খানিকক্ষণ–যেন ঘুমের ভিতরে হেঁটে গেল মাখনলাল। কিছুক্ষণ আগেকার গুমোট ভাবটা আর নেই। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে মনে হয়। অবাস্তব এসপ্ল্যানেড দুলে–দুলে সরে যায়। ভেঙেপড়া দুর্গের অবশিষ্ট একটিমাত্র স্তম্ভের মনুমেন্ট। কারা তার সঙ্গে হাঁটছে, উলটোমুখো হাঁটছে, সামনে পিছনে এলোপাথাড়ি তাকে পেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের অবয়ব, মুখ এবং শো-কেসে, আয়নায় প্রতিবিম্বিত তাদের গোলাকার, কখনও লম্বাটে অ্যাবস্ট্রাক্ট চলন্ত ভগ্ন অবশেষ। কেন এমন হয় সে ভাবছিল। কার চোখ সে দেখেছিল! কার চোখ! খুব নিষ্ঠুর কেউ কি! অমন নিষ্ঠুর চোখের লোক পৃথিবী থেকে যত কমে যায় তত ভালো। কেমন নিঃসঙ্গ লাগছিল মাখনলালের। বুকে লুকোনো কোনও মাইক্রোফোন থেকে কে যেন কেবলই কথা বলছে। তার ঠোঁট নড়ছিল। সে কিছুই শুনতে পেল না। বুঝল না। হাজার কোণ থেকে, স্মৃতি থেকে, স্বপ্ন থেকে তির্যক, ভাঙা যৌগিক দৃশ্য ও শব্দ তার ওপর ঝরে পড়ছিল।
নাকি–বৃষ্টি! সুরেন ব্যানার্জি রোড পার হতে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশের উত্তোলিত হাতে বাধা পেয়ে সে জুন মাসের প্রথম বৃষ্টিপাত দেখল। হাজারটা থার্মোমিটার ফুটপাথে আছড়ে পড়ে ভাঙছে।
সংবিৎ পেয়ে দৌড়ে শিয়ালদার বাসে উঠতে গিয়ে সে দেখল ডবল–ডেকারে বেজায় ভিড়। বাস–স্টপেজের শেড-এর নীচে কিছুক্ষণ দাঁড়াল মাখনলাল। শেড-এর তলায় ভিড় ক্রমশ বাড়ছিল। ভিড়ে দাঁড়িয়ে সকলের গায়ের গরম অসুস্থ ভাপ, নিশ্বাস, সিগারেট ধোঁয়ার শ্বাস নিতে নিতে সে দূরগামী হরিণের লঘু পদশব্দের মতো বৃষ্টির শব্দ শুনছিল। মনে হয় চারপাশের সবকিছু হঠাৎ কোথায় যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। সিঁড়িতে, ফুটপাথে, রাস্তায়, ডবল–ডেকারে–সবকিছুর ওপর চরাচর জুড়ে প্রবল হরিণের মতো লাফিয়ে ছুটছে বৃষ্টি। রাস্তার চৌ–মাথা, পুলিশ, লম্বা অফিস–বাড়ি, উজ্জ্বল দেখান–সব কেমন আড়ালের মতো স্থির থেকে ভিজে যাচ্ছে।
বৃষ্টির প্রথম দমকটা কেটে গেলে মাখনলাল ঘড়ি ঢেকে কবজিতে রুমাল বেঁধে রাস্তায় নামল। কিছুটা হেঁটে গেলে আবার বৃষ্টির জোর বাড়তে থাকে। জলের ফোঁটার প্রবল আঘাতে তার মুখের চামড়া ফেটে যাছিল। মাথাটা ভিজে যাচ্ছে–চুল বেয়ে জল ভেজা ঘাড়ের কাছ দিয়ে অজস্র আঁকাবাঁকা কেঁচোর মতো পিঠ বেয়ে নামছিল। হাঁটার তালে কিংবা বাতাসে হঠাৎ জামাটা পিঠের চামড়ার ওপর থেকে সরে যাচ্ছিল বলে তার বোধ হচ্ছিল কেউ তার চামড়া ছাড়িয়ে নিচ্ছে।
রাস্তাটা ধু-ধু করা বাষ্পকার জলকণায় আদি অন্তহীন। একটা স্কুটার তীব্রভাবে জল কেটে লঞ্চের মতো চলে যায়। সামনে পা ফাঁক করে বলিষ্ঠ একটি ছেলে লোহার হাতে হ্যান্ডেল ধরে আছে। পিছনের সিট-এ জড়োসড়ো রুমালে ঢাকা মুখ মেয়েটি ছেলেটির পিঠে এলিয়ে আছে। সামনে পিছনে ছায়ার মতো কয়েকজন কোলকুঁজো হয়ে রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে। স্কুটারটা বৃষ্টির ভিতরে দূরে চলে যেতে-যেতে হঠাৎ বাঁক নিল, লাফিয়ে উঠে টাল খেয়ে তীরের মতন মিলিয়ে গেল। উলটে পড়ল না-আশ্চর্য! মাখনলাল দেখল।
চারিদিকে এখন এই বৃষ্টি ছাড়া কিছু নেই। রাস্তার দুধারে যে প্রকাণ্ড উঁচু বাড়িগুলোর তলায় দাঁড়ালে নিজেকে ভীষণ হীন বলে মনে হয়, সে বাড়িগুলো এখন ঝাঁপসা-পটে-আঁকা-নিসর্গের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়া ঝুপসি-ঝুপসি গাছের মতো দাঁড়িয়ে জড়সড়ো হয়ে ভিজছে। নিঃসঙ্গ একা মাখনলাল বৃষ্টির ভিতরে হেঁটে যেতে-যেতে টের পেল চারধারে এই বৃষ্টি এক প্রবল ঘেরাটোপের মতো ঘিরে আসছে– ঝাঁপসা ধোঁয়াটে পুরোনো ছবির মতো ঘরবাড়ি দোকান, দু-একটা মানুষ এরা সব অ-সত্য।
কোথায় যেন এই বৃষ্টির সঙ্গে সে একাকার হয়ে যাচ্ছিল চেনা রাস্তা, তবু তার মনে হল কোনওদিন কখনও সে এই রাস্তায় আসেনি। এই বৃষ্টি যেন তার চেনা পরিচয়কে ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। যেন সে এক অদ্ভুত পরদার আড়ালে আছে, পরদা সরালেই দেখতে পাবে–বিদেশ। স্রোতের মতো জল ফুটপাথ থেকে তার জুতোয় চলকে উঠে বয়ে যাচ্ছে। সে খেয়াল করল না।
এমন বৃষ্টির মতো স্বাস্থ্যকর আর কী আছে! মনে পড়ে কতদিন সে বৃষ্টিতে ভেজেনি, রোদে আপদমস্তক পোড়েনি। মনে হয় প্রেমহীন প্রকৃতিহীন কতগুলো দিন সে স্বপ্নের ভিতরে কাটিয়ে দিয়েছে। কখনও ফিরেও দেখেনি দিনগুলি। কোনও স্মৃতি থাক তাও চায়নি। মনে হয় বহু দৃশ্য, শব্দ, চলার ভঙ্গি, অনেক নিস্তব্ধতা, মৃত্যুশোক এইভাবে তাকেই উদ্দেশ্য করে ঝরে গেছে।
দূরের চিৎকার, অস্পষ্ট মন্থর ট্রামের শব্দ, পাখির ডানার শব্দ, পাতা ঝরে পড়বার শব্দ তার উদ্দেশ্যে কেউ নিক্ষেপ করছিল। এমন স্বজনহীন, বান্ধবহীন সন্ধেবেলা সে আর দেখেনি। কেন সে বৃষ্টিতে এল। কেন? মনে হয় এমনতরো সাধ তার কিছু-কিছু রয়ে গেছে। মনে পড়ে কোনও শীতের দুপুরে কার্জন পার্কে গাছের ছায়ায় সারাদিন শুয়ে থাকবার সাধ তার কখনও মেটেনি। মানুষের কাছে নয় কিন্তু অন্য কোথায় যেন সে ফিরে যেতে চেয়েছিল। পুব বাংলায়–তাদের পুরোনো বাড়ির জানলার ধারে এতদিনে শেফালি ফুলগুলি ম্লান হয়ে এল। পানা পুকুরের কালো পাড়ে শ্যাওলা–কচুপাতায় বাতাস লাগবার শব্দ–কামরাঙা গাছ থেকে একটি মাত্র ঘুঘুর ডাকে কত গভীর দুপুর হঠাৎ দেউলিয়া হয়ে গেল।
