহ ভালোমানুষ মনে হয়। দেখা হতেই হাসল মিনতি।
