ঘোর রাতে গাড়ি বের করতে হুকুম দিলেন অনিকেত। প্রদীপ দত্তকে ডাকতে হয় না, সে আপনিই নিঃশব্দে সঙ্গ নেয়। বিভিন্ন পোষা মেয়েমানুষের কাছে ঘুরে বেড়ায় অনিকেত, নিজের বউ আর ছেলের কাছেও যায়। কিন্তু কোথাও যেন কোনও নিশ্চয়তা পায় না। সবাই বাধ্য, বিনীত, ভদ্র, হুকুমমাত্র যাকে দিয়ে যা খুশি করাতে পারে অনিকেত। তবু কেমন এক অনিশ্চয়তা। এই গভীর রাতে সে সকলের কাছে গিয়ে-গিয়ে ঘুম ভাঙাল। কেউ বিরক্ত হল না, বরং তটস্থ হল, আপ্যায়ন করল, ভালোবাসা প্রকাশ করল। এমনকী ঝুমুরও।
—আশ্চর্য! অনিকেত গাড়িতে ফিরে আসবার সময়ে বলল।
একটু যেন লজ্জিত হয়ে প্রদীপ দত্ত বলে—আপনি যেমন চেয়েছিলেন ঠিক তেমনই সব অ্যারেঞ্জমেন্ট করা আছে মিস্টার বোস। আপনি কোনও ত্রুটি পাচ্ছেন না তো?
—পাচ্ছি প্রদীপ দত্ত। আমি একটা মানুষকেও অর্জন করতে পারিনি।
—কেউ বেয়াদবি করেনি তো স্যার? প্রদীপ দত্ত উদ্বিগ্ন হয়ে বলে।
—না। আর সেইটেই তো বেয়াদপি। এরা কেউ বেয়াদবি করছে না, রাগ করছে না আমার ওপর, অভিমান করছে না, অবাধ্য হচ্ছে না। যে আমাকে ভালোবাসবে সে তো কখনও-কখনও একটু অবাধ্য হবে, অভিমানটান করবে প্রদীপ দত্ত? তাই না?
প্রদীপ দত্ত গম্ভীর হয়ে বলে—ওসব অ্যাবস্ট্রাক্ট জিনিস মিস্টার বোস। আমার এক্তিয়ারের বাইরে।
তুমি কোনও কাজের নও। অনিকেত রেগে গিয়ে বলে।
প্রদীপ দত্ত একটু গুম হয়ে থেকে বলে ঠিক আছে স্যার, আপনি যেমন চাইছেন ওরা এবার থেকে ঠিক সেরকমই বিহেভ করবে। আপনার রিকোয়ারমেন্টগুলো বলুন, আমি টুকে রাখছি— বলে প্রদীপ দত্ত তার নোটবই বের করে গাড়ির ড্যাশ বোর্ডের আলোয় লিখতে-লিখতে আপন মনে বলে রাগ, অভিমান, মাঝে-মাঝে একটুআধটু নন-অ্যাগ্রেসিভ অবাধ্যতা—আর কি বলবেন স্যার?
অনিকেত হাত বাড়িয়ে নোটবইটা কেড়ে নিয়ে বলে—চুপ করো। আমি কিছু চাইছি না। আমি এখন একটু একা থাকতে চাই। আমার যদি কোনও ফাঁকা অ্যাপার্টমেন্ট থাকে তো সেখানে আমাকে নিয়ে চলো।
—আছে স্যার। একটা দশতলা অ্যাপার্টমেন্ট হাউস আপনার অর্ডার মতো কেনা হয়েছিল, তাতে কোনও ভাড়াটে নেই। আপনার আদেশ মতো বাড়িটার চল্লিশটা ফার্নিশড ফ্ল্যাট ফাঁকা। পড়ে আছে।
দশতলার ফাঁকা কিন্তু চমক্কার সাজানো অ্যাপার্টমেন্ট স্বয়ংক্রিয় লিফটে উঠে এল অনিকেত। ক্লান্তভাবে একটা কৌচে বসে রইল নিঝুম হয়ে।
কেউ কোথাও নেই, শুধু কপাটের আড়ালে উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করছে প্রদীপ দত্ত।
—প্রদীপ দত্ত! অনিকেত ডাকে।
—বলুন স্যার। নিঃশব্দে সুপুরুষ দৈত্য ঘরে এসে দাঁড়ায়।
—ভগবান বলে কে একজন আছে না? আমি তার সঙ্গে আধ ঘণ্টার ইন্টারভিউ চাই। অ্যারেঞ্জ করো।
প্রদীপ দৈত্য ভ্রূ কুঁচকে চিন্তা করে বলে—অ্যাবস্ট্রাকশন। আমার এরিয়া নয় মিস্টার বোস। তবে—এই বলে প্রদীপ দত্ত পকেট থেকে একটা ট্যাবলেটের স্ট্রিপ বের করে বলে—একটা ট্যাবলেট খেয়ে নিন, নিজেকেই ভগবান বলে মনে হবে। সত্যি কথা বলতে কি আপনার ক্ষমতা ঈশ্বরের চেয়ে খুব কম নয়।
ট্যাবলেটটা হাতে নিয়ে চেয়ে থাকে অনিকেত, বলে—আর যখন এর নেশা কেটে যাবে, তখন?
—দেয়ার উইল বি মোর ট্যাবলেটস।
ট্যাবলেটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে অনিকেত বলে—প্রদীপ দত্ত, তুমি অপদার্থ। তুমি আমার বয়স হওয়া ঠেকাতে পারোনি, তুমি এমন একটাও মানুষ বা মেয়েমানুষ জোগাড় করতে পারোনি যে আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসে, তুমি ভগবানের সঙ্গে মাত্র আধ ঘণ্টার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট অ্যারেঞ্জ করতে পারোনি। নিজের কান ধরে দাঁড়াও প্রদীপ দত্ত।
প্রদীপ দত্ত দু-হাতে নিজের কান ধরে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
অনিকেত বলল—মানুষের সব চাহিদাই কেন তুমি পূরণ করতে পারো না? তোমার জানা উচিত এত ভোগ্য সামগ্রী উপভোগ করতে হলে মানুষের অনেক আয়ু চাই, অনেক ভালোবাসা চাই, ফর সিকিউরিটি তার একজন ভগবানও দরকার। তুমি যে সব দিতে পারোনি। কান ধরে ওঠবোস কর প্রদীপ দত্ত।
প্রদীপ দত্ত ওঠবোস করতে লাগল। করতেই লাগল। হাঁফিয়ে গেল না, ঘামল না, কোনও কষ্টের শব্দ করল না। ওর অনন্ত ওঠবোস দেখতে-দেখতে ক্লান্ত হয়ে অনিকেত বলল—তোমার ক্লান্তি নেই? বিশ্রাম নেই?
–না।
—মৃত্যু?
—তাও নেই।
হাহা করে হাসল, অনিকেত, বলল—মিথ্যেবাদী। ঠিক আছে, ওই জানলা দিয়ে লাফিয়ে পড়ো প্রদীপ দত্ত। আমি তোমার শেষ দেখতে চাই।
প্রদীপ দত্ত স্মার্ট পদক্ষেপে গিয়ে জানলার পাল্লা খুলে বিনা ভূমিকায় লাফ দিল নীচে। জানলার কাছে গিয়ে অনিকেত উঁকি মেরে দেখল ফুটপাথে পড়ে আছে প্রদীপ দত্ত।
হাহা করে হাসল অনিকেত। ঘরের মধ্যে ফিরে এসে হুইস্কি নিয়ে বসল। সামান্য নেশা হল তার। একটু ভুলভাল হচ্ছিল। সেই বিভ্রমেই হঠাৎ ডাকল—প্রদীপ দত্ত! তারপর নিজের মনেই বলল–না, না, ও তো মরে গেছে।
কিন্তু নিঃশব্দে, প্রদীপ দত্ত ঘরে এসে বিনীত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বলল—ইয়েস মিস্টার বোস।
তুমি মরোনি? অনিকেত অবাক।
প্রদীপ দত্ত মৃদু হেসে বলে—আই অ্যাম আনপেরিশেবল স্যার। ডেথলেস।
ক্লান্ত অনিকেত বলল—আজ আমার বয়স কত হল বলো তো?
প্রদীপ দত্ত বলল—একচল্লিশ বছর চার মাস দুদিন। আজকের দিনটা নিয়ে।
চমকে উঠে অনিকেত বলে—এই তো সেদিন বললে তিন মাস তেরো দিন। এর মধ্যে আরও উনিশ দিন বেড়ে গেল?
