কিছুক্ষণের জন্য এই পৃথিবীতে সব কিছুই বড় সত্য।
একদিন আমি সমুদ্রের তীরে এক জাহাজঘাটায় চারজন প্রার্থনারত লোককে দেখেছিলুম। আরব বেদুইনদের মতো অদ্ভুত তাদের ঢিলাপোশাক, মাথায় সাদা ফেজ টুপি। তারা মক্কার দিকে মুখ করে নানা বিচিত্র ভঙ্গিতে তাদের প্রার্থনা সেরে নিচ্ছিল। দেখলুম তারা কখনও উবু হচ্ছে, উঠে দাঁড়াচ্ছে, বসছে কানে হাত দিচ্ছে। আমি দু-পা ফাঁক করে, প্যান্টের পকেটে দুই মুষ্টিবদ্ধ হাত নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলুম। আমার সামনে সমুদ্রের গভীর সবুজ রং মাথার ওপরে লালফিরোজায় মাখামাখি আকাশ, দুইয়ের মাঝখানে নিঃসঙ্গ এক জাহাজের দীর্ঘ মাস্তুল, আর তারা চারজন। তখন আমি শহরতলির বাচ্চা–বখাটে এল চোর, ছিনতাইবাজ; পাছাভারী বুক–উঁচু মেয়েদের দেখে প্রকাশ্যে শিস দিই, মাঝে-মাঝে হিসেব করে দেখার চেষ্টা করি আমাদের মধ্যে কার কটা বে-আইনি ছেলে–পুলে আছে। অথচ আমার সামনে সেদিন সেই তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ সাধারণ সেই দৃশ্যটি যেন রুখে দাঁড়াল। আমি নড়তে পারলুম না। উদাসীন একটি মেঘ আমার মনের ওপর একটুক্ষণের জন্য তার ছায়া ফেলে গেল। প্রার্থনার শেষে তারা চারজন বুড়োসুড়ো লোক সামনে আমার দু-পকেটে মুষ্টিবদ্ধ হাত এবং দু-পা ফাঁক করে দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখে ভয়ে জড়সড়ো হয়ে দ্রুত গুটিয়ে নিল তাদের কাপড়ের টুকরোগুলি যার ওপর দাঁড়িয়ে তারা প্রার্থনা করছিল, তারপর তারা তাড়াতাড়ি সরে পড়বার চেষ্টায় ছিল। আমি তাদের সঙ্গ ধরে জিগ্যেস করলুম, তোমরা কারা? তারা প্রথমে সন্দেহের চোখে আমাকে দেখল, একটু ইতস্তত করল, তারপর হেসে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিল। আমরা বালির ওপর বসলুম। তারা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বলল , আমরা তীর্থযাত্রী। আমাদের গোত্র–পরিচয় এখন আর নেই, সে সব আমরা পিছনে ফেলে এসেছি। আমি হেসে ঠাট্টা করে বললুম, বাহবা! চমৎকার! কিন্তু যে কাপড়ের টুকরোগুলো মাটিতে পেতে তোমার প্রার্থনা করছিল সেগুলো কিন্তু তোমরা গুটিয়ে নিয়েছ, ফেলে যাওনি। শুনে সবচেয়ে বুড়ো লোকটা, যার পাকা জ্ব, নিরীহ মুখ, সে বলল , বাছা কোনও কিছুকেই ফেলে যে আমরা যাচ্ছি না একথা সত্যি। তবে তীর্থযাত্রীকে ওরকমই ভাবতে হয়। নইলে কোনও কিছুকেই কি ফেলে যাওয়া যায়? দেখো ওই আকাশ, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, এই আমাদের পৃথিবী–এরা সবাই চলেছে, কেউ কাউকে ফেলে রেখে যাচ্ছে কি? এখন তুমি যদি অনুমতি দাও তবে আমরা এই প্রার্থনা করার কাপড়ের টুকরোগুলো সঙ্গে নেব; আর যদি তোমার ইচ্ছে হয়তো বলল আমরা এগুলো সমুদ্রে ফেলে দিয়ে যাই। কেন না কে জানে, তুমিই ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ কি না, তীর্থযাত্রার মুখে হয়তো আমাদের পরীক্ষা করতে এসেছ।
ভি, ওরা ছিল অশিক্ষিত সামান্য মানুষ, ওদের ধর্মজ্ঞান ওরকমই যুক্তিহীন ও আবেগপূর্ণ। তবু সমুদ্রের ধারে বালির ওপর বসে চারজন বুড়োসুড়ো লোকের মুখোমুখি, পিছনে জাহাজ, আকাশ ও সমুদ্রের মায়া, ঢেউয়ের আর এলোমেলো বাতাসের শব্দের মধ্যে ওই কথা আমার অদ্ভুত লেগেছিল–আমি ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ কি না? আমি মনে-মনে নত হয়ে আমার বিদ্রূপ সামলে নিলুম। তারা আমার মঙ্গল প্রার্থনা করল, তারপর খুশি হয়ে ঢালু বালিয়াড়ি ভেঙে ধীরে-ধীরে সুবজ জলের কাছে নেমে গেল।
এখন আমার চারধারে সবসময়ে ঘিরে থাকে ঘুষি মারবার থলি, ওজন তুলবার যন্ত্র, মেসিন বল, দৌড়োবার জুতো, আমার সারাদিনের সঙ্গী সেইসব দৈত্যকায় মানুষেরা যাদের সঙ্গে আমি লড়াই অভ্যাস করি। আমি এল, যে নাম শুনলে আমারই বুকের ভিতর দপ করে জ্বলে ওঠে অহংকার। আমি মূল্যবান। আমার নামে বাজি ধরা হয়। লড়াইয়ের আগে ওজন নেওয়ার সময়ে। প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে দেখা হয়, আমি ফুঁসে উঠে বলি, বুড়ো শুয়োর, হোঁতকা ভালুক, আমি গান গাইতে-গাইতে তোকে মেরে ফেলতে পারি। আমি রাস্তার লোককে জড়ো করে বলি, আমি সর্বশ্রেষ্ঠ; আমিই সর্বকালের একমাত্র সেরা লড়িয়ে। আমি অজেয়, ভয়ঙ্কর দ্যাখো এল–তোমরা আমার জয়ধ্বনি দাও। দেখো ভি, তবু রিংয়ের বাইরে আমি একতাল কাদামাটির মানুষ; মনের ভিতরে খুব গভীরে আমি এখনও এক বিমনা এল, যে নদীর ওপর ঝোলানো পোলে দাঁড়িয়ে রাতের কুয়াশার দিকে চেয়ে থাকে, যে একা-একা ঘুরে বেড়ায় শহরতলির রাস্তায় রাস্তায়, জাহাজঘাটায় যে পথে চলতে দেখা বুড়ি ফলওয়ালির ঝুড়ি থেকে মজা করবার জন্য টপ করে তুলে নেয় ফল, যে সদ্য–হাঁটতে–শেখা নিগ্রো শিশুর দিকে দু-হাত বাড়িয়ে বলে, এসো, এসো আর একটু…আর একটু…শাবাশ! আমি সেই এল, যে একদিন সমুদ্রের ধারে চারজন বুড়োর। মুখোমুখি ভাবতে বসেছিল, সে ঈশ্বর প্রেরিত পুরুষ কি না। যে একদিন হাতের কুড়োনো পাথর রাস্তায় গড়িয়ে দিয়ে ভেবেছিল, পৃথিবীর কোনও গাছ, কোনও ল্যাম্পপোস্টই তার শত্রু নয়। মাঝে-মাঝে তাই উজ্জ্বল আলোর নীচে, রিংয়ের ভিতরে দুটি গ্লাভসবদ্ধ হাত শূন্যে তুলে পৃথিবীর মানুষকে ডেকে আমার এই কথা বলতে ইচ্ছে করে, দ্যাখো, চেয়ে দ্যাখো তোমরা আমাকে কোথায় নির্বাসিত করেছ!
সোনার ঘোড়া
তিনটে খরগোশ তুরতুর করে মাটি ভাঙে চিনাবাদামের খেতে। মাটি উলটে বের করে বাদাম। সামনের দুই থাবায় ধরে কুটকুট করে খায়। তাদের কান নড়ে আনন্দে।
