তারপর রাস্তায় দোকানের উজ্জ্বল আলো, কাটা-কাটা নাক–মুখ-চোখ গলির মুখে চোরা অন্ধকার দেখতে-দেখতে খানিকক্ষণ বোধহীনের মতো হাঁটল মাখনলাল। সে এসপ্ল্যানেডের বড় রাস্তা, চেনা পথ ছেড়ে আধো অন্ধকার অচেনা রাস্তায় ধাঁধার ভিতরে উদ্দেশ্যহীনের মতো ঘুরছিল। কখনও মন খারাপ হয়ে যেতে থাকলে সে দেখেছে কিছুই করার থাকে না। সে নিজের ভীষণ অন্যমনস্কতা টের পেল। টের পেল তার ভয়ংকর খিদে পেয়েছে, তেষ্টায় বুক জ্বলছে। অচেনা গলির মুখে ছিমছাম একটা রেস্টুরেন্ট দেখতে পেয়ে তার দরজায় উঠে দাঁড়াল মাখনলাল। কাঁচের পাল্লা ঠেলে ভিতরে একটা পা বাড়াল।
ভিতরে কোথাও রেডিও বা গ্রামোফোন কোনও অদ্ভুত ড্রামের বাজনা দমকে–দমকে বাজছে। পলকের জন্য তার মনে হল শব্দটা নেড়ি কুকুরের মতো গায়ে গা ঘষটাতে–ঘষটাতে আর্ত চিৎকার করে তাকে এই ঘরে ঢুকতে বারণ করছে। ভিতরে ধু-ধু আলো জ্বলছে–সেই আলো কাঁচ বসানো টেবিল ছাইদানি, পিরিচ, চেয়ার টেবিলের চকচকে বার্নিশের ওপর থেকে বিচ্ছুরিত হয়ে আলপিনের মতো তার চোখে বেঁধে। মনে হয় এর লম্বাটে হলঘরের মতো ঘরটার সবকিছুই আলো বিকিরণ করছে। ভিতরে খুব বেশি ভিড় নেই। যারা আছে তাদের প্রায় সকলকেই বিদেশি কিংবা জাহাজের লোক বলে মনে হয়। বাঁ-দিকে দেওয়ালের কাছে কাউন্টারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে তার কালো মুখে বেশি পাউডার কিংবা রং মাখা বলে মুখটা ছাইরঙা–রক্তশূন্য। রুক্ষ চুল, উঁচু চোয়াল আর মভ রঙের শাড়িতে তাকে সাজানো ডামি বলে মনে হয়। শিবহুল কালো একটা হাত কাউন্টারের ওপর প্রাণহীন–কেউ এসে তুলে নেবে বলে অপেক্ষা করছে।
দু-একজন ফিরে তাকিয়ে মাখনলালকে দেখে। যারা বসে আছে তারা সবাই খুব লম্বা চওড়া আর জোয়ান বলে তার বোধ হল। সে টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কতগুলো মজবুত কবজি দেখছিল। দমকে–দমকে ছড়িয়ে যাওয়া গান, তালে–তালে মৃদু মাথা নাড়া–সবকিছুরই অতিরিক্ত এখানে। তাকে কেউ গ্রাহ্য করল না। যেন সে তার তুচ্ছ শরীর, রক্তশূন্য মেয়েলি মুখ, দুর্বল হৃৎপিণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে এখানকার ভীষণ পুরুষালি একটা আবহাওয়াকে নষ্ট করে দিচ্ছে। এইসব আলো গান, মেয়ে, তার জন্যে নয়। মনে হল–সে ভুল জায়গায় এসেছে, ভাবল–ফিরে যাই।
কাউন্টারে বসা প্রকাণ্ড একটা লোক হাতছানি দিয়ে সে মাখনলালকে একটা খালি টেবিল দেখিয়ে দেয়। অকারণে খুনখারাপি রঙের ঠোঁট ফাঁক করে মেয়েটা হাসে। চোখ সরিয়ে নিচ্ছিল মাখনলাল। বমি হওয়ার আগের মুহূর্তের দমকা ঘূর্ণি শরীরের ভিতর থেকে উঠে আসছে টের পেয়ে মাখনলাল হাত নেড়ে লোকটাকে জানাতে চাইলবসবে না। লোকটা একটা মোটা আঙুল মুখে পুরে মাড়ি পরিষ্কার করতে-করতে তার দিকে নিস্পৃহ তাকিয়ে দেখে।
মাখনলাল নিজে কী করছে বুঝতে পারছিল না। বেরিয়ে আসবার জন্য সে অন্ধের মতো কাঁচের পাল্লাটার দিকে হাত বাড়াল। সেই মুহূর্তেই সাদা দাড়িওয়ালা বুড়ো এক বেয়ারা দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। সে বোঝে–তার জন্যেই। ফিরে তাকাতেই হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠে তার মনে হল ভিতর থেকে কেউ আগুনের মতো একজোড়া চোখ তার দিকে ছুঁড়ে দিয়েই নামিয়ে দিল। পয়সার মতো কী একটা বস্তু তার শরীরের জটিল ফুসফুস মেরুদণ্ডের পথ বেয়ে ঠিঠিন করে হঠাৎ গড়িয়ে গেল। উন্মাদ ড্রামের শব্দ সেই মুহূর্তেই খুব উঁচু গ্রাম থেকে হঠাৎ চূর্ণীকৃত ভগ্নাংশে লয় পেয়ে যাচ্ছিল। পলকের জন্য মাখনলাল নিজের জেগে ওঠা টের পাচ্ছিল। কার চোখ কে দেখতে পেয়েছে বুঝল না।
বিনীতভাবে পাগড়ির ছায়ায় ঢেকে বুড়ো বেয়ারাটা মাখনলালকে কিছু বলছিল। মাখনলাল শুনল না কিংবা শুনেও কিছু বুঝল না। সে জানত না-যেন তার অজান্তেই কোনও ঘটনা এখানে ঘটে আছে। যেন এরা এতক্ষণ দোকান সাজিয়ে তার জন্যেই অপেক্ষা করছিল। সে দ্রুতচোখে শেষবারের মতো রেস্টুরেন্টের ভিতরটা দেখে নিচ্ছিল। মনে হল, এখানে কোথাও কোনও জরুরি জিনিস সে ফেলে যাচ্ছে। ভিতরের আলো, সহস্র তল থেকে প্রতিধ্বনিত বাজনার শব্দ, তালে তালে মৃদু মাথা নাড়ার ভিতরে কোথায় যেন যুদ্ধ যাত্রার প্রাক্কালে সৈনিকদের মতো বেপরোয়া ভাব ছিল। মেয়েটার স্থির অবয়ব কাউন্টারে হেলানো, প্রকাণ্ড লোকটা হঠাৎ ঘাড় হেলিয়ে সিলিং দেখছে, বুড়ো বেয়ারাটা দাদুর মতো স্নেহময় দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। কিন্তু এদের ভিতর তার চোখ সে দেখতে পেয়েছে বুঝল না। চোরা মারের মতো তাকে আঘাত করেই চোখটা বিবরে সরে গেছে। যেন কেউ আংটি পরা হাত আলোর সামনে এনেই সরিয়ে নিল বিচ্ছুরিত আলো। পলকের জন্য তার চোখে বিধেছিল।
কেন তার এমন মনে হল! কাঁচের পাল্লাটা ঠেলে, সিঁড়ি ভেঙে ফুটপাথে নেমে যেতে-যেতে সূক্ষ্ম একটা অস্বস্তিকে টের পায় মাখনলাল। যেন হঠাৎ জেগে উঠে সে ঠিক কোথায় এসেছে চারপাশে তাকিয়ে বুঝবার চেষ্টা করল। শ্বাস নিতে তার সামান্য কষ্ট হচ্ছিল–খুব উত্তেজনার পর যেমন হয়। সে স্থিরভাবে কোনও কিছুর দিকে তাকাতে পারছিল না, বুঝতে পারল না কোথায় এসেছে। যেন তার হাত পা কোনও কিছুই তার বশে নেই। কেন সে এখানে এসেছিল! চকিতে তার মনে পড়ে যায়, অন্যদিন এতক্ষণে সে তার শহরতলির ছোট্ট বাসায় ফিরে গেছে। তার দেরি দেখে নিশ্চিত ললিতা এখন ছয় বছরের বুকুকে পাশে নিয়ে মেঝের ওপর গড়াচ্ছে। সে ফিরলে উঠে দরজা খুলে দিতে ললিতার ঘুমন্ত মুখ বেয়ে পড়া চুল, লিত আঁচল দেখা যাবে।
