হাতটাকে ফের আর একবার শুয়োরের বাচ্চা বলে গাল দেয় নির্গুণহরি। তারপর সিগারেট পাকানোর মতো সহজ বহুদিনের অভ্যস্ত কাজটা আর একবার চেষ্টা করতে থাকে। কেনা সিগারেটের তামাক নরম, নইলে কবে এই সিগারেট পাকানোর নেশা ছেড়ে দিত সে। সিগারেটের প্যাকেট কিনে ফসফস একটার পর একটা ধরাত। কিন্তু সিগারেটটাই তো নয়, তামাকটা কাগজে পাক খাওয়ানাটাও একটা নেশা। আগে নির্ণহরি চমৎকার নিটোল পাকানো সিগারেট তৈরি করত। একধারটা মোটা, একধারটা সরু। তামাকটা এমন মিহি করে ডলে নিত যে আগুন ধরালে সহজে নিবত না। সরু ধারটা ঠোঁটে ধরে টানলে ধোঁয়া বেরিয়ে আসত। বহুদিনের অভ্যেস!
অনেক কষ্টে সিগারেটটা পাক খেল। থ্যাবড়া দেখতে হল। জিব বুলিয়ে আঠা জুড়ে চেয়ে দেখল নির্গুণহরি। থুথুটা বেশি লেগে জ্যাবড়া হয়ে গেছে। ভেজা ভেজা। এর চেয়ে ভালো এখন আর ভাবা যায় না। শালার ডানহাতটা…।
সিগারেট ধরিয়ে উঠল নির্ণহরি। উঁচু বাঁধের মতো কর্ড লাইন পড়ে আছে, নিস্তেজ আলোয় দু-ফলা ইস্পাত ঝিকোচ্ছে। খাটালের দুটো মোষ নির্ভয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে লাইন। ওপাশে জলা, সেইখানে ডুবে থাকবে। ভাবতেই শীত করে ওঠে। নির্গুণহরি মাথার উলের টুপিটা টেনে নামায়, সতর্ক হাতে গলায় ফাঁস দেওয়া কম্ভর্টারটা দেখে নেয়। গায়ে কোট, পায়ে মোজা তবু শীতটা ঠিক শরীরে ঢুকে পড়ে। এই হচ্ছে বুড়ো বয়েস।
নির্গুণহরি দাঁড়িয়ে কোন ধারটায় যাবে তা একটু চিন্তা করে নেয়। ছেলেটা যে কোথায় কোন রাস্তায় পড়ে আছে তা বলা মুশকিল। কিন্তু কাছে–পিঠেই আছে কোথাও। কাল রাতে বাড়ি ফেরেনি। কিন্তু তার জন্যে দুশ্চিন্তা নেই তার। বাড়ি না ফিরলেও বেঁচেই আছে। প্রায়দিনই নেশা করে। তবু ছেলের মা সারারাত ঘুমোতে দেয় না। রাত না পোয়াতেই ঠেলে বের করে দেয়, ছেলে খুঁজে আনো আগে, তারপর অন্য কথা। ছেলে না পেলে আমি কুরুক্ষেত্র করব….
ছেলে প্রতি রবিবারই পাওয়া যায়। রাস্তায় ঘাটে পড়ে থাকে। নির্গুণহরি দেখতে পায়, কিন্তু কুড়িয়ে নেয় না শুধু নজর রাখে। সতুয়ার চায়ের দোকানে বসে ভাঁড়ে চা খেতে-খেতে খবরের কাগজ দেখে। হিন্দি কাগজ, নিষ্ঠুণহরি ভাষাটা জানে না। তবু পড়বার চেষ্টা করে। ফাঁকে-ফাঁকে নজর রাখে, উঠে গিয়ে ছেলের আশেপাশে ঘুরে আসে, কুকুর-টুকুর কাছে পিঠে থাকলে তাড়িয়ে দেয়। মুখের কাছে প্রায়দিনই বমির স্তূপ দেখা যায়, তার ওপর নীল মাছির ভিড়। সেগুলোও ঝাঁপটা মেরে উড়িয়ে দিয়ে আবার সতুয়ার দোকানে এসে বসে। চা খায়। দুর্বোধ্য হিন্দি কাগজটা চোখের সামনে তুলে চেয়ে থাকে। তখন তার ডানহাতটা কাঁপে। কখনও চা চলকে পড়ে ছ্যাঁকা। লাগে। নির্গুণহরি গাল দেয়–শুয়োরের বাচ্চা।
হাতটাকে দেয়। ছেলেটাকে দেয়। জগৎ সংসারকে দেয়।
উড়োজাহাজটা এতক্ষণে কত দূর চলে গেছে? তবু শব্দটা গড়িয়ে-গড়িয়ে আসছে ঠিক। মুছে যাচ্ছে না। হাঁপিয়ে গেছে বুড়ো উড়োজাহাজটা। আকাশটা তো কম বড় নয়। সেটা পেরোতে আরও কত সময় চলে যাবে।
নির্গুণহরি নিশ্চিন্দার রাস্তা ধরে এগোল। মুখের শ্বাসের সঙ্গে ধোঁয়ার মতো ভাপ বেরিয়ে যাচ্ছে। সিগারেটের গোড়াটা মুখের লালায় ভিজে নেতিয়ে গেছে। কটু স্বাদ পায় সে। তামাকের আঁশ জিব থেকে থুঃ করে ছিটকে ফেলে ধ্যাবড়া সিগারেটটার দিকে তাকায়। নিবে গেছে। আবার ধরায়। কাশে, হাঁটে।
সতুয়ার দোকানে পশ্চিমা কুলি কামিনদের মেলা বসে গেছে। ভাঁড়ের চা সাত পয়সা। গুড় দেওয়া। আর তিন পয়সা বেশি দিলে কাপে চিনি–দেওয়া চা পাওয়া যাবে। স্বাদ একই, আট টাকা। কিলো দরের চা আর শুকনো পেয়ারা পাতায় কোনও তফাত নেই।
নগেনের ডিসপেন্সারি পেরিয়ে মাকালতলার রাস্তায় পা দিতেই ছেলের দেখা পেয়ে গেল নির্গুণহরি। গায়ে লাল সাদা ডোরাওলা শার্টটা বাহার দিয়েছে। এক ঠ্যাং সোজা পড়ে আছে, অন্য ঠ্যাংটা শোয়ানো, ঠ্যাঙের ওপর ভাঁজ করা। উপুড় হয়ে হাতের খাঁজে মাথা রেখে শুয়ে আছে ছেলেটা। মাথা ঘিরে মাছি। ধুলোর মধ্যে মুখ। মরেনি। শ্বাস বইছে, ওঠানামা করছে পিঠ। আশপাশ দিয়ে বাজারমুখো রাস্তায় লোকজন যাচ্ছে, আসছে, গা করছে না। পরিচিত দৃশ্য। নিষ্ঠুণহরি এগোল। কাছাকাছি এসে একটু নুয়ে দেখল। কালো রোগাটে–রোগাটে চেহারা, চোয়াল। ভাঙা, মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় জড়িয়ে একবার কানের ওপরটা ফেঁসে গিয়েছিল। সেই দাগটা দেখা যাচ্ছে। ছেলেটা তারই। মমতাভরে একটু চেয়ে থাকে নির্গুণহরি। নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছে করে। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। রাতের হিম শরীরটা কেমন ঠান্ডা মেরে গেছে।
কিন্তু ছুঁল না। উঠে দাঁড়াল। উড়োজাহাজটা এখনও যাচ্ছে। আশ্চর্য! শব্দটা কোন দিগন্ত থেকে অস্পষ্ট ভেসে আসছে এখনও?
ফিরে এসে মোড় ঘুরে সতুয়ার দোকানে ঢুকল নির্গুণহরি। পশ্চিমাদের ভিড়ের একপাশে বসল। খবরের কাগজটা ভাগ-ভাগ হয়ে গেছে হাতে হাতে। একটা পাতা পড়ে ছিল। নির্গুণহরি তুলে নিল পাতাটা। ভারী দুর্বোধ্য ভাষা। তবু অক্ষর চিনে-চিনে পড়বার চেষ্টা করতে লাগল। অ্যালুমিনিয়ামের বড় মগে চামচে নেড়ে চায়ের কাথ গুড় আর দুধে মেশাচ্ছে সতুয়া। শীতের সকালে চায়ের লিকারের গন্ধটি বড় ভালো লাগে। নির্গুণহরি নিশ্চিন্তে অপেক্ষা করতে থাকে।
