—উনিশটা দিন এর মধ্যে কেটে গেছে মিস্টার বোস।
—তোমার কাটেনি? তোমার বাড়েনি উনিশ দিনের বয়স?
—না। আমি অনন্ত আয়ু। এজলেস।
—তবে আমার কেন বাড়বে প্রদীপ দত্ত?
—প্রকৃতির নিয়ম স্যার।
আচমকা হুইস্কির গ্লাসটা ছুড়ে মারে অনিকেত। প্রদীপ দত্তর মুখে গিয়ে সেটা ফটাস করে ভাঙে। কাচ ছড়িয়ে পড়ে চারধারে। একটুও কাটে না বা লাগে না ওর, রক্তপাত হয় না। প্রদীপ। দত্ত নীচু হয়ে কাচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিতে থাকে।
বিপজ্জনক নীচু স্বরে অনিকেত বলে—স্কাউন্ট্রেল! ইউ স্কাউন্ট্রেল! বলে তড়িতে উঠে গিয়ে টেবিল থেকে কাগজকাটা একটা ছুরি তুলে নেয়। তারপর চকিতে এগিয়ে গিয়ে বারংবার প্রদীপ দত্তর পিঠে, বুকে পেটে ছুরিটা বসিয়ে দিতে থাকে।
বিনীতভাবে প্রদীপ দত্ত অপেক্ষা করে। অনিকেত ক্লান্ত হয়ে গেলে প্রদীপ দত্ত ছুরিটা নিয়ে টেবিলে রেখে দেয় ফের। নরম স্বরে বলে—একটু ঘুমিয়ে থাকুন। টেক এভরিথিং ইজি।
ক্লান্ত অনিকেত বলে—চলে যাও, প্রদীপ দত্ত, চিরদিনের মতো চলে যাও। আমি আর তোমাকে চাই না।
প্রদীপ দত্ত কেমন যেন একটু হাসে। অত্যন্ত ভদ্র গলায় বলে—গুড নাইট স্যার, টিল ইউ কল মি এগেন।
—আই ওনট কল ইউ বাস্টার্ড। গো অ্যাওয়ে। ডাই।
কিন্তু পরদিনই ঘুম ভেঙে অনিকেত ডাকে—প্রদীপ দত্ত! প্রদীপ দত্ত!
প্রদীপ দত্ত সামনে আসে। খুব যত্নে তাকে বিছানা থেকে তোলে। বাথরুমে পৌঁছে দেয়। বলে সব ঠিক আছে স্যার।
বাথরুমের শার্সি দিয়ে অনিকেত দেখতে পায় নীচে একটা রেইন ট্রি থেকে হলুদ পাতা ঝরে যাচ্ছে। দৃশ্যটা সহ্য হয় না তার। একটা নতুন টুথপেস্টের টিউব আয়নার সামনে থেকে তুলে নেয় অনিকেত। নতুন টিউব, পেস্টে ভরা। অনিকেত কিছু না ভেবেই টিউবটা টিপে ধরে। সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে পেস্ট বেরোতে থাকে। সারা বাথরুমের মেঝে জুড়ে অনিকেত পেস্ট ছড়ায়। পেস্ট দিয়েই সে মেঝেয় লেখে—আমি চাই অনন্ত আয়ু, আমি চাই অনন্ত ভালোবাসা, হায়—পেস্ট ফুরিয়ে যায় এখানে। টিউবটা ছুড়ে ফেলে দেয় অনিকেত। চিৎকার করে ডাকে প্রদীপ দত্ত, কেন টিউবের পেস্ট ফুরোবে? আমি এমন টিউব চাই যার পেস্ট কখনও ফুরোবে না। যাও, নিয়ে এসো।
প্রদীপ দত্ত অনেকগুলো জায়ান্ট সাইজ টিউব এনে দেয়, কিন্তু সেগুলো আর ফিরেও দেখে না। অনিকেত। সে বলে—প্রদীপ দত্ত তুমি কবে আমাকে ছেড়ে যাবে?
—আমি ছেড়ে যেতে পারি না মিস্টার বোস। আমাকে আপনার মৃত্যু পর্যন্ত থাকতে হবে।
—আমার মৃত্যু কবে হবে প্রদীপ দত্ত।
–যথাসময়ে। অপেক্ষা করুন।
—কিন্তু আমি তোমাকে সহ্য করতে পারছি না। কোনও নশ্বর মানুষ সহ্য করতে পারে এক মৃত্যুহীন মানুষকে? বলো প্রদীপ দত্ত, পারে কেউ?
—দুঃখিত মিস্টার বোস। কিন্তু আমি তো আপনাকে খুশি করার প্রাণপণ চেষ্টা করছি।
অনিকেত খুব ক্লান্তস্বরে বলল—আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। তুমি আমাকে আর খুশি করতে পারো না। আমাকে অনন্ত আয়ু দাও প্রদীপ দত্ত, অনন্ত কাম দাও, অনন্ত ক্ষুধা আর তৃষ্ণা। দাও! একটা নশ্বর শরীর আর-এক জীবনের আয়ু নিয়ে কী করে পথিবীতে ভোগ করা যাবে। প্রদীপ দত্ত! দয়া করো।
চিন্তিত প্রদীপ দত্ত মৃদুস্বরে বলে—অ্যাবস্ট্রাক্ট মিস্টার বোস, আমি দুঃখিত।
—তবে এই মুহূর্তে আমাকে মৃত্যু দাও প্রদীপ দত্ত। আমি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে পারব। যাও, আমার জন্য যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর ব্যবস্থা করো।
প্রদীপ দত্ত কেমন একরকম হাসে। বলে—মৃত্যু?মৃত্যুও অ্যাবস্ট্রাক্ট মিস্টার বোস। আমি তা দিতে পারি না। যথাসময়ে তা ঘটবে। আপনাকে অপেক্ষা করতেই হবে।
হতাশায় ভরে যায় অনিকেত। বলে—তবে যা দিয়েছ তা সব ফিরিয়ে নাও প্রদীপ দত্ত।
–লাভ কী? আপনি ইচ্ছে করলেই আবার সব ফিরে পাবেন।
–প্রদীপটা যদি নষ্ট করে ফেলি প্রদীপ দত্ত?
—ওটা নষ্ট হওয়ার নয়। প্রদীপটা আনপেরিশেবল, শক রেজিস্ট্যান্ট, করোশন প্রভড, ফায়ার রেজিস্ট্যান্ট, অ্যান্ড গ্যারান্টিড ফর ইটারনিটি।
—যদি কাউকে দিয়ে দিই?
প্রদীপ দত্ত একটু হেসে বলে–লাভ নেই মিস্টার বোস। তখন প্রদীপটার জন্য শোকে আপনি পাগল হয়ে যাবেন। যতক্ষণ এটা আপনার কাছে আছে ততক্ষণ আপনি বুঝতে পারছেন না প্রদীপকে আপনার কী ভীষণ দরকার!
ঠিক। খুবই ঠিক কথা। অনিকেত বুঝল। বুঝে একটু শিউরে উঠল ভয়ে, অনিশ্চতায়। বলল —না, না, কাউকে দেব না।
—সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বলে কেমন একটু হাসল প্রদীপ দত্ত।
হাসিটা চেয়ে দেখল অনিকেত। তারপর হঠাৎ সে-ও ঠিক ওইরকম একটু হাসল। খুব বুঝদারের হাসি। হাসতে-হাসতে কখন হঠাৎ চোখে জল এসে গেল তার। প্রদীপের দৈত্য বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে রইল সামনে। পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায়।
ইচ্ছে
দেশলাইয়ের কাঠির অর্ধেক ভেঙে দাঁত খুঁচিয়েছিল কখন। বিড়ি ধরাতে গিয়ে সাঁটুলাল দেখে খোলের মধ্যে সেই শিবরাত্রির সলতে আধখানা বারুদমুখো কাঠি দেমাক দেখিয়ে পড়ে আছে।
আজ চৈত্রের হাওয়া ছেড়েছে খুব। কাল বৃষ্টি গেছে ক’ফোঁটা, কিন্তু আজই তেজাল রোদ আর খড়নাড়ার মতো শুকনো হাওয়া দিচ্ছে দ্যাখো। হাওয়ার থাবায় এক ঝটকায় কাঠির মিনমিনে আগুন নিবে যাবে। যদি তাই যায় তো আরও চার পো পথ বিন–বিড়িতে হাঁটো। তারপর হাজারির দোকানের আগুনেদড়িতে বিড়ি ধরিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু অতক্ষণে বিড়ি ছাড়া হাঁটা যায়! মুখে থুথু আসবে, বুক আঁকুপাঁকু করবে, কী নেই–কী নেই মনে হবে।
