লোকটা হেসে বলল—তাই আপনি প্রদীপ ঘষামাত্র আমি প্রদীপ থেকে বেরিয়ে আসিনি, বরং আপনাকে ঘাবড়ে যেতে না দিয়ে খুব ভদ্রভাবে দরজায় নক করেছি।
অনিকেতের বুকটা কাঁপছিল। উত্তেজনায় সিগারেটটা ধরিয়েই বুঝল বেহিসেবি খরচ হয়ে যাচ্ছে। আবার তৎক্ষণাৎ মনে হল—এ লোকটা যদি প্রদীপের দৈত্যই হয়ে থাকে তবে এর কাছে অনায়াসেই তো এক প্যাকেট সিগারেট চাওয়া যায়! একটু ভেবে অনিকেত খুব লাজুক স্বরে বলল —এক প্যাকেট সিগারেট যে এখন কাকে দিয়ে আনাই।
—জাস্ট এ মিনিট। লোকটা টপ করে উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টের পকেট থেকে এক প্যাকেট পাঁচশো পঞ্চান্নর কিং সাইজ কুড়িটার প্যাকেট আর-একটা খুদে গ্যাসলাইটার বের করে সেন্টার টেবিলে রেখে বলল—আমি এটা আগেই আন্দাজ করেছিলাম। ইউ মে নিড এ লট অব সিগারেটস। বলুন, এখন আর কী করতে পারি!
খুবই অবিশ্বাসভরে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা দেখল অনিকেত। তার বুক কাঁপছে, অসম্ভব নার্ভাস লাগছে, ভয় করছে। তবু লোকটার বিনয় আর ভদ্রতা দেখে তার একটু সাহসও হচ্ছিল আস্তে-আস্তে। সে বলল—আমি যা চাই সব দিতে পারবেন?
লোকটা অল্প মাথা নেড়ে বলল—নিশ্চয়ই। যে-কোনও বস্তুগত জিনিসই আমি আপনাকে দিতে পারি। কিন্তু যদি আপনার মন খারাপ লাগে কখনও, বা যদি গানের গলা না থাকা সত্বেও কখনও আপনার সঠিক সুরে গান গাইতে ইচ্ছে করে তাহলে সেসব ক্ষেত্রে আমার কিছু করার
নেই। কিন্তু মন ভালো রাখার জন্য আমি আপনাকে সিনেমার টিকিট, সুন্দরী মেয়ে বা ভালো মদ সাপ্লাই দিতে পারি, গানের জন্য তানপুরা, হারমোনিয়ান বা ভালো ওস্তাদ এনে দিতে পারি।
—যদি অসুখ হয়?
—তার জন্য ডাক্তার বা ওষুধ এনে দেওয়ার ভার আমার, কিন্তু অসুখ সারানোর দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। বস্তুগত সব জিনিসই আপনি আমার কাছ থেকে পাবেন, বাট নাথিং অ্যাবস্ট্রাক্ট অর ম্যাজিকাল।
অনিকেত মাথা নেড়ে বলে–বুঝেছি।
লোকটা মিষ্টি হেসে বলল—এ যুগের সঙ্গে আমার ক্ষমতাকেও সীমাবদ্ধ রাখতে হয়েছে।
অনিকেত শ্বাস ফেলে বলল—তাতেই হবে।
লোকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বলল—ধন্যবাদ। এবার বলুন—
অনিকেতের চাইতে লজ্জা করছিল। একটা লোক তাকে মাগনা মাগনা জিনিসপত্র দেবে ভাবতে কেমন লাগে। তাই সে সরাসরি কিছু চাইতে পারল না। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল— আমার নাম অনিকেত! এ নামের মানে আপনি কি জানেন?
লোকটা হেসে বলল—আলবত! অনিকেত মানে যার নিকেত বা নিকেতন অর্থাৎ বাড়ি নেই। মানে গৃহহীন।
অনিকেত মৃদু লাজুক হেসে বলে—আমি সার্থকনামা। আমার বাড়ি নেই।
—ইট উইল বি অ্যারেঞ্জেড। বলে লোকটা মাথা নেড়ে পকেট থেকে একটা চমৎকার নোটবই আর ডটপেন বের করে বলল—বলুন, কীরকম বাড়ি আপনার দরকার? রিকোয়ারমেন্টগুলো একটু ডিটেলে বলবেন।
অনিকেত ভীষণ সংকোচের সঙ্গে বলে—ছোটখাটো একটা বাড়ি হলেই হবে। যেমন হোক।
—সঙ্কোচ করবেন না মিষ্টার বোস। আমি আপনার যে-কোনও হুকুম তামিল করতে বাধ্য। ডোন্ট বি শাই।
অনিকেত একটু ভেবে বলল—দোতলা। পাঁচ-ছ’খানা ঘর। ভালো বাথরুম-টাথরুম! দক্ষিণে বারান্দা। যদি একটু বাগান—?বলে থামল।
-হুঁ-হুঁ বলুন। ঘরগুলো কত বাই কত?
—মাঝারি। খুব বড় বা ছোট নয়।
–বুঝেছি। ফার্নিচারের কথা কিছু বলবেন?
—ফার্নিচার? হ্যাঁ, ফার্নিচার। ধরুন, ডানলোপিলোর সব চেয়ার, সোফা, বার্মা টিক-এর খাট। মানে, সব মর্ডান জিনিস আর কি! আপনি যেমন ভালো বুঝবেন তেমন! আর আমার স্ত্রী একটা ফ্রিজের কথা প্রায়ই বলেন, আর গ্যাস উনুন।
লোকটা নোটবই বন্ধ করে বলল, বাড়িটা কোন এরিয়ায় হলে আপনার পছন্দ?
—ধরুন, নিউ আলিপুর! না, না, সেখানে বড় নির্জন জায়গা, চাকরেরা দুপুরে বাড়ির গিন্নিকে খুন করে পালানোর কেস কাগজে পড়েছি। তার চেয়ে যোধপুর পার্ক ভালো।
লোকটা মাথা নাড়ল, বলল—ইট উইল বি অ্যারেঞ্জড। ভাববেন না। কাল বেলা এগারোটায় আমি আপনার অফিসে ফোন করব। ততক্ষণে একটা কিছু ব্যবস্থা হবে। আমি আসি তাহলে। বলে লোকটা উঠল।
অনিকেত তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে দিতে বলল—আচ্ছা, আমি আপনাকে কী বলে ডাকব বলুন তো?
লোকটা একটুও না ভেবে হেসে বলল—ইজি। আপনি যে নামে আমাকে প্রথম ডেকেছিলেন সেই নামে ডাকবেন। প্রদীপ দত্ত।
লোকটা চলে গেল। হঠাৎ অনিকেতের মনে হল কী বোকা আমি! টেলিভিশনের কথাটা বলে দিলাম না! ভেবে পরমুহূর্তেই সে হাসল। ভাবল, দূর! লোকটাকে তো আবার এক্ষুনি ডাকতে পারি। কিন্তু এক্ষুনি আবার ডাকতে লজ্জা করল বলে ডাকল না। কাল তো দেখা হবেই।
প্রদীপটা খুব সাবধানে কাগজে মুড়ে ঘরের বুক-শেলফে একটা ডিকসনারিকে সরিয়ে খুঁজে রাখল। তার কেবলই মনে হচ্ছিল, এটা স্বপ্ন। কিন্তু পাঁচশো পঞ্চান্ন নম্বরের প্যাকেট আর লাইটার। এখনও পড়ে আছে টেবিলে। সে খুব মেজাজে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর ভাবল—এরকম। হা-ভাতের মতো আমি এতকাল বেঁচে ছিলাম কী করে?
না আচাঁলে বিশ্বাস নেই। সে ঝুমুরকে কিছু বলল না। কাঁপা বুক আর উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। খেতে পারল না, ঘুমও হল না ভালো করে। আজ তার বারবার মনে হচ্ছিল, ঝুমুর দেখতে নিতান্তই সাদামাটা। এত সাধারণ মেয়ে নিয়ে ঘর করায় কোনও মজা নেই।
পরদিন ঠিক বেলা এগারোটায় ফোন এল। প্রদীপ দত্ত বলল—মিস্টার বোস একটা ট্যাক্সি নিয়ে এক্ষুনি চলে আসুন। আমি আপনার জন্য গড়িয়াহাটের পুব দিকের ফুটপাথে বাসস্টপে অপেক্ষা করছি। অফিস থেকে হাফ ছুটি নিন, আর ট্যাক্সি ফেয়ার আমিই দেব।
