ভুট্টা খেতের ভিতরে ঝুঁঝকো আঁধার। সেইখানে সরসর করে শব্দ হয়। দুটি শিশু কচি ভুট্টা ঘেঁড়ে, খোলস আর রোঁয়া সরিয়ে দাঁত বসায়। দানা ফেটে উছলে ওঠে ভুট্টার দুধ। স্বাদে তাদের মুখ ভরে যায়। তারা ভুট্টার দুধ শুষে নিতে থাকে। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ঝুঁঝকো আঁধারে বুঝদারের মতো হাসে। মেয়েটার চুল রুক্ষ লালচে, পরেছে এক বিবর্ণ ডুরে শাড়ি, পুরু দুটি ঠোঁটে একটু উঁচু দাঁত ঢাকা পড়ে না। ছেলেটার পরনে নোংরা লেংটি, গা উদোম, ন্যাড়া মাথায় লম্বা। টিকি!
বাবুদের বাগানের এককোণে মেয়েটির বাবা রাজ্যের বুনো ঘাস নিড়িয়ে নেড়া করেছে। সারাদিন ঝরে পড়ে শুকনো গাছের পাতা। সেইসব পাতা কুটো শিমুলের ডাল থেকে খসে পড়া একটা বাবুইয়ের বাসা–এইসব দিয়ে একটা স্কুপ তৈরি করেছে সে। তারপর সাবধানে দেশলাই জ্বেলে সে একটা বিড়ি ধরায়, তারপর জ্বলন্ত সেই কাঠিটা দিয়ে বাবুইয়ের বাসাটার আগুন দিয়ে শুকনো পাতার স্তূপটা ধরিয়ে দেয়। পাতা পোড়ার মিষ্টি ঝাঁঝালো ধোঁয়ার গন্ধ পায় সে। আগুন জ্বলে ওঠে। একটু দূরে ঘাসের ওপর উদাসী ভঙ্গিতে বসে সে বিড়ি খায়।
ভুট্টা খেতের মধ্যে মেয়েটি সেই গন্ধ পায়। পাতা পোড়ার মিষ্টি গন্ধ। তাহলে বাবা আগুন জ্বেলেছে। ঝলসে নিয়ে খাবে বলে সে দুটো ভুট্টা ছিঁড়ে কোঁচড়ে নিয়ে খেত থেকে বেরোয়। অমনি দেখতে পায়, খরগোশের কাণ্ড। চিনেবাদাম গাছের শিকড় খুঁড়ে বেগোছ করছে। মুখ ফিরিয়ে সে ছেলেটাকে ডাকে–এ গেনিয়া, মোমফালি খা লেল কৈ।
–কৌন?
–হৌ দেখ।
গেনিয়া ভিখমাঙা সুরদাসের ছেলে। তার হাতে সব সময়ে একটা খেটে লাঠি থাকে। ওই লাঠির এক প্রান্ত ধরে তার বাবা অন্যপ্রান্ত ধরে সে। ওই ভাবে লাঠি ধরে, সে বাবাকে ভিখ মাঙতে নিয়ে যায় রাস্তায়–রাস্তায়, বাড়িতে–বাড়িতে। চলে যায় যশিডির সাটল গাড়িতে উঠে মেল ট্রেনে ঝাঁকা কিংবা মধুপুর ঘুরে আসে। সেই লাঠি হাতে ছেলেটা লাফ দিয়ে বেরোল।
তিনটে খরগোশ ছুটে পালায়। তারা বেশি দূরে যায় না। এ বাগানের সীমা পেরিয়ে কাঁটা গাছের বেড়ার তলা দিয়ে উত্তরে আর একটা বাড়ির বাগানে ঢুকে যায়। গেনিয়া মেয়েটাকে বীরত্ব দেখাতে খেটে লাঠিটা হাতে নিয়ে দু-চারবার লাফ ঝাঁপ করে, চেঁচায়। তার লেংটির একটা প্রান্ত দু-পায়ের মাঝখান বরাবর ঝুলে থাকে, এখন লাফ ঝাঁপ দেওয়ার সময়ে সেই অংশটা লেজের মতোনড়ে। মেয়েটা তাই দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ে।
চিনেবাদামের খেত পার হয়ে তারা প্রকাণ্ড নিস্তব্ধ বাড়িটা ঘুরে আগুনের কাছে চলে আসে। আগুনের আঁচ থেকে দূরে ঘাসে বসে উদাস ভঙ্গিতে মাটি–মাখা হাতে বিড়ি খায় ভূতনাথ। তার চোখ শূন্যে নিবদ্ধ। মেয়েটা বাবার ওই ভঙ্গি দেখে আসছে জন্মাবধি। সে জানে এ দেশের মাটি তার বাবার পছন্দ না। তার বাবা যে–মাটির দেশে ছিল সে-মাটির দেশে আরও নিবিড় গাছপালা জন্মাত। সেখানে ছিল অনেক জল। জলে–মাটিতে মাখামাখি হত খুব। এখানে তা হয় না। সেই ঢাকার দেশে বাবার ছিল বউ, একটা ছেলেও। তারা দুজনেই ঘরের আগুনে মারা যায় দাঙ্গার। সময়ে। তার বাবা একা পালিয়ে আসে কলকাতায়। সাহাবাবুরা দেশের লোক, তারা ভুতনাথকে দু-একটা কাজ দিয়েছিল। কিন্তু লোকটার মাটির নেশা দেখে বুড়ো কর্তা বললেন–বৈদ্যনাথ ধামে আমার বাড়িটা পড়ে আছে। মালিটা বুড়ো–হাবড়া, তা তুমি সেখানে গিয়ে বরং মাটি ছানো গিয়ে। তোমার হাতে গুণ আছে, গাছপালা করো গে সেখানে–
বুড়ো বিহারি মালির চাকরি গেল। বড় কষ্ট হয়েছিল ভূতনাথের। সেই কষ্ট থেকেই ভূতনাথ এক ঢিলে দুই পাখি মারল। বুড়োর এক মেয়ে ছিল, যদিও বাঙালি না, তবু তার মুখচোখে বিহারের সহজ লাবণ্য দেখা যায়। বুড়োকে কন্যাদায় থেকে উদ্ধার করতে গেল সে, তার নিজের তখনও বিয়ের বয়স যায়নি। বুকে খামচে থাকা স্ত্রী পুত্রের দুঃখটাতেও একটা প্রলেপ পড়া দরকার। বুড়ো বিড়বিড় করে বলল –মেয়ে আমাদের দুধেল গাইয়ের মতো। বিয়ে করতে চাও করো–নগদ দুশো টাকা ধরে দাও। ভূতনাথ থ। কোথায় সে বিনাপণে দায় উদ্ধার করতে এসেছিল, কোথায় আবার উলটে কন্যাপণ? তবু নিয়ম। রফা হল একশোয়। কিন্তু এক দফায় না, চার দফায়। ইনস্টলমেন্টে বিয়ে করে ঘর বাঁধল ভূতনাথ, সাহাবাবুদের বাড়ির আউট হাউসে। চারদিকে জমি মেলাই। মনের আনন্দে মাটিতে ডুব দিল সে। ফুল–ফলের বুদবুদে ভরে দিল। বাগান। এতোয়ারির কোলে এল কমলি।
সেই কমলি এখন ওই পাতার আগুনের দিকে সাবধানে হাত বাড়িয়ে কচি ভুট্টা সেঁকছে, সঙ্গে ভিখিরির ছেলে গেনিয়া। উদাস চোখে দৃশ্যটা দেখে ভূতনাথ। আমার বউ, আমার সন্তান, আবার সেই জমি নিয়ে মাখামাখি, তবু কোথা থেকে এক অন্যমনস্কতা এসে বাসা বেঁধেছে ভূতনাথের মাথায়। মাঝে-মাঝে তার বোধে আসে যে, সে যেন এই পৃথিবীর সঙ্গে ঠিকমতো আটকে নেই। কোথায় একটু ঢিলে বাঁধুনি রয়েছে, একটা আলগা ভাব। মাঝে-মাঝে তাই সে বসে গাছের ছায়ায় ঘাসগজারির মধ্যে চুবিয়ে–জলের কথা ভাবে, জমির রঙের কথা ভাবে, কখনও বা তার মনে পড়ে সেই বউ–ছেলের মুখ, কখনও মনে পড়ে দুঃসময়ের আগুনরঙা আকাশ। কিংবা কিছুই মনে পড়ে না, কেবল এক কাতরতা তাকে বকের মতো একা করে রাখে। এক ঠাঁই ঝিম মেরে থেকে থেকে মাঝে-মাঝে মাথার মধ্যে টের পায়, চিন্তার মাছ পলকে ঘাই মেরে ডুব দেয়। আর ধরা যায় না। খেলাটা বেলাভোর তাকে বসিয়ে রাখে, বিড়ি নিভে তেতো হয়ে যায়। তখন কখনও কমলি ‘বাবা’ বলে ডাক দিলে সে ভারী চমকে উঠে ভাবে–কে রে মেয়েটা?
