তাই হল। যথাস্থানে প্রদীপ দত্ত অপেক্ষা করছিল, ট্যাক্সিতে অনিকেতের পাশে মৃদুতে উঠে বসে অতি সুগন্ধী রুমালে ঘাড় মুখ মুছতে বলল—খুব ভালো বাড়ি পেয়েছি, আপনার যদি পছন্দ হয় তো এ সপ্তাহেই নেগোশিয়েশন হয়ে যাবে।
অনিকেত ভ্রূ তুলে বলল–বাড়িটা কি রাতারাতি তৈরি করলেন?
প্রদীপ দত্ত হেসে ফেলে বলল—আরে না, না। মিস্টার বোস, আগের দিনে যেমন হত তেমন কি আজকালও হবে? ফাঁকা জায়গারও তো ওনার আছে। তা ছাড়া রাতারাতি বাড়ি উঠলে সবাই এসে চেপে ধরবে আপনাকে। কর্পোরেশন, ট্যাক্স, সি ই এস সি, কে নয়? এখন যা হবে সব গ্রু প্রপার নেগোশিয়েশন। আপনাকে আমি তো বিপদে ফেলতে পারি না।
ট্যাক্সি যেখানে এসে থামল সেটা যোধপুর পার্কের চমৎকার একটা চওড়া রাস্তা। বাড়ি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। সামনে অনেকখানি লন, ফুলের বেড়। অকল্পনীয় সুন্দর নকশার টালি বসানো মেঝে। নীচের তলায় ছ’খানা ঘর, দোতলায় চারখানা। তিনতলায় দুই ঘরের
স্টাডি, রুফ গার্ডেন।
প্রদীপ দত্ত বলল—সদ্য তৈরি হয়েছে বাড়িটা। এখনও কেউ থাকেনি। বাড়ির মালিক শেয়ার মার্কেটে জোর মার খেয়ে বাড়ি বিক্রি করতে চাইছে।
একটু লজ্জার সঙ্গে অনিকেত বলে কত?
—ছ’লাখ। ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। দ্যাটস মাই হেডেক।
তবু সঙ্কোচ বোধ করে অনিকেত। টি ভি সেটটার কথা বলতে লজ্জা করে।
কিন্তু প্রদীপ দত্ত যেন তার মনের কথা টের পেয়েই বলল—টি ভি সেট বা মোটরগাড়ির কথা আপনার রিকোয়ারমেন্টসে ছিল না, কিন্তু সেসব অ্যারেঞ্জ করা হয়েছে। এখন আপনার একটা প্রেজেন্টেবল সোর্স অব ইনকাম আর ট্যাক্স রিটার্নগুলো দেখাতে হবে। সে সমস্ত নিয়ে অবশ্য আপনাকে ভাবতে হবে না। লিভ এভরিথিং অন মি। আপনি বরং মিসেসকে নিয়ে এসে বাড়িটা দেখিয়ে দিন।
ঝুমুর! ঝুমুরের কথা অনিকেত ভুলেই গিয়েছিল। এখন অবশ্য ঝুমুরের কথা ভাবতেও তার ভালো লাগছিল না। ইদানীং ঝুমুর বড় মোটা হয়ে গেছে। ভীষণ রাগীও। তা ছাড়া ঝুমুরের মধ্যে রহস্যও নেই আর।
অনিচ্ছার সঙ্গে অনিকেত বলল—আচ্ছা।
প্রদীপ দত্ত তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হাসল, বলল—আর যদি আপনি ইন্টারেস্টেড হন তবে ডিভোর্সের মামলা লড়ার জন্য ভালো উকিলের অ্যারেঞ্জমেন্ট করা যেতে পারে। হাই অ্যালিমনি দিলে মিসেসও খুব ঝামেলা করবেন না। যদি রাজি থাকেন তো সেসব আমিই নেগোশিয়েট করতে পারি।
একটু লাল হল অনিকেত। বুকটা নানা আশা-আকাঙ্ক্ষায় গুরগুর করে পাখির ডাক ডাকছে। মাথা নীচু করে সে বলল—তা নয়। ঝুমুরও থাক। ছেলেটাকে ছেড়ে থাকতে পারি না। তবে অন্য মেয়ে–
প্রদীপ দত্ত হঠাৎ গলা নীচু করে বলল—কীরকম মেয়েছেলে চান?
অনিকেত রুমালে মুখ ঢেকে, লাল হয়ে অনেক কষ্টে তার গোপন ইচ্ছের কথা অস্ফুটে বলল —টিনএজার। সুন্দর লাইভলি।
—ওকে।
সাতদিনের মধ্যেই জীবন পালটে গেল অনিকেতের।
ঝুমুর বাড়ি দেখে এত অবাক যে ভালো করে কথা পর্যন্ত বলতে পারছে না। টুইন গ্যারাজে দু দুটো দামি গাড়ি, ঘরে-ঘরে ভাবা যায় না এমন সব জিনিস চাকর, ঝি, মালি, সফারে বাড়ি গিজগিজ। পাঁচ-সাতটা ঘর এয়ারকন্ডিশন করা। এসব কি আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের কাণ্ড নাকি?
কয়েকবারই জিগ্যেস করেছে অনিকেতকে—এসব কী গো?কী করে হল?
–হয়েছে প্রপার নেগোশিয়েশনস। অনিকেত বলে—সব ট্যাক্স পেইড। চিন্তার কিছু নেই। এর বেশি কিছু বলে না অনিকেত।
একদিন প্রদীপ দত্ত ফোন করল—মিস্টার বোস, একটু দেরি হয়ে গেল কিছু মনে করবেন। আপনার রিকোয়ারমেন্টস অনুযায়ী একটি টিনএজার গার্ল পাওয়া গেছে। না, না, চিন্তার কিছু নেই, এসব ব্যাপারের জন্য ক্যামাক স্ট্রিটে একটা ফার্নিশড অ্যাপার্টমেন্ট আপনার নামে কেনা হয়েছে। আজ সন্ধেবেলা চলে আসুন। দিস অ্যাপার্টমেন্ট উইল বি ইওর প্লেজার স্পট। আপনার সফার ঠিকানা জানে।
শুনে অবধি অসম্ভব নার্ভাস লাগছিল অনিকেতের। হৃৎপিণ্ড এত জোরে ধাক্কা দিচ্ছে পাঁজরে যে সেই শব্দ নিজের কানে শুনতে পাচ্ছিল সে!
তবু গেল। তীব্র উত্তেজনা। এতদিনে সে জীবনকে উপভোগ করতে পারছে। এই তো জীবন।
সফার এক আটতলা বাড়ির সামনে নিয়ে এল অনিকেতকে। লিফটে সাততলায় উঠে কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে বিনীত হাসিমুখে প্রদীপ দত্ত বলল—এভরিথিং সেট। আসুন স্যার।
অ্যাপার্টমেন্টটা তার নিজের বাড়ির তুলনায় তেমন কিছু নয়। তবু এটাও চূড়ান্ত শৌখিন জায়গা। ঘরজোড়া কার্পেট, সোফা সেট, দুর্দান্ত সব আসবাব। ফ্রিজ, টি ভি সবই আছে। আর আছে ছোট্ট একটা বার, তাতে অন্তত পঞ্চাশ-ষাট রকমের বিলিতি মদ।
অসামান্য সুন্দরী মেয়েটি বসেছিল একদম ভিতরের দিকে একটা ঘরে। দরজার গা-তালায় চাবি ঢুকিয়ে প্রদীপ দত্ত দরজা খুলতে-খুলতে বলল—মেয়েটা অ্যাগ্রেসিভ, ওয়াচ ইয়োর স্টেপস।
শুনে একটু চমকে যায় অনিকেত। ঘরে ঢুকে সে আর একবার চমকায়। ঘরে একটা ডিভান, একটা ড্রেসিং টেবিল, দুটো ছোট টুল আর-একটা হোয়াট নট ছাড়া বেশি কিছু নেই। এক গোছা রজনীগন্ধা ভাঙা ফুলদানি সহ মেঝেয় ছিটিয়ে পড়ে আছে, জলে ভিজে শপশপ করছে কার্পেটমোড়া মেঝে। ড্রেসিং টেবিলের আয়না চুরমার, টুলগুলোয় পায়া ভাঙা; ডিভানে কালো পাতলা একটা হাউস কোট পরে মেয়েটি বসে আছে। এত সুন্দর মেয়ে অনিকেত জীবনে দেখেনি। যেমন ক্ষীণকটি, তেমনি উন্নত বুক। মুখ কে যেন ছেনি দিয়ে লক্ষ বছর ধরে কেটে তৈরি করেছে। গায়ের রং গোলাপি আলোয় ভরে দিয়েছে ঘর। তার চুল এলোমেলো, দুটো চোখ বাঘিনীর মতো জ্বলছে। অনিকেতের দিকে একবার রক্তজল করা চোখে তাকাল।
