তারপর উঠে চকিত পায়ে দৌড়ে এল দরজার দিকে। অনিকেত যেখানে দাঁড়িয়ে ঠিক সেই দিকে। অনিকেত কিছু বুঝবারও সময় পেল না, মেয়েটা প্রচণ্ড নখে হঠাৎ চিরে ফেলতে লাগল তার মুখ। অনিকেত চিৎকার করে উঠল—প্রদীপ দত্ত! প্রদীপ দত্ত!
বন্ধ দরজা খুলে প্রদীপ দত্ত শান্ত পায়ে ঘরে আসে। একটা হাতে মেয়েটাকে তুলে নেয়। অনায়াসে। ডিভানে প্রায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে অনিকেতকে বলে—আমি ঠিক রিকোয়ারমেন্টস মতো বাছাই করে মেয়েটিকে তুলে এনেছি। কিন্তু আপনার প্রতি ওকে অ্যাট্রাকটেড করে তোলার কোনও উপায় আমার নেই। দ্যাট ইজ ইওর বিজনেস মিস্টার বোস। ট্রাই এগেন।
বলে চলে যায় প্রদীপ দত্ত।
অনিকেতের গাল ছিঁড়ে রক্ত পড়ছে, আগুনের মতো জ্বালা করছে মুখ। মেয়েটা উপুড় হয়ে ডিভানে পড়ে কাঁদছে।
অনিকেতের মাথায় আগুন জ্বলে গেল। হঠাৎ চিতাবাঘের মতো গিয়ে লাফিয়ে পড়ল ডিভানে।
প্রায় আধঘণ্টা গেল ধস্তাধস্তিতে। অনিকেত মেয়েটাকে কিছুতেই বাগে আনতে পারে না। মেয়েটার দু-খানা লম্বা হাত, হাতে নখ, দু-খানা পায়ে হরিণের গতি, অসম্ভব দম—এসবই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বারদুই ধরতে পেরেছিল সে মেয়েটিকে, কিন্তু কিছু করার আগেই ছিটকে বেরিয়ে গেল মেয়েটি। অনিকেত তীব্র পিপাসায় ছটফট করে। এমন তীব্র নারীদেহের তৃষ্ণা সে আগে কখনও টের পায়নি। কিন্তু তার বয়স প্রায় চল্লিশ, শরীর আগের মতো সতেজ নেই, দম কমে এসেছে। সে তাই হাঁফায় জিভ বের করা কুকুরের মতো।
তারপর প্রদীপ দত্ত আসে।
—সরি মিস্টার বোস।
অনিকেত মুখ তুলে তাকায়। তার একটু লজ্জা করে। সে একটু মাথা নেড়ে জানাল, সে পারেনি।
প্রদীপ দত্ত একবার ‘হু’ বলে একটু ভাবে। তারপর হঠাৎ কোথা থেকে একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জে ওষুধ জাতীয় কিছু নিয়ে আসে। মেয়েটিকে সে অনায়াসে ধরে ফেলে এক হাতে, তারপর ঝাঁকুনি দিয়ে ডিভানে শুইয়ে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে তার পিঠ, তারপর ইঞ্জেকশনের নির্দয় ছুঁচে তার হাতে ওষুধ ঢুকিয়ে দিয়ে অনিকেতকে বলে—এবার যা খুশি করুন।
মেয়েটি আর বাধা দেয় না, নিস্ক্রিয় পুতুলের মতো শুয়ে থাকে এক ঘোর আচ্ছন্নতায়। অনিকেত তার এতকালের অতৃপ্ত কামনা-বাসনা নিয়ে মেয়েটিকে গ্রহণ করার সময়ে টের পায়, মেয়েটি সম্পূর্ণ কুমারী ছিল।
অনিকেত নির্জীব হয়ে যখন উঠে এল তখন প্রদীপ দত্ত ঘরে আসে। একটু হেসে বলে— ওকে?
অনিকেত অনেক রাত পর্যন্ত মদ খেল বসে। বারংবার মেয়েটির শরীর আক্রমণ করল গিয়ে। কোনওবারই তৃপ্ত হল না। আরও আগুন জ্বলে ওঠে শরীরে। ভোর রাতে সে প্রদীপ দত্তকে ডেকে বলল—আরও মেয়ে। প্রতিদিন নতুন।
প্রদীপ দত্ত মাথা ঝাঁকিয়ে বলে—ব্যবস্থা হবে মিস্টার বোস।
অনেক কাল থেকে চেপে রাখা বহু ইচ্ছে অনিকেতের চিন্তায় নানা রঙের বর্ণালি সৃষ্টি করত। প্রতিদিন চাকরিতে যাওয়ার সময়ে মনে হত হায় রে, যদি ছুটি পেতাম অনন্ত! বড়লোকদের পাড়ায় চমৎকার সব বাড়ি দেখলে মনে হত—এরকম বাড়ি যদি আমার হত! সুন্দরী মেয়ে দেখলে ভাবত—এ যদি হত আমার প্রেমিকা! এরকম ইচ্ছে আর ইচ্ছে।
প্রায় সব ইচ্ছাই পূর্ণ হল অনিকেতের। ছুটি, বাড়ি, আর সুন্দরী মেয়েরা। অবশ্য মেয়েরা যে সবাই তার প্রেমিকা হয়েছে তা নয়। কিন্তু ক্রমে-ক্রমে বশীভূত হয়েছে। কলকাতায় অন্তত দশ বারোখানা অ্যাপার্টমেন্ট কেনা হয়েছে অনিকেতের নামে। সেরা সুন্দরীরা সেখানে থাকে। যোধপুর পার্কের বাড়িতে বড় একটা যাওয়া হয় না অনিকেতের। এইসব অ্যাপার্টমেন্টেই তার। দিন কাটে। প্রদীপ দত্ত ছায়ার মতো তার সঙ্গে আছে, কোনও গোলমাল হলেই এসে হাজির হয়।
অনিকেত এখন কয়েকটা মস্ত মস্ত প্ল্যান্টের মালিক, বিরাট ব্যাবসা তার। অবশ্য সেসব তাকে দেখতে হয় না, প্রদীপ দত্তই সব দেখাশোনা করে। এখন সে দেশের একজন অগ্রগণ্য লোক। অনেকগুলো সংস্থার সভাপতি, চেয়ারম্যান। বিপুল প্রতিপত্তি তার। খবরের কাগজে তার নাম। ওঠে। অনিকেত কয়েকবারই ঘুরে এল লন্ডন, নিউইয়র্ক, প্যারিস, টোকিও। গেল হাওয়াই দ্বীপে ফুর্তি করতে, মোনাকোতে গিয়ে জুয়া খেলল, প্যারিসে মহিলা প্রেমে রইল ডুবে। জীবনটা কানায়-কানায় ভরে উঠেছে, তার কোনও অভাব নেই। কেবল মনে হয়, তাকে যদি ঈশ্বর আরও একটু কামের ক্ষমতা দিতেন, আরও ক্ষুধা-তৃষ্ণা দিতেন তাহলে বড় ভালো হত। পৃথিবী ভরতি সুন্দরী মেয়ে, কত মহার্ঘ সুস্বাদু খাবার, কত চমৎকার পানীয়। কিন্তু একটিমাত্র শরীরে কত ভোগ করা যাবে?
খুব ভোরবেলায় অনিকেতকে উঠতে হয়। খাটো প্যান্ট আর গেঞ্জি, শীতকাল হলে পুলওভার পরে গাড়ি করে ময়দানে যায়। ময়দানে অনেকক্ষণ দৌড়োয় সে। ঠিক দৌড় নয়, প্রদীপ দত্ত বলে, জগিং। দৌড়তে হয় আস্তে-আস্তে, অনেকক্ষণ ধরে। সঙ্গে সবসময়ে প্রদীপ দত্ত থাকে। দৌড়ে ফিরে এলে ব্যায়াম শিক্ষক আসে, তারপর যোগব্যায়ামের শিক্ষক। ব্রেকফাস্ট। প্রদীপ দত্ত এই সময়ে অনেক কাগজপত্রে সই করায়। দশটা বাজতে-না-বাজতেই লোকজন আসে, কনফারেন্স থাকে, আসে খোশামুদরা। প্ল্যান্টে যেতে হয় মাঝে-মাঝে। টেলিফোনে কথা বলতে হয়। বিকেলে ক্লাব রেস্টুরেন্ট কখনও বা মিটিং থাকে। সন্ধের পর থাকে মেয়েরা, ড্রিংকস, কখনও বা বন্ধুবান্ধব জাতীয় কিছু লোকের সঙ্গে থাকে পার্টি। অবশ্য এসব ফেলে রেখে অনিকেত যে-কোনও সময়ে দেশভ্রমণেও বেরিয়ে পড়তে পারে। ভারতের সব বড় শহর, স্বাস্থ্যনিবাস বা সুন্দর জায়গায় তার বাড়ি আছে। বাড়ি আছে লন্ডন, নিউইয়র্ক বা টোকিওতেও। কোথাও কোনও অভাব রাখেনি প্রদীপের দৈত্য ওরফে প্রদীপ দত্ত। নিরাপদ এবং নিশ্চিন্ত তার আরাম। যেদিন তার কথা বলতে ইচ্ছে করে না বা কাজ করতে ইচ্ছে করে না সেদিন প্রদীপ দত্তই সব সামলায়, কোথাও আটকায় না।
