কার চোখ সে দেখেছিল! সে কি খুব অচেনা কেউ? নিজেকে এমনতরো উদ্বাস্তু তার আগে। কখনও মনে হয়নি। ছেলেবেলায় ঘরের দেওয়াল ঘড়িটার শব্দ সে যেমন সবসময়ে খেয়াল করে শুনত না কিন্তু ঘর নির্জন হয়ে এলে কিংবা মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে তার দম শেষ করে দেওয়ার অদ্ভুত একরোখা শব্দ শুনে চমকে উঠে ভেবেছে ‘আরে–ঘড়িটা! তাই না!’ তেমনি হঠাৎ নির্জন নিঃশব্দ হয়ে গিয়ে সে তার যন্ত্রণাকে টের পেল। বিষণ্ণতার ভিতর দিয়ে শিয়ালদা স্টেশনে এসে আটটা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন ধরল মাখনলাল।
বৃষ্টি পড়ছে না। বাইরে জুন মাসের আকাশ ঘোলা হয়ে আছে। মেঘ না, তারা না-কিছুই দেখা যায় না। ট্রেনের জানলার হাওয়ায় মাথা রেখে চোখ চেয়ে ছিল মাখনলাল। ভেজা মাথা বুক ঠান্ডা বাতাসে চিড় খেয়ে যাচ্ছে। ট্রেনের চাকা দ্রুত লাইন বদল করছিল। জং–ধরা লোহালক্কড়ের শব্দ, কাপলিং-এর শব্দ, স্প্রিং আর ঢিলেঢালা নাটবন্দুর শব্দ, অবিরাম তার শরীরের ভিতর থেকে উঠে আসতে থাকে। উলটো মুখো ট্রেনের ভৌতিক জানলায় কার হাত সাপের মতন নড়ে যায়। কার চশমার কাছে বাইরের অন্ধকার নিসর্গের বিকৃত দোমড়ানো প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল।
একটু রাতে তার শহরতলির ছোট্ট বাসায় ফিরল সে। দরজা খুলে দিতে-দিতে ললিতা অস্পষ্ট –যেন স্বপ্নের ভিতর থেকে কথা বলছিল। চকিতে মাখনলাল তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে ওপাশের দেওয়ালের ক্যালেন্ডারের দূর সূর্যাস্তের দিকে বহমান তিনটে নৌকোর ছবি দেখতে পায়। মেঝের ওপর বুকু ঘুমোচ্ছে। অচেনা মিশ্র এক জনতার ভিতর থেকে এসে ঘরের দরজায় পা দিয়ে সে নিজেকে আলাদা অনুভব করছিল।
হাতমুখ ধুয়ে ঢাকা ভাত খেয়ে নিতে–নিতে আস্তে-আস্তে সে স্বাভাবিক বোধ করছিল। ললিতা খেতে বসলে দু-একটা কথা বলছিল মাখনলাল। তারপর কী বলছিল–ভুলে গেল।
খাটের ওপর আলাদা বিছানায় শুয়ে মাখনলাল দেখছিল ছোট্ট বিছানায় বুকুর পাশে শুয়ে পড়বার আগে ললিতা টর্চ জ্বেলে মশারির ভিতরে মশা খুঁজছে। মনে পড়ে কবে কোন ভিড়ের ট্রামে কিংবা বাস–এ কার হাতের চামড়ায় সবুজ উল্কিতে আঁকা একটা ন্যাংটো পরির ছবি দেখেছিল। পিঠে কাকের পাখার মতো দুটো পাখা লাগানো। বয়সে হাতটার চামড়া কুঁচকে এসেছিল–পরিটার শরীর হয়েছিল বেঢপ–এবড়ো–খেবড়ো–নাক–মুখ-চোখ কিছুই বোঝা যায় না। মনে হয়েছিল–হাতের ওপর পরিটার বয়স অনেক হয়ে গেল–তবু হাত ছেড়ে উড়ে যাওয়ার সে কী প্রাণান্তকর চেষ্টা!
ঘর অন্ধকার হয়ে গেলে মাখনলাল চোখ বুঝবার আগে ললিতাকে উদ্দেশ্য করে বলল , ‘বুঝলে, ছুটি পেলে খুব দূরে কোথাও বেড়াতে যাব।’
অনেক রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙল মাখনলালের। কিছুক্ষণ সে কোথায় কীভাবে আছে না বুঝে চেয়ে রইল। মাথার ভিতরে একটা স্কুটারের শব্দ ঘুরে-ঘুরে যায়। সে টের পেল তার হাত পা, মাথা–সব অদ্ভুত ভঙ্গিতে ছড়ানো–চিৎ হয়ে শোয়া, দুটো হাত বুকের ওপর। কারা যেন। চোরাগলিতে পরিত্যক্ত নির্জনে একটা ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে রেখে তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে গলিজোড়া সেই হাঁ–করা ম্যানহোলের দিকে পা বাড়িয়ে হঠাৎ মাধ্যাকর্ষণের কোনও এক মুখ দিয়ে শূন্যতা এবং সময়হীনতার মধ্যে গড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু খুব বেঁচে গেছে মাখনলাল। ঠিক সময়ে ঘুম না ভাঙলে সেই গর্তে–অন্ধকারে–পূতিগন্ধে নগণ্য ইঁদুরের মতো মৃত্যু হত।
অস্থিরতা টের পেয়ে মাখনলাল উঠে বসল। লিত অচেনা গলায় ডাকল–’ললিতা!’ কেউ উত্তর দিল না। কারও জেগে থাকবার শব্দ তার শুনতে ইচ্ছে করছিল। বাইরে বৃষ্টিপাত থেমে গেছে। কিন্তু কোথায় যেন বৃষ্টির সঞ্চিত জল চুঁইয়ে কোনও শূন্য টিনের কৌটোর ওপর পড়ছিল। প্রতিটি ফোঁটার সেই ভারযুক্ত শব্দকে কে যেন তার উদ্দেশ্যে শব্দভেদী বাণের মতো নিক্ষেপ। করছিল।
অনেকক্ষণ ঘুম এবং জাগরণের মাঝখানে এক অদ্ভুত নিশ্চেষ্টতার ভিতরে সে বসে রইল। বুকের বাঁ-পাশে একটা অস্পষ্ট ব্যথা ডাকটিকিটের মতো লেগে আছে। মনে হল স্বপ্নগুলো এখনও তার মাথা থেকে সম্পূর্ণ ভিতরে–ঢাকনা খুলে রাখা ম্যানহোলে টেনে নিয়ে যাবে। এক ঝলক নীল বিদ্যুতের আলোয় ঘরটা অস্পষ্টভাবে তার চোখের সামনে লাফিয়ে উঠেই মিলিয়ে গেল। যদি আবার ঘুমিয়ে পড়ে সে? সঞ্চিত জলের সেই প্রতিটি ফোঁটার জ্যা–মুক্ত শব্দশূন্য টিনের ক্যান নির্জনতা তাকে অন্ধকারে স্বপ্নের ভিতরে ঠেলে দিচ্ছিল। সে টের পেল তার সারা শরীরের শাঁসওয়ালা ব্রণের মতো শিউরানো রোমকূপ খাড়া হয়ে আছে।
চৌকির পাশেই রাখা টুলের ওপর থেকে গ্লাস তুলে নিয়ে অনেকটা জল খেল মাখনলাল। তারপর সিগারেট ধরাল। বৃষ্টির পর গুমোট গরমে ঘরটা কেঁপে আছে। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। বুক এখনও ভার। অস্পষ্টভাবে তার মনে হচ্ছিল, কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগেই ললিতাকে ডাকা উচিত। কিন্তু অতটা সময় পেল না মাখনলাল। ঘুম তটভুমি অতিক্রম করে তার জাগরণের ভিতরে আছড়ে পড়েছিল। কে যেন তাকে ধীরে টেনে নিচ্ছিল ঘুমে স্বপ্নের ভিতরে! স্কুটারের শব্দটা প্রচণ্ড বেগে তার মাথার ভিতর ঘুরতে থাকে। চকিতে মাখনলালের মনে হয় কে যেন বরাবর তার আগে আগে হেঁটে এসেছে। ওজন যন্ত্রের ভিতর ঠিক টিকিটটা তার জন্যে সাজিয়ে রেখেছিল কে? অচেনা রেস্টুরেন্টে এক মুহূর্তের জন্য মুখোশ খুলে তার ভিতরের আগুন মাখনলালকে দেখতে দিয়েছিল কে? উত্তল কচের তির্যক বিম্বের মতো চকিতে বিদ্যুতের আলোয় ঘরটা আবার লাফিয়ে উঠলে মাখনলাল দেখতে পায়–সে। সাদা দেওয়ালের মতো বুক–সাদা দেওয়ালটাই। ঈশ্বরের বুকের মতো সাদা দেওয়ালটায় চকিতে আবার বিদ্যুৎ বিস্ফোরিত হলে সে-মাখনলাল–সেখানে নিখুঁত সুন্দর একটা বুলেটের ছ্যাঁদা দেখতে পায়। মুহূর্তেই যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে সাদা দেওয়াল অন্ধকার দিয়ে ক্ষতস্থান কামড়ে ধরল।
