কখনও আমি সাদা ছোঁকরাদের টিটকিরি শুনে ঘুষি তুলেছি, অমনি এক পথ–চলতি নিগ্রো বুড়ি আমার হাত চেপে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলেছে বাছা, ভয় পেতে শেখো, ভয় পেতে শেখো। এখনও আমাদের জোট বাঁধতে অনেক দেরি। হ্যাঁ, আমি সেই এল, যে ভয় পেতে শিখেছিল। রাতে ঘরের চালের ওপর দিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে বেড়াল, সেই শব্দে ঘুম ভেঙে সে ভয়ে আঁকড়ে ধরত বালিশ। হেমন্তে শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে, সেই শব্দে সে তড়িৎগতিতে বড় রাস্তা ছেড়ে দৌড়ে নেমে যেত গলিতে। বর্ষার জল–জমা গর্তের মধ্যে লাফিয়ে পড়েছে ব্যাঙ সেই শব্দে তার হৃৎপিন্ড লাফিয়ে উঠত গলায়। সে বাতাসের মধ্যে শুনতে পেত ফিসফিশ শব্দ, ট্রিজন! হত্যা! লুট। দূর সমুদ্রের শব্দের মধ্যে সে শুনতে পেত সেই গান, পায়ে-পায়ে লাথি মারতে মারতে নিয়ে চলো ওই নিগ্রোটাকে। টেক দি নিগার বাই দি টো। বাতাসের ভিতরে লুকোনো আছে বিস্ফোরক, সূর্যের আলোয় মেশানো আছে গন্ধক, প্রতিটি গাছের চিক্কণতায় লুকোনো আছে বিশ্বাসঘাতকতা। সে কেবল এই বীজ–মন্ত্র শিখেছিল, বিশ্বাস কোরো না, এল, বিশ্বাস। কোরো না।
প্রতিপক্ষের নাগাল থেকে আমি ছায়ার মতো পালিয়ে যেতে শিখেছিলুম আমি জোরে দৌড়তে শিখেছিলুম, আমি পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে হাঁটতে শিখেছিলুম, আমি চোখ বুজে ভাবতে শিখেছিলুম যে আমি আমার ছায়া। এখন লড়াইয়ের পর রিংয়ের মধ্যে লাফিয়ে উঠে আসে মানুষ, রিংয়ের দড়ির ওপার থেকে ঝুঁকে চিৎকার করে বলে, এ লড়াই নয়, কালো–শিল্প, সম্মোহনবিদ্যা, অ্যালকেমি। কুকুর, তুই কেবল চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যেতে শিখেছিস। আমার আহত প্রতিপক্ষ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সংবাদদাতাদের কাছে গম্ভীর মুখে বিবৃতি দেয়, লড়াইয়ের সময় রিংয়ের মধ্যে ও এত দ্রুত সরে যাচ্ছিল যে আমি ওকে ভালো করে দেখতেই পাচ্ছিলুম না। ও যেন ঠিক ছায়ার মতো পড়ছিল আমি ওকে ছুতেই পারিনি। আমার পরবর্তী প্রতিপক্ষ বুক ঠুকে চেঁচিয়ে বলে, তোমাকে দেখে নেব এল, এবার তোমাকে আমি দেখে নেব। আমি মৃদু হেসে পৃথিবীর লোকের সামনে আবার আমার দুই হাত তুলে ধরি! আঙুল দেখাই। সাত রাউন্ড! তার বেশি না। এবার আমার প্রতিপক্ষের আয়ু মাত্র সাত রাউন্ড। বিস্ময়ে, ক্ষোভে, হতাশায় ওরা চিৎকার করে বলে, নরকে যা, নরকে যা, বেজন্মা। কেননা ওরা জানে যে আমি আমার কথা রাখব। কেননা, আমি প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াই, মৌমাছির মতো হুল ফুটিয়ে দিই। আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ডেকে বলি, গোঙাও, বাছা গোঙাও। আমাকে ছুঁতে পারোনি বলে দুঃখ কোরো না। কে কবে ছুঁতে পেরেছে আমাকে! আমি যে সেই ভয় পাওয়া নেংটি ইঁদুরের মতো ছোট্ট এল, যে ভয়ঙ্করভাবে পালিয়ে যেতে শিখেছিল। যে সূর্যের আলো থেকে বাতাস থেকে, সমুদ্রের শব্দের কাছ থেকে কেবল পালিয়ে গেছে, যে নিজেকে ভাবতে শিখেছিল ছায়া। তুমি তো দেখেছ কেমন দ্রুত চলে আমার পা, রুহমবা নাচের হালকা শরীর নর্তকের মতো আমি কেমন আমার প্রকাণ্ড শরীরকে দূরে-দূরে সরিয়ে নিয়ে যাই, কেমন করে আমি হয়ে যাই ছায়ার মতো অবাস্তব, হয়ে যাই মায়াবী জাদুকর!
ভি, তোমাকে জিগ্যেস করি, দ্যাখো তো আমি কি দেখতে সুন্দর নই! আমাকে কি যথেষ্ট ভদ্রলোকের মতো দেখতে নয়? দ্যাখো, আমার প্রকাণ্ড শরীর এমন সুষম ও স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠা যে আমাকে একটুও বিকট দেখায় না, দেখো আমার থুতনির কাছে ছোট্ট একটু আঁচিল, ঘন। জ, মাথায় কালো চুল, আমার চোখ দ্যাখো, এর ভিতরে কি কোনও ঘেন্নার আগুন আছে, কিংবা প্রতিশোধস্পৃহা? বরং শিশুর মতোই নিষ্পাপ ও কৌতূহলী আমার চোখ। তুমি যদি কখনও দ্বিধা। ত্যাগ করে আমাকে তোমার ওই কিশোর ছেলেটি ভেবে বুকে জড়িয়ে ধরো তবে নিশ্চিত জেনো, তোমার এই টোল খাওয়া শরীর নরম বুক যুবতী–মুখের ডোল এইসব ভুলে গিয়ে আমি তোমাকে আমার মা ভেবে কাঙাল ছেলের মতো চোখ বুজে চুপ করে থাকব। কিন্তু দ্যাখো, খুব বেশিক্ষণ আমাকে এই ভাবে রেখো না। খুব বেশিক্ষণ আমি কারও কিছু হয়ে থাকতে পারি না। আমার নিজেরই এক অদৃশ্য হাত আমাকে সবকিছু থেকে ইচ্ছা, লোভ এবং বিশ্বাস থেকে ছিঁড়ে আনে। দুবার আমার বিয়ে ভেঙে গেছে। না, আমি পত্নীপরায়ণ স্বামী নই, যেমন আমি নই মা বাবার আদুরে বাধ্য ছেলে, নই ভাই-বোনের প্রিয় সহোদর, আমি নই বন্ধুদের বিশ্বাসভাজন। আমি অত হতে পারি না। আমি এক প্রকাণ্ড শিশুর মতোই নতুন খেলনা পেতে ভালোবাসি, আবার ভেঙে দুমড়ে সেই খেলনা ফেলে দেওয়াও আমার কাছে সমান প্রিয়। শিশুর মতো নিষ্ঠুর ও
উদাসীন আর কে আছে? আবার শিশুর মতো ভীতুই বা আর কে? দ্যাখো রিংয়ের বাইরে আমি এখন একতাল কাদামাটির মতো মানুষ, পাতা ঝড়ে পড়ার শব্দে আমি চমকে উঠি, বেড়ালের পায়ের শব্দ হলে রাতে আমার ঘুম হয় না, আমার আমিই সেই এল যে আঙুল তুলে এক দুই তিন রাউন্ড দেখাই। ভি, কিছুক্ষণের জন্য এ সব কিছুই সত্য। দ্যাখো, গ্লাভস পরা সেই দুটি ভয়ংকর হাতকে এখন দ্যাখো, আমি এখন খুব সূক্ষ্ম ছুঁচে সুতো পরাতে পারি, আমি এই হাতে আঁকতে পারি পাখি, রমণী ও প্রজাপতির ছবি, বেহালায় বাজাতে পারি প্রেমের গান। ভি, বোন আমার, পৃথিবীতে কিছুক্ষণের জন্য এই সব কিছুই সত্য। যেমন একথাও সত্য যে, একদিন ছেলেবেলায় আমাকে শ্রান্ত ও পিপাসার্ত দেখে বুড়ো এক সাহেব ডেকে বলেছিল, এসো এল, এক কাপ কফি খেয়ে যাও। আবার এ কথাও সত্য, সাদা মানুষের হাতে একদিন বেধড়ক মার খেয়ে একটি অশিক্ষিত নিগ্রো ছেলে রক্তমাখা মুখে উদভ্রান্তের মতো ম্যানহাটনের পথে–পথে ঘুরে বেড়িয়েছিল। পথচারীদের ধরে-ধরে করুণ গলায় জিগ্যেস করেছিল, মশাই, বলতে পারেন আফ্রিকাটা কোন দিকে? আমি আফ্রিকায় যেতে চাই। আমি আফ্রিকায় চলে যেতে চাই।
