–কোথায় পেলি? ভুতুয়ার বাগানে বুঝি! একটু সেঁকে দিবি গেনি? একটু আগুন কর না ব্যাটা।
গেনিয়া উত্তর দেয় না। চুপচাপ ঝোঁপড়ায় ঢোকে আর ক্যাম্বিসের ময়লা ছেঁড়া টুপিটা পরে বেরিয়ে আসে!
তার বাবা ভিখমাঙ্গা সুরদাস রামজি রোদে বসে ভুট্টার দানা ভাঙে দাঁতে। মুখে, শরীরে খড়ি উঠছে, চোখের কোল ফোলা–ফোলা, উড়ো চুল, ভাঙা গালে দাড়ি আর ন্যাকড়া পরা লোকটাকে অমানুষের মতো দেখায়। গেনিয়ার চোখে অবশ্য বাপের কোনওটাই অস্বাভাবিক ঠেকে না।
সে লাঠিটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে–চলি চল।
সুরদাস রামজি বাতাস হাতড়ে লাঠিটা ধরে উঠে দাঁড়ায়।
ভিক্ষের বাজারে এখন আকাল। বাড়িগুলো খালি পড়ে আছে। বৈদ্যনাথধামে কোনও তীর্থযাত্রার সময়ও এটা নয়। শহর তাই ফাঁকা। নিরিবিলি রাস্তায় দুজন হাঁটে লাঠির দুই প্রান্তে দুজন। সঙ্গে গা–ঘেঁষে হাঁটে চমেলি কুকুর।
–সেই রেন্ডিটার কাছে তুই যাস নাকি?
–না তো?
–না তো! অ্যাঁ? আমি টের পাই না ভেবেছিস? আন্ধা বলে টের পাই না? তুই যাস?
–কখন গেছি?
–রোজ যাস। মাঝে-মাঝে আমি তোকে ডেকে পাই না কেন? তুই গিয়ে ওইখানে ভালোমন্দ গিলে আসিস। ঘুমোলে আমি তোর পেট হাতিয়ে টের পাই তোর পেট ঢাক হয়ে আছে। কোথায় খেতে পাস তুই?
–না। কির–
–কীসের কির?
–বৈদ্যনাথজির।
সুরদাস চুপ করে থাকে। রেন্ডিটা চার বছর তাকে ছেড়ে গিয়ে মহিন্দরের ঘর করছে লাইনের পারে। ছেলেটাকে ফেলে গেছে কিন্তু ছেলেটা মাঝে-মাঝে মা পানে ছুটতে চায়। অন্ধের নড়ি, এটা ছুটে গেলে সুরদাস রামজির নৌকো হাল ছাড়বে। তাই সে সাবধান করে দেয়।
–যাবি না কখনও। আমি তোকে খাওয়াব, দেখিস। আমার পয়সা আছে।
–জানি।
শুনে অমনি খরগোসের মতো তার কান খাড়া হয়ে ওঠে। মিহিন সতর্ক গলায় বলে কী জানিস?
–পয়সার কথা।
রামজি ভারী বিপদে পড়ে যায়। জানে নাকি! সত্যিই জানে! আনমনে হাঁটে। হঠাৎ বলে তাড়াতাড়ি চল। গাড়ি আসছে।
–কোথায়?
–এই যে মাটি কাঁপছে! টের পাচ্ছিস না?
গেনিয়া টের পায় না। তার বাপ এইসব টের পায়।
.
উদাসী স্বামীর চেয়ে ঝগড়াটে মারকুটে স্বামী ভালো। তার স্বামী ভূতনাথ যে উদাসী তা বুঝতে একটু সময় লেগেছে এতোয়ারির। সে যখন মেহদিতে হাত পায়ের নকশা করত, কপালে পরত টিকলি, চোখে সুর্মা, তখন কদাচিৎ ভূতনাথ তার সে সাজগোজ লক্ষ করত। বোধহয় পশ্চিমা সাজ ওর পছন্দ নয়–এই মনে করে এতোয়ারি তারপর পায়ে পরত আলতা, সিঁথিতে ভুরভুরে লাল সিঁদুর দিত, ডানদিকের বদলে বাঁ-দিকে আঁচল নিত। তারপর বুঝল, লোকটা এ সব দেখে না। বাগানের মাটি ঘেঁটে–ঘেঁটে মাঝে-মাঝে চুপ করে ঝিম মেরে থাকা–ওই হচ্ছে ওর স্বভাব। এই ভেবে এতোয়ারির বুক ভারী হয়েছে কতবার। এখন সয়ে গেছে। এতোয়ারি ঝগড়াটে কম নয়। কিন্তু এ লোকটার সঙ্গে সে ঝগড়া করে না। বয়সে ভূতনাথ তার চেয়ে অনেক বড়। এখনই মানুষটার চুলে পাক ধরে গেছে। সবসময়ে চিন্তা নিয়ে থাকে বলে মুখে গম্ভীর বুড়োটে ভাব। এইসব মিলে একটা সমীহের ভাব আসে এতোয়ারির মনে। তার ওপর মানুষটা ভিনদেশি।
দুপুরে খেয়ে মানুষটা বাইরের খাঁটিয়ায় বসে বিড়ি ধরিয়েছে। তেমনি উদাস ভঙ্গি। এঁটো ফেলতে বাইরে এসে একপলক নীরবে স্বামীকে দেখল। দেখতে ভালোই লাগে। একটু পরেই কমলি খেয়ে এসে বাপের হাত-পা দাবাতে বসবে। তখন রাজ্যের গল্প ফাঁদবে কমলি। তারপর গল্পের মাঝখানেই কখন বাপের বুক ঘেঁষে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। পিপুলের ছায়ায় রোদের একটা জাল মৃদুমন্দ নড়বে ওদের মুখে, শরীরে।
.
ইস্টিশানে বাপ-ব্যাটাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে চমেলি কুকুর রোজ ল্যাং–ল্যাং করে একা ফেরে। মাঝে বাতাস শুকে দাঁড়ায়, এধার যায় ওধার যায়। ঘুরে ফিরে এক সময়ে ঠিক দুপুরবেলা এসে দাঁড়ায় কমলিদের উঠোনে। দাঁড়িয়ে হাঁক ছেড়ে জানান দেয় যে সে এসেছে। কমলিও তৈরি থাকে শেষ কয়েকটা গ্রাস সে খায় না। সেটা মুঠোভরে নিয়ে দৌড়ে আসে। নাড়তে-নাড়তে ল্যাজটা বুঝি আনন্দে খসেই যায় চমেলির। যদিও সে গেনিয়ার কুকুর, তবু বাপ-ব্যাটার খাওয়ার পর ভুক্তাবশেষ কিছুই থাকে না বলে চমেলির পেট ভরে না। প্রায়দিনই তাই তাকে কমলির কাছে আসতে হয়। দু-মুঠো ভাতের পরিবর্তে সে বিস্তর অত্যাচার সহ্য করে যায়। কমলি চিরুনি। দিয়ে তার গা আঁচড়ে দেয়, মেহদি বেটে গায়ে নকশা আঁকে, গলার চামড়া টেনে আদর করে।
ভাঙা একটা সানকি পড়ে আছে আঁস্তাকুড়ে। তাতে পাতের ভাত ঢেলে দিয়ে কমলি চমেলির সঙ্গে কথা বলে কঁহা গৈল তোহর মালিক। বিজনেসমে?
শুখা অন্ধকে লোকে খুব একটা দয়া করে না। বিজনেস ভালো হয় গলায় গান থাকলে।
সেই কথা মাঝে-মাঝে বাপকে বোঝায় গেনিয়া। কিন্তু সুরদাস রামজির গানের গলা নেই। হাঁ করলে ফাটা বাঁশের আওয়াজ বেরোয়।
–তুই শেখ গেনি। হিন্দি ফিলিমের গানা দু-চারটে কাবেজে রাখ।
গেনিয়ার লজ্জা করে। আড়ালে অবশ্য সে গায়। গাইবার চেষ্টা তার আছে। দুটো চ্যাপটা পাথর আঙুলে বাজিয়ে যশিডির ভিখন এই এত পয়সা রোজগার করে। দুটো পাথর গেনিয়ারও জোগাড় আছে।
সন্ধেবেলা সীতারামপুর কি ঝাঁঝা থেকে ফিরতি গাড়ি ধরে ফেরে বাপ-ব্যাটা। ঝোঁপড়ার কাছে এসে বাপকে একা ছেড়ে দেয় গেনিয়া, তারপর পিছন ফিরে জোর কদমে হাঁটতে থাকে। পিছন থেকে তার বাপ প্রাণপণে তাকে ফিরে ডাকে, শাপ–শাপান্ত করে, মিনতি করে, গেনিয়া ফেরে না। এক দৌড়ে লাইন পার হয়ে চলে আসে গুমটি ঘরের পিছনে ব্যারাকবাড়িতে। রোজ সন্ধেবেলা গান গায় মহিন্দর–যার সঙ্গে তার মা আছে এখন। পুরোনো একটা হারমোনিয়ম আছে মহিন্দরের, খাঁটিয়ায় চাগিয়ে বসে সে, এক পা তুলে দেয় হারমোনিয়মের ওপর গোঁড়ালি দিয়ে বেলো করে, দুই হাতে রিড চেপে আওয়াজ বের করে হারমোনিয়মের। দরাজ গলায় গান গায় তার সামনের দুটো উঁচু দাঁতে দু-ফোঁটা সোনা চিকচিক করে। শৌখিন লোকটা। তার সামনে। চমেলির মতোই খাপ পেতে বসে থাকে গেনিয়া। মনপ্রাণ দিয়ে গান শোনে, তুলে নিতে চেষ্টা করে মনে-মনে।
