করিডোরে বেরিয়ে এসে সে দারোয়ান রামজীবনের পায়ের শব্দ পায়। নাগরা জুতো অন্ধকারে হাতুড়ির মতো ঠুকতে–ঠুকতে সে অনেকক্ষণ ধরে দোতলার সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসছিল। চাবির গোছার শব্দ, কাশির শব্দ, দেহাতি গানের কলি পরস্পর মিশে যায়। সে এই বুড়ো অফিস বাড়িটার সিল করবার গালার অদ্ভুত গন্ধ, পুরোনো গঁদ, কাঠ আর বার্নিশের গন্ধ পায়। অল্প অন্ধকার, দীর্ঘ করিডোরটা পায়ে-পায়ে পেরিয়ে যেতে-যেতে হঠাৎ মনে হয় বয়স ঢের বেড়ে গেছে। আর মনে হয় বাইরে কোথায় তাকে বাদ দিয়ে একটা উৎসব চলতে-চলতে শেষ হয়ে এল। সিঁড়ি ভেঙে সে বাইরের আলো আর শব্দের মাঝখানে নেমে আসতে-আসতে স্পষ্ট টের পেল রামজীবনের গানের কলি হঠাৎ লক্ষ্যহীন অন্ধের মতো টাল খেতে-খেতে পুরোনো অফিস বাড়িটার কড়ি বরগা আর দেওয়ালের পলেস্তারার ভিতরে ঢুকে স্তব্ধ হয়ে গেল।
বাইরে হাওয়ায় দোকানের উজ্জ্বল আলো আর লোকজনের ভিড়ের ভিতরে নেমে এসে হঠাৎ ঘুম এবং স্বপ্ন ভেঙে গেলে যেমন হয়, তার তেমনি সবকিছু খুব অচেনা লাগছিল। মনে পড়ল সে অনেকক্ষণ সিগারেট খায়নি, জল খায়নি, কোনও খাবার খায়নি। অন্যদিন এই সময়ে তার বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা। মনে হয় ললিতা তার অপেক্ষায় আছে কিন্তু আজ এক্ষুনি তার বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছে করল না। মনে পড়ে কতকাল সে কলকাতার রাস্তায়, ময়দানে, এসপ্ল্যানডে ঘুরে বেড়ায়নি, দোকানের শো-কেসে সাজানো জিনিস, আলো, লোকজন দেখতে-দেখতে দু-পয়সার বাদাম শেষ করে খামোকা কোনও রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়েনি। এইসব–খানিকক্ষণ ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ভেবে নিল সে। তারপর আস্তে-আস্তে ট্রাম রাস্তা পেরোল মাখনলাল।
জুন মাসে পরপর কয়েকদিন অনাবৃষ্টি গেছে। জ্বরগ্রস্ত ফুটপাথ থেকে, দেওয়ালের গা থেকে ভাপ উঠে আসছে। ধুলোয় ঘুলিয়ে উঠছে এসপ্ল্যানেডের আলো, গা ঘেঁষে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের মন্থর ট্রাম চলে যায়। নীচু বুকচাপা দোকানঘর থেকে চামড়ার কটুগন্ধ। বুক গুলিয়ে ওঠে। বৃষ্টি হবে কি? মাখনলাল চোখ তুলে আকাশ দেখল। মেঘ না তারা না,–কিছুই দেখা যায় না।
আলো অন্ধকার, অবয়ব চোরাগুলি, মুণ্ডের সারি চোখের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। শো-কেসে সাজানো রেডিও, গলফ স্টিক, হাওয়াই শার্ট। স্যুটপরা ‘ডামি’ আলোর নীচে চকিতে হেসে উঠল। একটা সিনেমা হল। লবিতে নিঃসঙ্গ সাদা একটা ওজন নেওয়ার যন্ত্র। মাখনলাল পেরিয়ে যাচ্ছিল। যেতে-যেতে কী ভেবে দাঁড়িয়ে ফিরে এল। এখন বিকেলের শো চলছে। লবিটা নির্জন। মাখনলাল ওজন নেওয়ার যন্ত্রটার দিকে এগিয়ে গেল।
ওজন নেওয়ার যন্ত্রের ভিতর পয়সাটা ফেলে দেওয়ার পর..যখন ঠিঠিন করে একটা জটিল গলিঘুজির পথ দিয়ে সেটা নেমে যাচ্ছিল তখন মাখনলাল যন্ত্রটাকে লক্ষ করল। পয়সাটা কোথায় ধাক্কা মারল কে জানে–হঠাৎ ভিতরে কোথায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো শিউরে লাফিয়ে উঠল যন্ত্রটার হৃৎপিণ্ড। কোথায় একটা স্প্রিং শিরার মতো টিকটিক করে কাঁপতে থাকে। লিভারের ওঠানামার সঙ্গে-সঙ্গে সে যন্ত্রটার জেগে ওঠা টের পেল। মনে হয় এতক্ষণ স্তব্ধ থাকবার পর যন্ত্রটার শিরা ধমনীর ভিতর দিয়ে রক্তস্রোত প্রবলভাবে বয়ে যাচ্ছে।
টিক করে টিকিট পড়ল ছোট্ট খোপের মধ্যে।
কয়েক পলক মাখনলাল সাদা মসৃণ সুন্দর যন্ত্রটার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠান্ডা ঘুমন্তের মতো। মনে হয়, একটুক্ষণের জন্য জেগে ওঠে, তারপর জাগরণ ক্লান্তিকর দেখে যন্ত্রটা আস্তে আস্তে আবার তার শীতল চিন্তাহীন ঘুম এবং স্বপ্নের ভিতরে চলে গেছে।
মাখনলাল ওজনের টিকিট তুলে একটা মেয়ের ছবি দেখতে পেল। ছবির নীচে তার ভাগ্য দেওয়া আছে। ওজন ছাপানো টিকিট হাতে মাখনলাল সিনেমা হলের লবি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে লাগল।
টিকিটের ওজন ছাপানো দিকটায় ভালো খবর প্রায়ই থাকে। সে দেখল, এবার পাঁচ পাউন্ড কম! লম্বার অনুপাতে তার ওজন বরাবরই চার-পাঁচ পাউন্ড কম ছিল। তাহলে সবসুদ্ধ মাখনলাল হিসেব করে দেখল, তার যতটা ওজন হওয়া উচিত–তার চেয়ে এখন তার ওজন আট-নয় পাউন্ড কম!
তার মন আস্তে-আস্তে বিষণ্ণ হয়ে যাচ্ছিল। ওজন নিয়ে সে কখনও বড় একটা ভাবেনি। কিন্তু হাঁটতে-হাঁটতে একসময়ে টের পেল চারদিকে ভ্রাম্যমাণ লোকজনদের যাতায়াত, স্টেট বাসের শব্দ–এইসব আলোকিত দৃশ্যের ভিতরে থেকেও সে আজ কেবলই নিজের ওজনের কথা ভাবছে!
এইভাবে কিছুক্ষণ হাঁটল মাখনলাল। তারপর রাস্তার ওপাশে একটা খুব ঝলমলে সিগারেটের দোকান দেখতে পেয়ে ট্রামরাস্তা পেরোল।
ব্যস্ত দোকানির দিকে পয়সা বাড়িয়ে ‘এক প্যাকেট চারমিনার’ বলে সে দোকানের অসম্ভব সরু লম্বা আয়নায় হঠাৎ নিজের মুখ এবং কোমর পর্যন্ত দেখতে পেয়ে চমকে উঠল। নিজের লাবণ্যহীন দুর্বল মুখের দৈনন্দিন বিষণ্ণতা আর অবসাদ সে দেখে নিল। সে জানে তার শরীরও ছোটখাটো–কোনওখানেই তা শক্ত কিংবা পুরুষালি নয়। অনেকদিন ধরে সে রক্তহীনতা রোগে ভুগছে কি? কিংবা বহুদিন ধরে অন্যমনস্কতার সুযোগে তার কোনও গোপন অসুখ তৈরি হয়ে গেছে! সে বুঝল না।
সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে দোকানি তাকে লক্ষ করছে টের পেয়ে মাখনলাল চোখ সরিয়ে নিল। একটা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে সে ভাবছিল কোথায় যাওয়া যায়। ওজন নেওয়ার টিকিটটা তখনও হাতে ধরা ছিল। সেটা ছুঁড়ে দেওয়ার আগে মাখনলাল তার ভাগ্যটা পড়ল, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘শিগগিরই আপনি খুব বিপদে পড়বেন, তবে সেটা বেশিদিন স্থায়ী হবে না।’ বিপদ! মাখনলাল ভ্রূ কোঁচকাল। আবছা রহস্যময় একটা কার্যকারণসূত্রকে সে টের পাচ্ছিল। সে জানে কোনও যুক্তির সূত্রে লেখাটা তার হাতে আসেনি-এর কোনও মানে নেই। তবু কোথায় সূক্ষ্মভাবে সে সচেতন হয়ে উঠেছিল। সিগারেটের তীব্র ধোঁয়া তার স্নায়ুপুঞ্জে, গলার স্বরনালীতে, বুকে দয়াহীন ছড়িয়ে পড়ছিল। সে টিকিটটা দুমড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
