তার মায়ের দুটো বাচ্চা হয়েছে, তারা কিলকিল করে ঘরে। চেঁচায়। আস্তে-আস্তে রাত বেড়ে যায়। প্রায় দিনই পেঁয়াজ রসুন আলুর চচ্চড়ি দিয়ে মা তাকে বাচ্চা দুটোর সঙ্গে ভাত খাইয়ে দেয়। ভাত দিতে-দিতে বলে–খবরদার, ওই বুড়োটার মতো ভিখিরি হবি না।
গেনিয়া হাসে-কিন্তু গান জানলে মাঙ্গা ভালো বিজনেস।
–হোক গে, তোর তাতে দরকার নেই। বুড়ো মরলে আমি তোকে নিয়ে আসব।
কথাটা কাজের নয়। গেনিয়া জানে, শত হলেও মা তার পরের ঘর করে। মহিন্দরের দুটো ভৈষ আছে, একটা চায়ের দোকান আছে বটতলায়, সেই দোকানে চোর ছ্যাঁচোড়দের আড্ডা। বড় রাগি মহিন্দর। মাকে মাঝে-মাঝে বাশডলা মার দেয়। নিজের পায়ের বুড়ো আঙুলে থুথু ফেলে। মাকে দিয়ে চাটায়। এক-এক বেলা বেঁধে রেখে চলে যায়, কতদিন গিয়ে সেই দৃশ্য দেখে ভয়ে পালিয়ে এসেছে গেনিয়া, মার মুখ দিয়ে টসটসে রক্ত পড়ে শুকিয়ে আছে, চোখ ফোলা, পিছমোড়া করে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অসহায় বসে আছে, দুটো বাচ্চা সেই অবস্থাতেই বুক খুলে চুষছে। এ সবের চেয়ে তার সুরদাস অন্ধ ভিখমাঙ্গা বাপের কাছেই সে সুখে আছে। যদিও বুড়োটা খচাই, পয়সাকড়ি কোথায় যে লুকোয় কে জানে, তবু গেনিয়ার বিশ্বাস, বুড়োর বিল একদিন সে-ই পাবে। বুড়ো মরলে সে একদিন ঝোঁপড়াটা তোলপাড় করে দেখবে, মাটি খুঁড়বে, ঝোঁপড়া ভেঙে বাঁশের গর্তে খুঁজবে। থাকবেই কোথাও না কোথাও। সেই পয়সায় ঘর ভাড়া নেবে সে, কিনবে হারমোনিয়ম, গলায় বেঁধে চলে যাবে ট্রেনে–ট্রেনে, বিজনেস করে এত পয়সা নিয়ে আসবে।
গেনিয়া রাত করে ফেরে। হঠাৎ পৃথিবীর সব দারিদ্র্য মোচন করে শাঁকালুর মতো সাদা একটা ক্ষয়া চাঁদ তার দুধ ঝরিয়ে দেয় চারদিকে। সাদা ফটফটে ইউক্যালিপটাস গাছ বেয়ে দুধ ঝরে পড়তে থাকে। ফুলের গন্ধে ম–ম করে বাতাস। নির্জন রাস্তায় বেভুল দাঁড়িয়ে পড়ে গেনিয়া। তারপর আনন্দে উদ্ভাসিত গলায় গান ধরে সে, দু-চক্র নাচ নেচে নেয়, পাথর তুলে দু-হাতে খঞ্জনির মতো বাজায়।
গেনিয়া এগোতে থাকে। সামনেই কমলিদের বাড়ি। বাগানের গাছপালার ভিতর দিয়ে দেখা যায়। ওদের ঘরে বিজলির আলো জ্বলছে। বড় বাড়িটা অন্ধকার, বাইরের ফটক বন্ধ। চারদিক। নিঃঝুম। সেই নিঃঝুমতার মধ্যে একটা সোনার ঘোড়া আকাশ থেকে লাফ দিয়ে নামে। দুধের মতো স্বাদু জ্যোৎস্নায় সেই ঘোড়াটাকে গেনিয়া মনশ্চক্ষে দেখে আর দেখে। সোনার দাম অনেক। গেনিয়া জানে।
অভাবের সংসার বলেই তার মা অভাবী অন্ধ বাপকে ছেড়ে গেছে। খুব বেশিদূর যেতে পারেনি অবশ্য। লাইনের ওপারে রাগি মহিন্দরের লাথিঝাঁটা খেয়ে আছে। সোনার ঘোড়াটা পেলে সে ঝোঁপড়া ভেঙে পাকা ঘর তুলবে একটা। রাগি মহিন্দরের কাছ থেকে নিয়ে আসবে মাকে। সুরদাস ভিখমাঙ্গা রামজি শীতের রোদে একখানা ভাগলপুরি চাদর গায়ে দিয়ে রোদ পোয়াবে। আর গেনিয়া গলায় হারমোনিয়ম বেঁধে চলে যাবে যশিডির মেল ট্রেন ধরে ঝাঁঝা কিংবা মধুপুর হয়ে গিরিডি অবধি।
নিঃসাড়ে গেটটা ডিঙোলো গেনিয়া। গাছগাছালির ভিতরে ভিতরে দুধ টলটল করছে। ছায়া পড়ছে বিচিত্র। তার ছায়াটা ঠিক যেন ন্যাংটো মানুষের ছায়া। গাছপালা ভেদ করে সে ধীরে-ধীরে অন্ধকার বাড়িটার ছায়ায় এসে দাঁড়ায়। চারদিকে চেয়ে দেখে। কোনওখানে কোনও নড়াচড়া নেই।
উত্তরের জানলাটার সামনে এসে দাঁড়ায়, জানলাটার একটা শিক ভাঙা। সন্তর্পণে জানলার পাল্লাটা টেনে দেখে সে। বন্ধ হলেও খুব আঁট নয় পাল্লাটা। ঢকঢক করে একটু নড়ে। গেনিয়া একটা পাল্লা চেপে ধরে আর-একটা টানে, মাঝখানে এক আঙুল পরিমাণ একটা ফাঁক দেখা যায়। ডান হাতের কচি আঙুলগুলো ঢোকে, আটকায় হাতের তেলোটা। প্রাণপণে পাল্লাটা টেনে ধরে গেনিয়া। আপ্রাণ চেষ্টা করে হাত ঢোকাতে। ভারী পাল্লাদুটো কামড়ে ধরে তার কচি হাত, চিবিয়ে খেতে থাকে। তবু ছিটকিনির গোল মুখটা তার আঙুলে লাগে। কিন্তু সেটাকে ধরার মতো অবস্থা তার হাতের নয়। তার ওপর পাল্লা টান থাকায় ছিটকিনিটা শক্ত হয়ে জমে আছে। তবু সে চেষ্টা করতে থাকে। জানলার দুই ভারী পাল্লা রাক্ষসের মুখের মতো নিবিড় আনন্দে তার হাতখানা চিবোতে থাকে। যন্ত্রণায় সে গোঙানির শব্দ করে।
কাছেপিঠে একটা কুকুর ডাকছে। হারামিরা হরবখত কেন যে ডাকে গেনিয়া ভেবে পায় না। হাতটা টেনে বের করার সময়ে ছাল ছড়ে যায়, হাতটা জ্বালা করতে থাকে খুব। জ্যোৎস্নায় বাগানের মধ্যে সে একটুকরো কাঠ কি কাঠি খুঁজে দেখে। পেয়েও যায়। ছোট একটুকরো পাতলা কাঠ। আবার জানলা ফাঁক করে সে কাঠের গোঁজা ঢোকায়। তারপর আবার হাত ভরে। ক্রমে ক্রমে প্রচন্ড চেষ্টায় সে কবজি পর্যন্ত ঢুকিয়ে দিতে পারে।
কুকুরের ডাকটা এগিয়ে আসছে। দূরে কমলির গলা শোনা যাচ্ছে। সে ডাকছে–চমেলি–এ চমেলি–ই-ই—ই–
কুকুরটা চমেলিই। রেন্ডি কোথাকার। ভাতের লোভে দু-বেলা এইখানে এসে বসে থাকে।
নিবিষ্ট মনে ছিটকিনির মাথাটা ধরার চেষ্টা করতে থাকে গেনিয়া। ধরেও। সেই সময়ে ঝোঁপঝাড় ভেঙে ছুটে আসে চমেলি। দুটো বুকফাটা আনন্দের ডাক দিয়ে সে কুঁইকুই করতে করতে প্রবল ল্যাজের তাড়নায় গেনিয়ার দুই পায়ের ফাঁকে মাথা গুঁজে দেয়। লাফিয়ে ওঠে গায়ে, পা চেটে দেয়।
