কেঁদে কঁকিয়ে উঠে বসে পড়েন গিরিজা, অস্ফুট গলায় বলতে থাকেন–রাম রাম রাম রাম—
ভূতটা থমকে দাঁড়ায়। বলে–কে রে, রাম নাম করিস?
গিরিজা সভয়ে বলেন–বুড়োমানুষ বাবা, মাপ করে দাও।
–কালীর নাম কর, কালীর নাম কর। কালীর নামে জগৎ উদ্ধার…আরে বাবা নাকি?
গিরিজা শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ান। ছাতাটা ফেলে এসেছেন বলে খুব দুঃখ হচ্ছে। হাতে থাকলে দামড়াটাকে ঘাকতক দিতেন।
ভয়ংকর রেগে গিয়ে বললেন–তুই কোত্থেকে–অ্যাঁ?
আবু ঝপ করে বাপের হাতটা চেপে ধরে বলে–দৌড়োও। চৌকিদাররা টের পেয়ে গেছে।
–কী টের পেয়েছে।
–পরে বলছি। দৌড়োতে না পারো জোর কদমে হাঁটো। নাহক এসে হামলা করবে।
–কিছু করেছিস নাকি?
বাপের হাতে ধরে গুদাম ঘরের ছায়ায়-ছায়ায় গা-ঢাকা দিয়ে জোর হাঁটে আবু। বাবাকে প্রায় হিচহেড় নিয়ে যায়। হাসতে-হাসতে বলে–আরে না। কয়েকটা ঢিল ছুড়ছিলাম।
গিরিজা অবাক হয়ে বলেন–ঢিল ছুঁড়েছিলি? আজ কি নষ্টচন্দ্র?
–আরে না। বলে খুব হাসে আবু।
–তবে কি শেয়াল?
–আরে না। শালারা হকির গুণ মানতে চায় না। গত সাতদিন ধরে খেয়ে আমি বুঝতে পেরেছি হত্ত্বকির মতো জিনিস হয় না। যৌবন ফিরে আসে। দেখবে? গুদাম পার হয়ে মাঠের মধ্যেকার পথ পেয়ে গেছে তারা। আবু একটা মস্ত ঢেলা কোত্থেকে কুড়িয়ে নিয়ে আচমকা চাঁদের দিকে ছুড়ল। সেটা খানিক উঠেই ধপ করে পড়ল।
–দেখলে? আবু জিগ্যেস করে।
–হুঁ।
–হ্যাঁ-হ্যাঁ। খুব ক্ষমতা বেড়ে যায়। চৌকিদার শালারা ধরতে পারত নাকি আমাকে? এমন দৌড় দিয়েছিলাম না? কী যে দম পাই এখন বাবা, মনে হয় এক নাগাড়ে দশ-বিশ ক্রোশ। দৌড়াতে পারি। হকিতে সব হয়।
গিরিজা নিশ্চিন্তে হাঁটছেন। পাগল হোক, ছাগল হোক, তবু তো ছেলে! ঠিক সময়টায় গিয়ে ওই ভূতুড়ে গোলকধাঁধা থেকে হাত ধরে টেনে এনেছে। ভগবান এখনও আছেন। রাম নামের জোর করে বাবা! ক’বার করতে–না-করতেই বাতাস ফুঁড়ে ছেলে বেরিয়ে এসে কুড়িয়ে নিল। নইলে বেঘোরে মারা পড়তেন নির্ঘাত।
আবু –ঝলে বাবা!
–হুঁ।
–যুদ্ধের সময়ে মণিপুর ফ্রন্টে আমাদের একরকম বড়ি দিত। খেলে খিদে নষ্ট হয়ে যেত, শরীরটা মুহূর্তের মধ্যে চাঙা হয়ে উঠত। চারদিকে বুবি ট্রাপ, বুবি মানে জানো তো। বুবি মানে বোমা। মাটিতে মাইন, ওপরে বোমা। সে-সময়ে একটু ঝিমুনি এল কি খিদেয় অস্থির হলে তো গেলে। ওই বড়ি খেলে সব কেটে যেত। মাইলের-পর-মাইল জঙ্গল ভেঙে বোঝা টেনে হাঁটতাম। বুঝলে বাবা, বহুকাল বাদে হতুকিতে আবার সেরকম জোর পাচ্ছি। দেখবে? একটু দৌড়ে দেখাব?
–না-না, থাক। গিরিজা ভয় খেয়ে বলেন। কানাওয়ালাটা আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে। ছেলে তফাত হলেই ধরবে। তিনি অস্ফুট গলায় বলেন–রাম রাম।
আবু বিরক্ত হয়ে বলে–কালী-কালী বলল । কালী নাম আর হকি। দেড়শো-দুশো বছর হেসে-খেলে।
বাড়ি এখনও দূর আছে। খিদেটা এমন কামড়ে বেড়াচ্ছে পেটের মধ্যে। মোচার ঘণ্ট আর ডালসেদ্ধ নিয়ে এক ভুর ভাত খাবেন আজ গিরিজা। ব্যাটারা বলে বুড়ো বয়েসে কম খেতে হয়। ইঃ! কম খাবে!
আবু হাত বাড়িয়ে একটা হস্তুকি দিয়ে বলে–খাও বাবা। সাংঘাতিক জিনিস। খিদেটা বড় কষ্ট দিচ্ছে। হকিটা আস্ত মুখে ফেলে মাড়ি দিয়ে চিবোতে থাকেন গিরিজা। সাঁৎ–সাঁৎ করে হত্ৰুকিটা পিছলে যাচ্ছে মাড়ি থেকে। রস বেরোচ্ছে না তবু চেষ্টা করতে থাকেন গিরিজা। চেষ্টাই তো জীবন।
হলুদ আলোটি
অদ্ভুত এক আলোর ভিতরে ঘুম ভাঙে মনোরমার। রোজকার আলো নয়। পাকা যজ্ঞিডুমুর ভাঙলে যেমন রং তেমন এক আলো। মনোরমার পায়ের দিককার জানালার ধারে ডুমুর ফল রোজ এসে ঠোঁটে ভাঙে বুলবুলি। সেই রংটাই এখন পৃথিবীময় ছড়িয়ে গেছে এই বৈশাখের বিকেলে।
শানুর থুতনিতে ঘাম, নাকের নীচে ঘাম, বুকে গলায় মুক্তোফল ফুটে আছে ঘামের। বড্ড ঘামে মেয়েটা। কোমরের জাঙিয়ার ইলাস্টিক আঁট হয়ে কোমরে বসেছে। ঘুমের আগে বাতাসা খেয়েছিল, বিছানায় সেই বাতাসার গুঁড়ো, আর লাল পিপড়ে। কামড়েছে সারাক্ষণ, তবু নিপাট ঘুমোচ্ছে মেয়েটা। মনোরমা শানুর জাঙিয়া খুলে দেয়, বিছানাটা হাত দিয়ে ঝাড়ে, তারপর হঠাৎ নিঃঝুম হয়ে আলোর দিকে চেয়ে থাকে। এ কি পৃথিবী? এ কি পৃথিবী নয়?
পৃথিবীর কি–ই বা সে জানে। একটা শ্বাস ফেলে। কিছু না। তবু মনে হয় তার ঘুম ভেঙেছে এক স্বপ্নের ভিতরে। মাঝে-মাঝে গাছপালা, মাটি, আকাশ পালটে যায়। যজ্ঞিডুমুরের গাছে একটা বুলবুলি ডুমুর ভাঙছে। পাখির গায়ের রোঁয়া উলটে যাচ্ছে হাওয়ায়! মনোরমা ঝুঁকে দেখল, আকাশে ঝড়ের মেঘ। গুমোট ভেঙে দমকা হাওয়ায় ধুলোবালি আর পুকুরের আঁশটে গন্ধ উড়ে এল।
জানালার জালের নীচে একটুখানি ফোকর দিয়ে সাবধানে হাত বাড়িয়ে মনোরমা জানালা বন্ধ করে। উঠে বাইরে আসে। হাওয়ায় তারের ওপর শুকোতে দেওয়া শাড়ি ঝুলে উঠোনে লুটোচ্ছে, শানুর ফ্রক উড়ে গেছে বাগানে, কয়লার স্তূপের ওপর পড়ে আছে ব্লাউজ। সেগুলো কুড়িয়ে নেয় মনোরমা, আর তখনও তার নিবিড় এলোচুলে ঝড়ের বাতাস এসে লাগে, ছুটে আসে বৃষ্টির গন্ধ, তামাটে মেঘে থেকে অদ্ভুত আলোটি ধীরে-ধীরে বহুদূর পর্যন্ত রঙিন করে দিচ্ছে। এই হচ্ছে ঝড়ের রং। এখুনি রেলগাড়ির মতো ঝড় এসে যাবে। তবু দু-দণ্ড মনোরমা দাঁড়ায়। কত অচেনা জায়গা ছুঁয়ে আসে ঝড়, কেমন পুরুষ স্পর্শ তার। মনোরমা দু-দণ্ড দাঁড়ায়, তার কপালের ওপর বড় একটা বৃষ্টির ফোঁটা এসে পাখির ডিমের মতো চড়াৎ করে ফাটে। অমনি দৌড়ে ঘরে আসে মনোরমা, মনে পড়ে–ওই যাঃ অনুপমার ঘরের জানলা তো সে বন্ধ করেনি! কত ধুলো ঢুকে গেছে। দিদি চেঁচাবে ঠিক।
