হঠাৎ আবু খগেনকে বলল –দাঁড়াও।
খগেন দাঁড়ায়। রাস্তার পাশে প্রচুর বড়-বড় চাঁই পাথর পড়ে আছে, রাস্তা মেরামতের কাজে লাগবে। তারই একটা মাঝারি চাঁই তুলে নিয়ে আবু রাস্তার পাশে মাঠটায় যতদূর সম্ভব ছুঁড়ে দিলে, বলল –দেখলে? গত সাতদিনে কতটা ক্ষমতা বেড়েছে!
খগেন শ্বাস ফেলে বলে–দেখছি।
তার দেরি হয়ে যাচ্ছিল। মাঠের ভিতর দিয়ে শর্টকাট করতে নেমে গেল খগেন। একা-একা কালীর গান করতে-করতে আবু সরকারি গুদামের জঙ্গলে ঢুকে পড়ে।
৩.
এই বয়সে খিদেটা ম্যালেরিয়া জ্বরের মতো। হুড়মুড় করে উঠে পড়ে কাঁপুনি তুলে দেয়। এ বয়সে সব বেগই বড় তড়িঘড়ি আসে। সামলানো যায় না। মলমূত্র ত্যাগে একটু দেরি করেছ কী সব কাপড়ে–চোপড়ে হয়ে যাবে। খিদেও তাই। উঠল বাই তো কটক যাই।
গিরিজার চোখে জল আসে। পেটটা ডেকে-ডেকে কত কথা বলছে ভিখিরির মতো। সোজা হয়ে দাঁড়ানো যাচ্ছে না। কোলকুঁজো হয়ে কোনওক্রমে সেটাকে সামাল দেওয়া যাচ্ছে না! রাস্তাঘাট সব জ্যোৎস্নায় ডুবিয়ে মায়াবী রং করে রেখেছে। তিনটে রাস্তায় তিনবার যাওয়ার চেষ্টা করে গিরিজা একই জায়গায় ঘুরে এলেন। কানাওয়ালা ধরলে এরকমই হওয়ার কথা। চেনা রাস্তায় দশবার ঘুরলেও দিকভ্রম হবে, নিজের বাসার সদর দিয়ে গেলেও চেনা যাবে না। বয়স তিয়াত্তর, এই বয়সেই ভূতেরা এসে ধরে।
–জয় রাম, জয় রাম। জয় রঘুপতি। গিরিজা বিড়বিড় করতে থাকেন।
ঠঙাৎ করে একটা শব্দ হয়। টিনের চালে কে একটা মস্ত ঢিল মারল। এ টিনের শব্দ বলে ভুল হওয়ার নয়। বাস্তবিক ঢিল। টিনের চাল থেকে ছিটকে সামনের রাস্তায় পড়ে ব্যাঙবাজির খাপড়ার মতো লাফিয়ে গিয়ে ঘাস–জঙ্গলে পড়ল। স্পষ্ট দেখা। চোখে এখনও বেশ দেখেন গিরিজা। ঢিলটা পড়তেই তারস্বরে রাম নাম করতে-করতে একটা গুদামঘরের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়েন। বেহায়া ভূত। বুড়ো মানুষকে নিয়ে এ কী কাণ্ড বাবা! সব জায়গাতেই বুড়ো–ধুড়ো দেখলে সকলের রসের ভাঁড়ে তুফান জাগে। রাস্তাঘাটে চ্যাংড়ারা কত পেছুতে লাগে, বাজারের দোকানিরা ‘দাদু দাদু’ বলে রঙ্গ করে, তো ভূতও বাকি থাকে কেন?
এখন হিম পড়ে বলে ছাতাটা নিয়েই বেরোন। রাতের বেলা টিউশনি সেরে ছাতমাথায় ফিরে আসেন তো লোকে পেছুতে লাগে, বৃষ্টি-বাদলা বা রোদ না হলে ছাতার মর্ম ওরা বুঝবে কি! বুড়ো হোক, আগে সব ব্যাটা বুড়ো হোক, তখন বুঝবে। ছাতাটা ফেলে এসেছেন ছাত্রীর বাড়িতে।
আর-একটা ঢিল গদাম করে পড়ল কাছে-পিঠেই, কোনও গুদামের চালে। ঢিল নয়, এখন আধলা কিংবা থান ইট ছুড়ছে। একটা-দুটো চৌকিদার এখানে ঘোরাফেরা করে রোজ। তাদেরও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। জ্যোৎস্না রাতে বোধহয় আহ্লাদ হয়েছে খুব ব্যাটাদের, ছিলিমে দম দিয়ে, নয়তো সিদ্ধি চড়িয়ে কি দিশির চাপান দিয়ে পড়ে আছে। সরকারি গোয়ালে আর কী ধোঁয়া দেবে!
আছেন শুধু রামচন্দ্র। হৃদিস্থিতেন। কিন্তু তবু বুকটা বড় কাঁপছে। খিদেটা পেটের মধ্যে গেঁকি কুকুরের মতো ঘেউ-ঘেউ করে ধমকাচ্ছে তাঁকে।
ছাতাটা হাতে থাকলে একটু সাহস পেতেন। ভূতপ্রেত যাই হোক, ছাতা লাঠি কিছু হাতে থাকলে যেন একটু জোর–বল পাওয়া যায়। ওরা অবশ্য ছাতা কাল ফেরত দেবে। তবু
তাঁর ছেলে আবুটা মানুষ নয়। বউ বিপদ বুঝে ছেলেপুলে নিয়ে পিটটান দিয়েছে। সারাদিন মাথামুণ্ডু করে বেড়ায়। যৌবন বয়সে মিলিটারিতে গিয়েছিল মণিপুর ফ্রন্টে। সেখান থেকে ফিরে ওকে কালীতে পেল। ঘুমের মধ্যে ‘বুবি ট্রাপ বুবি ট্রীপ’ বলে চেঁচিয়ে উঠত। তারপর নানা ঘাটের জল খেয়ে এখন পেশকার। ছেলেবেলা থেকেই শুনে এসেছেন পেশকারি সোনার চাকরি। পেশকারের মা বেনারসি পরে পায়খানায় যায়, তেল দিয়ে আঁচায়। কোথায় কী? আবু মাস মাইনের অর্ধেক তার খাণ্ডার বউয়ের হাতে তুলে দিয়ে আসে। সেই বউ মাইনের তারিখে কোর্টের দরজায় মোতায়েন থাকে। উপরিও পায় না কিংবা নেয় না। অপদার্থ ভ্যাগাবন্ড।
ভাববেন, তার জো কি! ভূতটার আজ রস উছলে পড়ছে। দমাদম ঢিল মারছে ইদিক-সিদিক। ছাতাটা থাকলে কতকটা রক্ষে হত। কখন কোনটা মাথায় এসে পড়ে! রাম-রাম। যৌবন বয়সে ভূতকে মানেন কী বলে আজ সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে দুটো কান ধরে বললেন–ঘাট হয়েছে বাবা। আর অমন করব না। তোমাদের গড় করি। ভালো করে নিজের কান মললেন, কাঁদলেনও একটু। বলেন রাস্তাটা চিনিয়ে দাও বাবাসকল, জ্যোৎস্না একটু ঘুরিয়ে ফেল, চোখ ধাঁধিয়ে যায় বাবা। খিদের টানে শরীর হজম হয়ে যাচ্ছে। ওই বুঝি চৌকিদারের হুঁশ হল এতক্ষণে!
–কোন হ্যায় রে? বলে অশ্রাব্য খিস্তি দিল একটা। তারপর লাঠি ঠুকবার আওয়াজ। কে যেন চেঁচিয়ে বলল –উও ভাগ রহা। এ রামরিখ ভাই, পাকড়ো–
খুব চেল্লাচেল্লি আর দৌড়োদৌড়ি লেগে গেল। আশপাশেই হচ্ছে। গুদামঘরগুলোর জন্য দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু খুব একটা গোলমাল পাকিয়ে উঠল। ভারী-ভারী জুতোর শব্দ হচ্ছে রাস্তায়। ধুপধাপ মাটি চমকাচ্ছে।
একটু নিশ্চিন্ত হন গিরিজা। লোকজন দেখলে ভূত তফাত যায়।
কিন্তু রাস্তা বেভুল–করা কানাওয়ালা যে এখনও ছাড়েনি। কোন দিকটায় যাবেন ঠিক ঠাহর পাচ্ছেন না। তবু গুটিগুটি রওনা দিলেন। দেখা যাক।
বাপ রে! কালো মতন কি একটা ধেয়ে এল! জ্যোৎস্নার মধ্যে একটা করাল চেহারা। আকাশের দিকে হাত তোলা, চুল উড়ছে, আর হাহা অট্টহাসি।
