তবে কি গরিবেরই খিদে পায় বেশি?
আজ রাতে ভাত হবে। শালবাড়ির দিকে বিঘে চারেক জমি আছে, বর্গায় চাষ করে। সেখান থেকে পরশুদিনই আধমণ চাল দিয়ে গেছে ভালোমানুষ বর্গাদার। ক’দিন রাতের খাওয়াটা বেশ হচ্ছে। ফোঁটা ভাতের গন্ধ পাচ্ছেন যেন গিরিজা! কিন্তু কোথায় ভাত। কেবল অকাজের জ্যোৎস্না চারদিকে।
২.
আবুর কাজ বলতে দুটো, কালী সাধনা আর বকবক।
কালী সাধনা অবশ্য তার নিজের খেয়ালখুশি মতোই করে। ঘরের এক জায়গার দেওয়াল নোনায় খেয়েছে। সেই দাগধরা জায়গাটার দিকে চেয়ে সারাদিন একটু কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে সে
রামপ্রসাদী থেকে যাবতীয় শ্যামাসঙ্গীত সম্পূর্ণ বেসুরে গায়। সাধনার শেষ দিকটায় কালী নামটা আর পুরো উচ্চারণও করতে পারে না, কেবল বলে কাঃ, কাকা, কাঃ কা কা–সে স্নান করে না, স্নানের বদলে সে রোজ সকাল-বিকেল আধ কলসি করে জল খায়। সেটা নাকি অন্তস্নান। দেহের সব ময়লা ওই জলের ঠেলায় ঘামের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। তখন গামছা দিয়ে গা মুছলেই স্নান হয়ে গেল। মাথার চুল জটা হয়ে পেছন দিকে মৌচাকের মতো ঝুলে থাকে। ওদিকে কপালের ওপর দিকটায় টাক পড়ে যাচ্ছে। উকুনের চুলকনিতেও নখের ডগায় চুল উঠে আসে। তা টাকই পড়ুক, আর জটাই ঝুলুক, আবুকে সুন্দর দেখবার কেউ নেই। বউ তার সঙ্গে থাকে না। বিয়ের পর বারো বছর কষ্টেসৃষ্টে ছিল, তারপর বাপের বাড়ির চলে গেছে। কোথায় একটা চাকরি বাকরি করে। মাস পয়লা আবার আবুর কাছ থেকেও কিছু আদায় করে নিয়ে যায়। আবু পেশকারী করে। সাধুসন্ত মানুষ বলে তার রোজগার বেশি নয়।
ইদানীং তাকে হরীতকীতে পেয়েছে। কেরোসিনওয়ালা রামু বাড়ি-বাড়ি ঘুরে সাইকেলওয়ালা গাড়িতে কেরোসিন বেচে। রামু বলে তার বয়স নাকি নব্বই। ইয়া স্বাস্থ্য, যুবকদের চেয়েও বেশি শক্তি।
আবুর আবার সকলের সঙ্গেই ভাব। সারাদিন বকবক করতে হলে তোক বাছাবাছি চলে না। প্রতিদিনই সে কিছু না কিছু অপরিচিত লোককে আপন করে ফেলে। রামুর সঙ্গে তার ভাব অবশ্য দীর্ঘকালের।
দিনসাতেক আগে রামু তাকে কয়েকটা অদ্ভুত জিনিস খেতে দিয়েছিল, কচিকচি হরীতকী, বালিতে ভাজা। ভারী ভালো খেতে। ভাজা হরীতকী খেয়ে আবু মোহিত হয়ে গেল। রামু বলে–হারা খেয়ে এই নব্বই বরিষ উমরে আমার এত তাকত।
কোনও জ্ঞানই ফ্যালনা নয়। সেই থেকে আবু হরীতকীর পিছনে লেগেছে। গত সাতদিন মানুষ হরীতকীর জীবন-যৌবন-দায়িনী ক্ষমতার কথা শুনতে-শুনতে পাগল হয়ে গেল। তবু আবুর। ক্লান্তি নেই। বিধান মার্কেট আর পুরোনো বাজার ঘুরে সে ইতিমধ্যে প্রায় তিন কিলো হরীতকী এনে ফেলেছে। জামার দু-পকেট ভরতি হরীতকী নিয়ে ঘোরে, যাকে তাকে ধরে-ধরে খাওয়ায়। নিজে সবসময় মুখে হরীতকী নিয়ে ঘুরছে।
সন্ধেবেলা সে মানিকরামের ডাক্তারখানায় উঠে বসে পড়ল। ডাক্তারখানায় রুগি–টুগি আসে। মানিকরামের ঢের পৈতৃক পয়সা আছে, আর ব্রিজ খেলার নেশা। পসার নেই। নিতান্ত দায়ে
পড়লে কেউ তাকে ডাকে না, বলে–ও তো তাস খেলতে-খেলতে ডাক্তারি ভুলে গেছে। তবু ডাক্তারখানা আছে নামকোবাস্তে। সন্ধের পর সেখানে ব্রিজের আড্ডা বসে, কিছু উটকো লোক সময় কাটাতে আসে, গল্পগাছা হয়। আবু ডাক্তারখানায় ঢুকতেই কিছু লোক খবরের কাগজের পাতা ভাগ করে ডুব দিল, একজন অন্যধারে উঠে গেল। চোরের দায়ে ধরা পড়ল বেকার কম্পাউন্ডার সাধন। সে টোকা দিয়ে মশা মেরে টেবিলের ওপর জড়ো করছিল। রোজ সেঞ্চুরি করে। আজও তিরাশিটা হয়েছে এ পর্যন্ত। আর সতেরোটা বাকি। টেবিলের ওপর মরা মশার একটা ছোট স্তূপ তৈরি হয়েছে। চুরাশি নম্বর মশাটা পান করে কানের কাছ থেকে উড়ে এসে থুতনিতে ধাক্কা খেয়ে বসি-বসি করছে। সাধন খুব সাবধানে অনড় হয়ে লক্ষ রাখছিল। এমন সময়ে আবু উঠে এসে ঝপ করে বসেই বলতে শুরু করল হুতুকির যা কাণ্ড দেখলাম সাত দিনে, বলার নয়।
মশাটা বসল না। উড়ে অন্যধারে চলে গেল। বিরক্ত হয়ে সাধন বলে–বেশি খেও না আবুদা। আবু অবাক হয়ে বলে–বেশি খাব না?
–না। পরে বিপদে পড়বে।
আবু রেগে গিয়ে বলে–হতুকির তুই জানিসটা কী শুনি! মুনিঋষিরা একটা করে পাকা হকি খেয়ে কতকাল বাঁচত জানিস?
–মুনিঋষির কথা বাদ নাও। তারা না হয় একটা করে খেত, তুমি কিন্তু দশ-বারোটা করে চালাচ্ছ। শেষে বিপদে পড়ে যাবে।
–যা জানিস না তা নিয়ে কথা বলবি না। বিরক্ত হয়ে আবু বলে।
–দাসীর কথা বাসি হলে কাজে লাগবে। সাধন চুরাশি নম্বর মশাটিকে গোঁড়ালির হাড়ের ওপর খতম করে টেবিলের ওপর রাখল। আর যোলোটা। আবুর দিকে চেয়ে বলল –বেশি হকি খেলে শুক্রতারল্য হয়।
হ্যাঁ-হ্যাঁ করে হেসে ওঠে আবু। মূর্খ বলে কী? তা ছাড়া হরীতকীতে ওরকম কিছু হতে পারে, এ ভাবাই যায় না।
আবু বলে–বুঝলে বাবা, হরীতকী হল অমৃত। এ রেগুলার খেলে একশো-দুশো বছর বেঁচে থাকাটা কোনও কথাই নয়। বাঁচতে-বাঁচতে ঘেন্না ধরে যাবে। তখন মরার জন্য আনচান করে উঠবে, কিন্তু মরা কি সহজ?
ডাক্তারখানা থেকে নেমে রাস্তায় সে মুদি খগেনকে পেয়ে গেল। খগেন তার রাখা মেয়েমানুষের বাড়ি যাচ্ছে। অনেকটা পথ তাকে সঙ্গ পেয়ে ভারী আহ্লাদ আবুর। হরীতকীর যাবতীয় গুণের কথা কি বলে শেষ করা যায়! এত সস্তা, হাতের কাছের জিনিস লোকে তবু গ্রাহ্য করে না। মূর্খ সাধনচন্দ্র কী যেসব বললে, হ্যাঃ! এক হপ্তা খেয়ে আবুর নিজের পুরোনো অম্বলের অসুখ নেই। অম্বলের চাকা পেটময় বেড়াত, গলে তরল হয়ে গেছে। চোখে ছানির ভাব ছিল, কেটে গেছে। বাহান্ন বছর বয়সে এখন হঠাৎ শক্তির জোয়ার এসেছে গতরে।
