–উঠেছে। আমি দেখেছি।
–অ! বলে চুপ করে চেয়ে মিনতির সাজ দেখে সে। হতে পারে যে মিনতি আগের মতো রুক্ষ নেই। গা একটু মোলায়েম মনে হচ্ছে। একটু ভার–ভারিকও হয়েছে বোধহয়। কিন্তু তবু তেমন ছুঁতে ঘাঁটতে ইচ্ছে করে না। কার জন্য সাজে মাগিটা? কাউকে যদি পটাতে পারে তো খুশিই হবে চেতন। উড়ে যা পাখি, উড়ে যা। পিছু নেবে না কেউ, উড়ে যেতে দেবে। সংসারে যত টান কমে তত ভালো। সতুয়ার দোকানে গিয়ে বাপটা বসে থাকে তার খোঁয়াড়ি ভাঙার সময়ে। মা মিছরি ভিজিয়ে রাখে। বউটা সাজে, এসব একদম ভালো লাগে না। চেতনের কোথাও একটু নিশ্চিন্তে নিজের মতো গড়িয়ে থাকার উপায় নেই। বাড়িশুষ্টু লোক তোমার জন্য ওঁত পেতে বসে আছে। তার চেয়ে উড়ে যা পাখি, উড়ে পুড়ে যা সব। যে যেখানে খুশি চলে যা। চেতন একাই থাকবে।
–বউ, চা নিয়ে যা। মা ডাকছে। মিনতি উঠে গেল।
উড়ে বেরিয়ে গেল ছুটির একটা দিন। কাল থেকে হপ্তা পড়ে যাচ্ছে, ছুটির দিনটা কেমন কুয়াশার মধ্যে কেটে যায়। ছুটি কেমন তা বুঝতে পারে না। যেমন বুঝতে পারে না বউ কেমন, বাবা কেমন, মা কেমন, কিংবা এই বাড়িটা কেমনধারা, বুঝতে না পেরে ভালোই আছে চেতন।
আয়না দিয়ে একপলক দেখেছিল মিনতি। সাজতে–সাজতে, দেখল অন্যমনস্ক চেতন তাকে গোগ্রাসে দেখছে। চেতন দেখছে। ভারী অবাক হল মিনতি। তবে কি সত্যিই সুন্দর হয়েছে আগের চেয়ে? ভাবতেই বুক গুরুগুরু করে উঠল তার। বিয়ের রাতে যেমনটা করেছিল।
চা আনতে উঠে গিয়েও মিনতি উত্তেজনাটা সামলাতে পারছিল না। তিন বছরের বিয়ে তাদের। তার মধ্যে শেষ আড়াই বছর চেতনকে নেশার মধ্যে ছাড়া কখনও দেখেনি মিনতি। নেশার মধ্যে কখনও-সখনও তাকে ঘেঁটেছে চেতন। জ্ঞান হলে তাকিয়ে দুপলক দেখেনি। এই প্রথম দেখল, ওইরকমভাবে।
একটা আনন্দ খিমচে ধরে তার বুক। যদি সে সত্যিই সুন্দর হয়ে থাকে, আর চেতনের যদি চোখ পড়ে যায় তবে হয়তো কী একটা কাণ্ড হবে! ভাবতেই ভালো লাগে। বিশ্বাস হতে চায় না।
শাশুড়ি বড় যত্নে পরিষ্কার কাপ প্লেটে চা করে দেয়। কাপের ধারে দুটি চিড়ের মোয়া।
চা হাতে সাবধানে ঘরে এসে ঢোকে মিনতি। উত্তেজনায় চা একটু চলকে যায় বুঝি! সাবধানে হাঁটে মিনতি। এক-পা, এক-পা করে বিছানার কাছে আসে। এসে নববধূর মতো মাথা নত করে দাঁড়ায়। এসব সময়ে কী করতে হয় তা তো জানে না। কিছু একটা হবে, প্রত্যাশা করে।
–চা নাও। কাঁপা গলায় বলে।
হাত বাড়িয়ে নেয় চেতন, উঠে বসে চা খায়।
মিনতি একটু দাঁড়িয়ে থাকে কাছে। তারপর ধীর পায়ে ফিরে যায় জানালাটার ধারে। সেখানে ধোঁয়াটে আয়না, তার সামনে সস্তা স্নো পাউডার।
মিনতি ঝুঁকে নির্লজ্জের মতো মুখখানা দেখে। সুন্দর কি না তা বুঝতে পারে না।
চেতন উঠে পোশাক পরছে। নেশা করতে যাবে। রোজ অবশ্য বেশি নেশা করে না, ঝুমঝুমে মাতাল হয়ে ঘরে ফেরে। বেশি নেশা করে ছুটির আগের দিন। সেদিন প্রায়ই ফেরে না। না ফিরুক, মিনতিও তাই চায়।
চেতন জুতো পরে বেরিয়ে গেল।
বাইরে শাশুড়ির গলা শোনা গেল–চেতন, বেরোচ্ছিস?
–হ্যাঁ।
–রাতে ফিরবি তো? বলে যানইলে ভাত নষ্ট।
–ফিরব।
চেতনের পায়ের শব্দ উঠোন পেরিয়ে গেল। জানালার ধারের আয়নার সামনে বসে আছে মিনতি। বিজয় সেরেনের কথা ভাবছে। কিংবা ভাবছে উড়োজাহাজের সেই কালো চশমা পরা যুবকটির কথা।
উত্তরের ব্যালকনি
ব্যালকনিতে দাঁড়ালে লোকটাকে দেখা যায়। উলটোদিকের ফুটপাথে বকুল গাছটায় অনেক ফুল এসেছে এবার। ফুলে ছাওয়া গাছতলা। সেইখানে নিবিড় ধুলোমাখা ফুলের মাঝখানে লোকটা গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে বসে আছে। গায়ে একটা ছেঁড়া জামা, জামার রং ঘন নীল। পরনে একটা খাকিরঙের ফুলপ্যান্ট লজ্জাকর জায়গাগুলিতে প্যান্টটা ছিঁড়ে হাঁ হয়ে আছে। মাথায় একটা ময়লা কাপড়ের ফগগে জড়ানো। পিঙ্গল দীর্ঘ চুলগুলি আস্তে-আস্তে জটা বাঁধছে। গালে দাড়ি বেড়ে গেছে অনেক, তাতে দু-চারটি সাদা চুল। গায়ে চিট ময়লা কনুইয়ে ঘা, তাতে নীল মাছি উড়ে–উড়ে বসে। এই হচ্ছে লোকটা। দু-পা ছড়িয়ে নির্বিকার বসে আছে, দুই চোখে। অবিকল ক্লান্তিহীন তাকিয়ে থাকে। ঘা থেকে উড়ে মাছিগুলি চোখের কোণে এসে বসে। লোকটা দু-হাত তুলে চেঁচিয়ে বলে–সরে যা, সরে যা, মেল ট্রেন আসছে।
পাগল।
সকালে ভাত খেয়ে একটা পান মুখে দেয় তুষার। সুগন্ধী জরদা খায়। তারপর পিক ফেলতে আসে ব্যালকনিতে। ফুটপাতের ধারে কর্পোরেশনের ময়লা ফেলার একটা ড্রাম আছে। অভ্যাসে লক্ষ স্থির হয়। তুষার একটু ঝুঁকে দোতলার ব্যালকনি থেকে সাবধানে পিক ফেলে। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। পিকটা ঠিক গিয়ে পড়ে সেই ড্রামটায়। এদিক-ওদিক হয় না। অনেক দিনের অভ্যাস।
পিক ফেলে তুষার বকুলগাছের তলার সেই লোকটাকে একটু দেখে। পাগল। তবু এখনও চেনা যায় অরুণকে। চেনা যায়? তুষার একটু ভাবে। কিন্তু অরুণের আগের চেহারাটা কিছুতেই সে মনে করতে পারে না। ফরসা রং, ভোঁতা নাক, বড় চোখ–এইরকম কতগুলি বিশেষণ মনে পড়ে, কিন্তু সব মিলিয়ে চেহারার যে যোগফল–সেই যোগফলটাই একটা মানুষ সেই মানুষটার নাম ছিল অরুণ–সেই অরুণকে কিছুতেই সব মিলিয়ে মনে পড়ে না। তবু তুষারের মনে হয়, এখনও অরুণকে চেনা যায়। কিন্তু আসলে বোধহয় তা নয়। অরুণকে আর চেনা যায় না বোধহয়। তবু তুষারের যে অরুণকে চেনা মনে হয় তার কারণ, গত পাঁচ বছর ধরে অরুণ ওই গাছতলায় বসে আছে। ওইখানে বসে থেকে থেকেই তার চুল জট পাকাল, গালে দাড়ি বাড়ল, গায়ে ময়লা বসল–এই সব পরিবর্তন হল অরুণের। রোজ দেখে-দেখে সেই পরিবর্তনটা অভ্যস্ত লাগে তুষারের। তাই অনেক পরিবর্তনের ভিতরেও আজ অরুণকে চেনা লাগে তার।
