ভুট্টার দানা দাঁতে নিতেই পোড়া ভুট্টার সুঘ্রাণে ভরে গেল শরীর। গেনিয়া কমলির দিকে চেয়ে হাসে, কমলি গেনিয়ার দিকে চেয়ে।
গেনিয়া আস্তে করে বলে–একটু নুন হলে–
কমলি তখন লক্ষ করে বাবার পিঠে একটা ডাঁশ বাইচে। তড়িতে উঠে গিয়ে আঁচল ঝাঁপটে ডাঁশ তাড়ায়….
বাবা মুখ তুলে বলে–কী রে?
–ডাঁশ।
বাবা আবার চুপ করে বসে থাকে। বিড়ি খায়।
–বাবা পাগলা ডাক্তারের খরগোশগুলো রোজ এসে বাদামের খেত ভেঙে যায়।
–তাড়িয়ে দিস।
–তাড়াই না বুঝি! এবার আমি একটা কুকুর পুষব। গেনিয়ার চমেলি কুকুরের বাচ্চা হোক–কেমন বাবা! হ্যাঁ?
–আচ্ছা।
বাবা বড় ভালো। কুকুরের ওপর মায়ের বড় রাগ।
সুনসান বাগানখানা রোদ মাখছে, বাতাস মাখছে। ফুলের গর্ভকোষে পরাগ–সঞ্চার করে ফিরছে পোকারা। তাদের ওড়াওড়ি শব্দ। ফুলের বেড লাফিয়ে-লাফিয়ে পার হয় গেনিয়া, পিছনে কমলি। নিস্তব্ধ ভয়াল বাড়িটার দিকে তাকালেই তাদের বুকে নানা ইচ্ছের রং এসে পড়ে।
দুজনে এসে বারান্দার গ্রিলের ভেজানো দরজা খুলে ঢোকে। বারান্দায় ওপাশে সারিবদ্ধ ঘর। বড় তালা ঝুলছে। বহুবার দেখেছে তারা, তবু রোজ একবার করে দরজার পাখি তুলে অন্দর দেখে। ভিতরে গোধূলির মতো অন্ধকার। তবু বিচিত্র আসবাব দেখা যায়। ইংলিশ বেড, ড্রেসিং টেবিল, জাপানি ফুলদানি, দেওয়ালে প্রকাণ্ড সব ছবি, খেলনার আলমারি, বইয়ের শেলফ। তারা। ঘুরে এক-এক ঘরের দরজার পাখি তুলে এক-এক রকমের জিনিস দেখে। পনেরো দিন অন্তর ভূতনাথ দরজা খোলে, এতোয়ারি বালতি করে জল আনে, ঝাঁটা আনে। ঘর ভোলাই হয়। তখন ঘুরে ঢুকে এটা ওটা ছুঁয়েছে কমলি। গোনিয়াকে এতোয়ারি ঢুকতে দেয় না, বলে–ওটা চোট্টা। এক পলকে জিনিস তুলে উধাও হবে।
গেনিয়া তাই তৃষিত চোখে ভিতরটা দেখে। রোজ।
কিন্তু কমলি বেশিক্ষণ দেখতে দেয় না। গেনিয়ার চোখ বড্ড লোভী।
দরজার পাখি ফেলে দিয়ে কমলি বলে–আর না।
একগাল হাসে গেনিয়া, বলে–আলমারিতে একটা সোনার ঘোড়া আছে–না রে?
কমলি ঠোঁট ওলটায়, বলে–কী জানি! কত কিছু আছে!
উত্তরের ঘরটায় জানালায় একটা শিক নেই। গেনিয়া তা দেখে রেখেছে।
*
অন্ধ রামজি সারা সকাল বিছানায় শুয়ে। বুড়ো হলে শরীরের তাপ কমে যায় নাকি! বিছানার ওম বড় ভালো লাগে। বাঁশের ওপর খড় পাতা, তার ওপর চিটচিটে ন্যাকড়া আর ন্যাকড়া। এই বিছানা, তবু ওম দেয়! রাতে গেনিয়া শোয় পাশে, তার শরীরের ওমটিও ভালো লাগে। কোন ভোরবেলা উঠে গেছে গেনিয়া বুড়ো বাপকে একা ফেলে রেখে।
চোখ দুটো পাথর হয়ে গেছে বটে তবু আন্দাজে বেলা ঠাহর পায় রামজি। পেটে খিদে চাগাড় দিয়ে ওঠে। খিদের সঙ্গেই বসবাস, তাই অস্থির হয় না। ধীরেসুস্থে উঠে, মাচান থেকে নামতে নামতে চেঁচিয়ে গেনিয়াকে ডাকে। ডাকটা কর্কশ, তবু ডাকের মধ্যে আদর আছে।
গেনিয়ার সাড়া পাওয়া যায় না। রামজি উঠে ঘরের পিছনের জঙ্গলে পেচ্ছাপ করে আসে। মাটির খোরায় দু-মুঠো ভেজানো ভাত আছে। জল খায়। তারপর গেনিয়াকে সঙ্গে করে রামজি বেরোবে মাংতে।
গেনিয়াকে আরও কয়েকবার ডাকে রামজি। সাড়া নেই।
মাটির খোরায় হাত দিয়েই টের পায়, একটা অবধি ভাতও খুঁটে খেয়ে গেছে রেন্ডির ব্যাটা। বুড়ো বাপের জন্যে একদানাও রেখে যায়নি।
–এ গেনি–ইই–রেন্ডির ব্যাটা–
রোদে বসে প্রাণপণ ডাক দিতে থাকে রামজি–ভিখমাঙ্গা সুরদাস।
.
এ বাড়ির কলে কেমন হিলহিল করে জল পড়ে। মিঠে জল। হাঁটু গেড়ে কলের তলায় বসে আঁজলা ভরে জল খায় গেনিয়া। অদূরে চৌবাচ্চার চাতালে বসে মাথার চুলে আঙুল ডুবিয়ে গম্ভীর মুখে উকুন খোঁজে কমলি।
জলে পেট ভরে ওঠে। তবু কল থেকে জল পড়া দেখতে ভালো লাগে বলে গেনিয়া আঁজলা পেতে মুখ ডুবিয়ে রাখে। জল পড়ে যায়।
কমলি উঠে এসে কল বন্ধ করে বলে–জল মাগনা না? এবার ভাগ।
আউট–হাউসের সামনে শাকের খেত। সেখান এতোয়ারি খুঁটে-।খুঁটে শাক তুলছে। সেইখান থেকেই দেখতে পায় ভিখমাঙ্গা সুরদাসের চোর ছেলে গেনিয়াটার সঙ্গে কমলি বাইরের কলের চাতালে বসে। মেয়েটার নজর নীচু হয়ে যাচ্ছে। সে ডাক দেয়–এ কমলি–
কমলি চলে যেতেই এক লাফে গেনিয়া ভুট্টার খেতে সেঁধোয়। মটমট করে ভুট্টা ভেঙে নেয় আট দশটা। বুকে জড়ো করে ধরে নিঃসাড়ে বাড়ির উত্তর দিকের ধার ঘেঁষে দ্রুত পায়ে এগোয়। কাঁটা বেড়ার ভিতরে একটা গোপন ফোকর আছে, তাই দিয়ে গলে রাস্তায় পড়ে।
গেনিয়ার পায়ের শব্দ পেতেই রামজি নিঃসাড়ে লাঠিটার দিকে হাত বাড়ায়।
–আওল তু?
গেনিয়া উত্তর দেয় না। কিন্তু তবু তার শরীরের অবস্থিতি টের পায় রামজি। লাঠিটা আচমকা তুলে প্রাণপণে বসায়।
কিন্তু গেনিয়ার অভ্যাস আছে। খরগোশের মতো লাফ দিয়ে সরে যায় সে। বুক থেকে দুচারটে ভুট্টা খসে পড়ে। লাঠিটা মাটিতে পড়ে খট করে ওঠে।
–রেন্ডির ব্যাটা, শরম নেই? বুড়ো আন্ধা বাপের জন্য একটা দানা রেখে যাসনি।
দূর থেকে বাপের দিকে একটা ভুট্টা ছুঁড়ে মারে গেনিয়া। সুরদাস রামজি প্রথমটায় চেঁচিয়ে ওঠে–আমাকে মারছিস শালা চুহা? অ্যাঁ! আমাকে বুড়ো আন্ধা বাপকে তোর–অ্যাঁ?
আবার লাঠিটার দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে ভুট্টাটা হাতে পায়ে। তুলে নেয়। খোসা ছাড়িয়ে হাত বোলায় দানাগুলের গায়ে। তারপর হাসে।
