মাসে চারবার তার শরীরের চেক আপ হয়। ডাক্তাররা রক্তচাপ মাপে, চোখ-দাঁত দেখে, কান নাক পরীক্ষা করে, রক্তে চিনির পরিমাণ মাপে, ই সি জি হয়, এক্স-রে হয়। কোথাও একটু খুঁত পেলেই সঙ্গে-সঙ্গে মেরামত করা হচ্ছে, অনিকেতের জীবন বড় নিশ্চিন্ত।
খুব ভোরে অনিকেত দৌড়াচ্ছে মাঠে। শীতকাল। একটা ভারী কুয়াশা চারদিকে ভূতুড়ে করে রেখেছে। সূর্য উঠতে অনেক দেরি। চারদিক আবছায়ার ঘোর। গায়ে যথেষ্ট মোটা একটা পুলওভার, কান-মুখ মাফলারে ঢাকা, পায়ে দৌড়ের জুতো। বেশ লাগছিল অনিকেতের। একটু হাঁফ ধরে আসছিল বটে, কিন্তু সে গতরাতের হ্যাংওভারও হতে পারে।
.
প্রদীপ দত্ত দৌড় বজায় রেখেই বলল—একচল্লিশ বছর তিন মাস তেরো দিন। আজকের দিনটা নিয়ে।
অনিকেত একটু থমকে গিয়ে বলে—চল্লিশ হয়ে গেল এর মধ্যে! কত বললে? একচল্লিশ? এই তো সেদিন আটত্রিশ ছিলাম।
প্রদীপ দত্ত হেসে বলে–ইয়েস স্যার, ম্যাট্রিক সার্টিফিকেটে এখনও আপনার চল্লিশ হয়নি। কিন্তু আসল বয়স—
দৌড় থামিয়ে অনিকেত কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁফাতে-হাঁফাতে বলে—একচল্লিশ ইজ টু মাচ।
—কিছু করার নেই মিস্টার বোস। প্রদীপ দত্ত হতাশভাবে বলে।
আজকাল অনিকেতের মাঝে-মাঝে রাগ হয় প্রদীপ দত্তর ওপর। এখন ওকে সে ‘তুমি’ করে বলে, ধমকায়। ওর কাছে আজকাল কিছু চাইতে আর লজ্জা বোধ করে না অনিকেত। মাঝে মাঝে এমনও ভাবে সে—লোকটা কোনও কাজের নয়। সব দিচ্ছে তবু কোথায় ফাঁকি রাখছে। যেন!
অনিকেত বলল—প্রদীপ দত্ত, তোমার বয়স কত?
প্রশ্ন শুনে প্রদীপ দত্ত একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে বলে—আমার বয়স? সে অনেক। আমি ভারচুয়ালি এজলেস।
—তবু বলো।
প্রদীপ দত্ত একটু হেসে বলে—আমি এই পৃথিবীর সমান বয়সি।
—মিথ্যে কথা প্রদীপ দত্ত।
—মাপ করবেন স্যার, আমার জন্ম কবে হয়েছিল আমার তা জানা নেই।
–তোমার কখনও অসুখ করে না? বুড়ো হওয়ার ভয় ধরে না তোমাকে?মৃত্যুচিন্তা হয় না?
প্রদীপ দত্ত বলল–না।
অনিকেত একটা শ্বাস ছাড়ে। তারপর শ্লথ গতিতে আবার দৌড়োয় সে। পিছনে নিঃশব্দ ছায়ার মতো প্রদীপ দত্ত। দৌড়োতে-দৌড়োতে অনিকেত হঠাৎ বলে—প্রদীপ দত্ত, আমি হাঁফিয়ে পড়ছি কেন? খুব বেশি দৌড়োইনি আজ, তবু কেন আমার হাঁফ ধরছে?
—একটু বিশ্রাম করুন, ঠিক হয়ে যাবে।
—তুমি হাঁফাওনি?
প্রদীপ দত্ত ম্লান একটু হেসে বলে—না। হাঁফিয়ে পড়লে আমার চলে না।
নিজের মার্সিডিস বেনজ গাড়িতে ময়দান থেকে ফিরবার সময়েও অনিকেত বারবার জিগ্যেস করল—আমি আজ হাঁফিয়ে পড়লাম কেন বলো তোর
প্রদীপ দত্ত গম্ভীর বিনয়ের সঙ্গে বলে কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে।
–কল দি ডক্টরস।
ডাক্তাররা এল। আগাপাশতলা পরীক্ষা করল তাকে। না, কিছু হয়নি, হার্ট ঠিক আছে, প্রেসার স্বাভাবিক, রক্তে চিনি নেই, লাংস ভালো।
—তবে? প্রশ্ন করে অনিকেত।
প্রদীপ দত্ত তার কানে-কানে আস্তে করে বলে—বয়স! চল্লিশের পর একটু ডিজিনেস আসে। কিছু না। এ-বয়সের যে-কোনও লোকের চেয়ে আপনার হেলথ অনেক ভালো।
অবহেলার সঙ্গে একবার প্রদীপ দত্তকে দেখে নিয়ে অনিকেত বলে—দেখো, হেলথ যেন আর গড়বড় না করে।
–চেষ্টা করব স্যার। সব রকম ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা হবে।
অনিকেত একটু গম্ভীর হয়ে গেল। আজ কোনও কাজ করল না অনিকেত। কেবল ছাদের বাগানে ঘুরে-ঘুরে অজস্র বিরল ফুলের সৌন্দর্য দেখল। তারপর এক সময়ে উত্তেজিত হয়ে ডাকাল—প্রদীপ দত্ত! প্রদীপ দত্ত!
প্রদীপ দত্ত দৌড়ে উঠে আসে ছাদে।
অনিকেত একটা বসরাই গোলাপ গাছে শুকনো ফুল দেখিয়ে বলে—এটা কী? এটা এখানে কেন? জানোনা আমি মরা ফুল দেখতে পারি না!
—দুঃখিত মিস্টার বোস। এক্ষুনি তুলে ফেলে দিচ্ছি।
প্রদীপ দত্ত ফুলটা তুলতে যাচ্ছিল অনিকেত বাধা দিয়ে বলল—থাক, থাক। তুলো না।
কী কারণে যেন প্রদীপ দত্ত একটু হাসল।
অনিকেত ঘরে ফিরে আয়নায় নিজেকে দেখতে-দেখতে আপন মনে বলল—একচল্লিশ! একচল্লিশ!
আয়নায় ছায়া ফেলে প্রদীপ দত্ত কাছে এসে বলল—এমন কিছু নয় স্যার, চল্লিশে যৌবন শুরু।
অনিকেত একটু হেসে বলে—ইফ ফর্টি কামস, ক্যান ফিফটি বি ফার বিহাইন্ড?
কী কারণে যেন প্রদীপ দত্ত আবার একটু হাসল।
কে আমাকে ভালোবাসে? হঠাৎ এই প্রশ্ন মাঝরাতে চাবুকের মতো তার সমস্ত শরীরের চমকে দিল। ঘুম ভেঙে উঠে বসে অনিকেত। প্রশ্নটাকে অসম্ভব জরুরি বলে মনে হয়। যে মেয়েটি তার বিছানায় শুয়ে আছে সে-ই প্রথম দিন খিমচে দিয়েছিল তার গালে। এখন ভীষণ বাধ্য হয়ে গেছে।
অনিকেত ডাকল—মিলি, মিলি!
সঙ্গে-সঙ্গে উঠে বসল মিলি। গায়ের আবরণ সরাতে-সরাতে কটাক্ষ করে হাসল একটু।
অনিকেত মেয়েটির দিকে চেয়ে থাকে। ও কি ভালোবাসে আমাকে?
অনিকেত বলল—মিলি, তুমি একটু গান গাইবে?
—নিশ্চয়ই। কী গান গাইতে হবে?
—যা খুশি। আনন্দের গান গাও, প্রেমের গান।
—মিলি গাইতে লাগল।
অনিকেত মাথা নেড়ে বলেনা, গান নয়। এসো, দুজনে নাচি।
দুজনে নাচল। নাচতে নাচতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
–হচ্ছে না। অনিকেত বলে।
–কী?
—কিছু নয়। মিলি, আমাকে একটু জড়িয়ে ধরে থাকো, তোমার শ্বাসে আমার শ্বাস মিশে যাক, আমি তোমাকে কিছুক্ষণ অনুভব করি।
মিলি আশ্লেষে জড়িয়ে ধরল তাকে। নিঝুম হয়ে খানিকক্ষণ অনুভব করে অনিকেত। মিলিকে। সে যা করতে বলে তাই করে সে। নইলে প্রদীপ দত্ত আসবে, ভয়ঙ্কর শাস্তি দেবে মিলিকে। অনিকেত মিলির বুকের হৃৎস্পন্দন শুনল। জোরে চলছে হৃৎপিণ্ড। এর হৃৎপিণ্ড ভয়ের বাস, লোভের আস্তানা।
