পশ্চিমাদের ভিড়ের পিছনে নগেনের কম্পাউন্ডের বনবিহারী তার কৌটোটি র্যাপারে ঢেকে কুঁজো হয়ে বসেছিল। মুখখানা তুলে বলল –দাদা যে?
নির্গুণহরি চিনতে পেরে হাসল–বনবিহারী? অনেককাল দেখি না?
–কোথায় বেরিয়েছেন সকালে? ছেলে খুঁজতে?
–হু।
–পেলেন?
–পেয়েছি। তোমার কোলে চাদরে ঢাকা ওটি কে? বাচ্চা নাকি?
বনবিহারী হেসে ফেলেনা, বাচ্চা নয়, বাচ্চার ফুড। আজকাল পাওয়া যায় না। অনেক কষ্টে জোগাড় হল নিয়ে যাচ্ছি।
কৌটোটা চাদরের তলা থেকে বের করে দেখায় বনবিহারী। নির্গুণহরি দেখে ভ্রূ কোঁচকায়–মায়েদের বুকে আজকাল দুধ হয় না কেন হে? সব আমড়া–আঁটি হয়ে যাচ্ছে!
–কী জানি দাদা। সেটাই ভাবি। আমরা তো মায়ের দুধ খেয়েই…
–খুব অবাক কাণ্ড। কারও বুকে দুধ নেই, এ কী করে হয় ভেবেছ?
–ভাবছি।
ভাবো, খুব ভাবো। ভেবে বের করে ফেল। এ ভালো কথা নয়।
বোধহয় ভাবনার জন্যই বনবিহারী র্যাপারের ভিতরে আবার কৌটো ঢেকে কুঁজো হয়ে বসে। হাতে সাত পয়সার ভাঁড়ের চায়ে চুমুক দিয়ে চোখ মিটমিট করে। শিশুর মতো আদরে পরিপাটি আঁকড়ে ধরে কোলের বেবিফুডের কৌটো।
নির্গুণহরি হিন্দি কাগজটার পাতার দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাশ থেকে এখনও একটা এরোপ্লেনের গুনগুন শব্দ ঝরে পড়ছে। কেউ না শুনুক নির্গুণহরি ঠিক শুনতে পায়।
.
বুকে কফের ঘড়ঘড় শব্দের মতো আওয়াজ তুলে উঁচু দিয়ে এরোপ্লেন উড়ে যায়।
ধুলো থেকে চোখ তুলে চেতন দেখল, আকাশময় এক সাদা আলোর বল। এরোপ্লেনটা দেখতে পায় না চেতন। আলোটা ফটাস করে চোখে কামড়ায়, মাথা তুলতেই ঝিনন করে একটা বিদ্যুৎ স্পর্শ করে তাকে। মাথার ভিতরে ফেটে পড়ে একটা রঙের বোমা। নানা রঙের ঢেউ মাথাটা ভাসিয়ে নেয়। আবার ধুলোয় মাথাটা রেখে দেয় চেতন। চারদিকটা এখনও স্পষ্ট নয় তার কাছে। সেই আবছা চেতনায় একটা বুড়ো উড়োজাহাজের আকাশ পেরোনোর দূর শব্দ আসতে থাকে।
কিছুক্ষণ চুপ করে পড়ে রইল চেতন। চোখ বুজে থাকলেও তার সাড় ফিরে আসছে। বুকের নীচে মাকালতলার কাঁচা রাস্তা, শরীর ঘেঁষে লোকজনের পা যায় আসে। রবিবারই হবে আজ, কাল যখন শনিবার ছিল, কাল রাতে রিকশাওয়ালাটা তাকে ঢেলে দিয়ে গেছে এইখানে। রিকশাওয়ালাটার তেমন দোষ নেই, নয়া আদমি, চেতনের বাড়ি তার চিনবার কথা নয়, তবু অনেক রাত পর্যন্ত ঘুরে-ঘুরে খুঁজেছে, তারপর ঢেলে দিয়েছে রাস্তায়। চেতনের মনে পড়ে উঁচু রিকশা থেকে ধাক্কা খেয়ে সে পড়ে গেল শক্ত মাটির ওপর। কিন্তু লাগেনি। ভেসে-ভেসে পড়েছিল।
চোখ মিটমিট করে নিজেকে একটু দেখল সে। পায়ের চপ্পলজোড়া ঠিক আছে, টেরিকটনের ওলিভ গ্রিন প্যান্টটা কেউ খুলে নেয়নি, পায়ে লালমোজা, ডোরাওলা জামা, জামার নীচে সোয়েটার–সবই ঠিক আছে। গায়ে ধুলো লেগেছে খুব। মুখের এক ফুট দূরে তার বমির ওপর মাছি জমাট বেঁধে আছে। সাড় ফিরে আসতেই কম্প দিয়ে একটু শীত করে তার। কুয়াশার জন্য রোদ এখনও তেমন তেজাল নয়। সারা রাতের হিমে শরীরটা ভিজে আছে। উঠে পড়ল চেতন। ঠিক ওঠা নয়, নিজেকে দাঁড় করানো। ভারী কসরতের ব্যাপার এসব সময়ে। হাত কাঁপে, পা ঠিক থাকে না, মাথাটাকে দু’হাতে ঘটের মতো ধরে জায়গামতো রাখতে হয়। পেচ্ছাপে তলপেটটা ভারী। মাকালতলার রাস্তার ধুলো এক পোঁচ জিবে উঠে এসেছে। থুথু ফেললে কাদাগোলা রং দেখা গেল।
নগেন ডাক্তারের ডিসপেন্সারির দেওয়ালে বিচিত্র একটা নকশা কেটে পেচ্ছাপ করল চেতন, এক হাত বাড়িয়ে দেওয়ালটায় ভর রেখে। তলপেটটা কেমন টনটন করে এখনও। শরীরটা আরও একটু দুর্বল লাগে।
চেতন জানে, তার বাপটা বসে আছে সতুয়ার দোকানে। বাপের এই বসে থাকাটা ভারী বিরক্তিকর। এসব সময়ে বাপটাপ কাছে এলে একরকমের অসোয়াস্তি হতে থাকে। বাপ আছে তো আছে, বাপগিরি পাঁচজনকে দেখানোর কী? প্রেস্টিজ নেই?
দেওয়ালটা ধরে-ধরেই চেতন মোড় পর্যন্ত আসে। রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে হাতে ইশারা করে। একটা রিকশা এগিয়ে আসে। গাছে চড়ার মতো কষ্টে রিকশার সিট পর্যন্ত উঠবার চেষ্টা করতে গিয়ে টের পেল কে যেন তার বাঁ-হাতের কনুয়ের ওপর ধরে তাকে উঠতে সাহায্য করে। মুখ ফিরিয়ে দেখল, নির্গুণহরি–তার বাপ।
–আঃ, তুমি আবার ধরছ কেন? আমিই পারব। যাও—
নির্ণহরি পিছিয়ে যায়।
–সোজা বাড়ি যাস, বুঝলি? নিষ্ঠুণহরি চেঁচিয়ে বলে দিল।
ফালতু কথা। আর কোন চুলোয় যাওয়ার আছে! কথা না বলেই মুখটা ফিরিয়ে নেয় চেতন। বাপটাপগুলো হচ্ছে এক একটা গেরো।
রিকশাটা দুকদম এগোতেই কাঁচা রাস্তার গর্তে ঝকাং করে ঝাঁকুনি খেল। মাথার ভিতরে আর একটা রঙের বোমা ফেটে রামধনুর রং ছড়াল। নিজের পকেটগুলো একবার হাতিয়ে নেয় চেতন। ফরসা। রাতে রিকশাওয়ালাটা কিংবা অন্য কেউ হিস্যা নিয়ে গেছে, অনেকেরই গত-জন্মের বিস্তর পাওনা আছে চেতনের কাছে। সবাই নেয়। বেশি যায়নি। সত্যিকারের মাতাল কখনও বেশি
পয়সা পকেটে নিয়ে বেরোয় না। বাড়ি ফিরলে রিকশার ভাড়ার জন্য চিন্তা নেই। মা মিছরি ভিজিয়ে রেখেছে। দাদামশাইয়ের একসেরি কাঁসার গ্লাস ভরে দেবে। চেতন চোখ বুজে রইল। পাতকোটায় পোকা হয়েছে। সাদাটে পোকার খোসায় বিজবিজ করে বালি ওঠে। দশটা কই মাছ ছাড়া হয়েছে, চুন আর পটাস দেওয়া হয়েছে। কিছু হয়নি। খাওয়ার জল বাইরে থেকে আনতে হয়।
