–রেন্ডি! চাপা গলায় গাল দেয় গেনিয়া। তারপর প্রবল লাথি কষায় একটা। কেঁউ করে ছিটকে পড়ে চমেলি। পরমুহূর্তেই অপমান ভুলে আবার কুঁইকুঁই করে এগিয়ে আসে, ল্যাজের ঝাঁপটা মারে, নানারকম আদরের শব্দ করতে থাকে। ওদিকে গেনিয়ার আঙুলের ডগায় ছিটকিনিটা ঘুরে যাচ্ছে। বিনবিন করে ঘাম ফুটে উঠছে তার মুখে।
একটা টেমি উঁচু করে ধরে ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসছে কমলি, ডাকছে–চমেলি–এ চমেলি –ই–ই–
ছিটকিনিটা ঘুরছে। ঘুরে যাচ্ছে। ঘরের ভিতরে অন্ধকারে লাফ দিচ্ছে সোনার ঘোড়াটা। ঘুরছে ঘরময়। বেরোবার পথ খুঁজছে। কিন্তু হাতটা জ্বলে যাচ্ছে গেনিয়ার, মটমট করছে হাতের হাড়, ব্যথায় নীল হয়ে যাচ্ছে সে। কামড়ে ধরছে জানালার পাল্লা, দাঁতে–দাঁত ঘষছে।
ধোঁয়াটে টেমি হাতে এগিয়ে আসছে কমলি ডাকছে চমেলি–ই—
গেনিয়ার দুপায়ের ভিতর থেকে আনন্দে সাড়া দিচ্ছে চমেলি।–ঘে-উ-উ ঘেউ–
ঠক করে ছিটকিনিটা উঠে পাল্লাটা হাঁ হয়ে যায়। অবশ হাতটা পড়ে যায় গেনিয়াব। আর এক হাতে কবজিটা চেপে ধরে গেনিয়া। আর-একটা লাথি কষায় চমেলির পেটে।
চোখের পলকে গেনিয়া জানালায় উঠে পাল্লাটা টেনে দেয়। বাইরে জানলার দিকে মুখ করে প্রবল চিৎকার করতে তাকে চমেলি। টেমির আলোটা উঁচু করে ধরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে কমলি দৃশ্যটা দেখে। তার ভয় করতে থাকে।
সে হঠাৎ পিছন ফিরে বাবা আর মাকে ডাকতে–ডাকতে দৌড়োত থাকে।
অন্ধকারে এক ঘর থেকে আর-এক ঘরে চলে যায় গেনিয়া। দরজার গায়ে হাতড়ে ছিটকিনি খোলে, আর এক ঘরে যায়। ধাক্কা খায় আসবাবপত্রের সঙ্গে। হোঁচট খায় কার্পেটে, পাপোশে। অন্ধকারে ঠাহর পায় না, তবু প্রাণপণে সেই ঘরটা খুঁজতে থাকে যে ঘরে আলমারি, আলমারিতে সোনার ঘোড়া। খুঁজতে-খুঁজতে ঘুরে মরে। দুটো ঘর খুলে তৃতীয় ঘর খুলতে গিয়ে সে ভারী বেকুব বনে যায়। এ ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। দরজা হাতড়ে সে এই তত্ব বুঝে যায়। এইটাই মাঝখানের ঘর বলে তার বোধহয়। এই ঘরেই সেই আলমারিটা রয়েছে। দরজাটা আক্রোশে প্রাণপণে টানে সে। পাথরের মতো অনড় থাকে ভারী পাল্লা। অনেকক্ষণ চেষ্টা করে সে! বৃথা তারপর হাঁফিয়ে যায়। ক্লান্ত লাগে।
অন্ধকারে সে তখন বেভুল ঘোরে। ধাক্কা খায়। আবার ঘোরে। রাস্তা ঠিক করতে পারে না। ইঁদুর দৌড়োয় মেঝের ওপর দিয়ে। আরশোলা পিড়পিড় করে। বাইরে থেকে চেনা বাড়িটা ভিতর থেকে অন্ধকারে কেমন ভীষণ অচেনা লাগে। সে প্রতিটি জানলা হাতড়ায়। শিকভাঙা জানালাটা খুঁজে পায় না কিছুতেই। বাইরে চমেলি আর ডাকছে না। নিঃঝুম হয়ে গেছে চারধার। এখন গেনিয়া করে কী? যদিও সে চোর, রেন্ডির ব্যাটা, ভিখমাঙ্গা, তবু তারও আছে ভয়ডর। কমলি গেছে লোকজন ডেকে আনতে। এদিকে অন্ধকারে ভুল রাস্তায় টক্কর খেয়ে মরছে সে। বন্ধ দরজার ওপাশে–সে স্পষ্টই টের পায়–সোনার ঘোড়াটা চক্কর দিয়ে ফিরছে। বেরোবার রাস্তা পাচ্ছে না।
.
ভূতনাথের হাতে মশাল, কমলির হাতে টেমি। তারা দুজন বাড়িটা ঘুরে-ঘুরে দেখে। জানলাগুলি টেনে দেখে ভালো করে। সবই ঠিক আছে। উদাস গলায় ভূতনাথ বলে–কোথায় কী! তুই ভুল দেখেছিস।
তারপর নিশ্চিন্ত মনে তারা শুতে যায়।
.
গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে শীতবোধ করে সুরদাস রামজি। আজ বিছানায় তেমন ওম নেই। ওম-এর জন্য খুঁতখুঁত করে সে কোঁকায়। ঘুমের ঘোরেই বিছানা হাতড়ে গেনিয়াকে খোঁজে। অন্ধের নড়ি। ওর শিশু শরীর বুকের মধ্যে নিলে তাপ আসে। কিন্তু বিছানাটা শূন্য। কোনও চোরচোট্টার শাগরেদি করতে গেছে গেনিয়া কে জানে? নাকি ওই রেন্ডিটা ফুসলে রেখে দিল! হা। ভগবান, জীবনভর তবে দুনিয়া হাতড়ে প্রাণটা যাবে তার। আধোঘুমেই সে গাল পাড়ে, বিলাপ করে। আবার ধীরে-ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে।
বাইরের উঠোনে জ্যোৎস্নার নদী বয়ে যাচ্ছে। চমেলি সেই দৃশ্য দেখে মাঝে-মাঝে ঘুমচোখে খায়। একটা দুটো ডাক ছাড়ে। আবার কুণ্ডলী পাকিয়ে চোখ বোজে।
রাত বাড়ে।
.
নরম গদির ইংলিশ বেড-এর ওপর উদোম গায়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে গেনিয়া! ভারী ক্লান্ত সে। কেঁদেছিল, চোখের জল শুকিয়ে আছে গালে। দু-এক ফোঁটা জমে আছে চোখের কোলে।
মাঝরাতে বাগানের ছায়াগুলো বেঁকে ভেঙে যাচ্ছিল। জ্যোৎস্না তীব্র হয়েছে, ফুলের গন্ধে গাঢ়, মন্থর হয়েছে বাতাস।
দুঃখীদের জন্য স্বপ্নের সন্ধানে বেরিয়েছেন ঈশ্বর। আনাচে-কানাচে ঘুরে তিনি চরাচর থেকে স্বপ্নদের ধরেন নিপুণ জেলের মতো। আঁজলা ভরা সেই স্বপ্ন তিনি আবার ছড়িয়ে দেন। মাঝরাতে তারার গুঁড়োর মতো সেই স্বপ্নেরা ঝরে পড়ে পৃথিবীতে।
গেনিয়া দেখে সোনার ঘোড়ার পিঠে চেপে তারা চলেছে। পিঠের কাছে অন্ধ বাপ, তার কোমর জড়িয়ে মা। গেনিয়ার দুই হাতে খঞ্জনির মতো দুটো পাথর। সে পাথর বাজিয়ে ভারী সুন্দর গান। গাইছে। সামনেই সোনালি নদী, নদী পেরোলেই আকালের দেশ শেষ হয়ে যাবে। ওই পাড়ে ভিক্ষে পাওয়া যাবে খুব।
চোখে জল নিয়েই ঘুমের মধ্যে একটু হাসে গেনিয়া।
স্বপ্নের ভিতরে মৃত্যু
“This is the way the world ends
Not with a bang, but a whimper.”
একদিন, জুন মাসের এক বিকেলে মাখনলালের মন ভালো ছিল না।
সেদিন অফিসে অনেকক্ষণ ধরে একটানা একটা জরুরি কাজ করতে হয়েছে। যখন অবশেষে হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে সে ঘড়ি দেখল তখন ছ’টা বেজে সতেরো মিনিট। তার মেরুদণ্ড ব্যথা করছিল, মাথার ভিতরে কোথায় একটা রগ বিদ্যুতের মতো চমকে–চমকে উঠছে। পাখার হাওয়ায় কোথায় একটা কাগজ উড়ছে–মাখনলাল দেখতে পেল না-কিন্তু সেই শব্দে তার শিরা-উপশিরা শিউরে উঠেছিল। তার চারদিকে জনশূন্য নিঃশব্দ ঘরটা প্রকাণ্ড হয়ে আছে। মনে হল তাকে অন্যমনস্ক রেখে সারা বিকেল ধরে তার জ্বর এসেছে।
