ওরা সব সাজ–বদল করা মানুষ। ওরা আমাকে টেলিফোনে ডেকে বলছে, এল, অভিনন্দন! চমৎকার লড়েছ, চমৎকার! ওরা আমাকে বেনামা চিঠিতে লিখছে, এল, রাস্তার কুকুর, বেজন্মা, তোর জন্য দূরবিন লাগানো চমৎকার একটা রাইফেল কিনেছি, যে রাইফেলে ‘কে’ মারা পড়েছিল সেই একই মেকারের। এরপর যদি তুই কখনও লড়াইতে নামিস, তবে গ্যালারি থেকে আমর নিশানা ঠিক থাকবে। ওরা সব সাজ–বদল করা মানুষ। দেখো, বিকিনি পরা মেয়েটি মায়াময়ী সমুদ্রতীরে উপুড় হয়ে পড়ে বালিতে গর্ত খুঁড়ে গোপনে বলে রাখছে, এল, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তারপর বালি দিয়ে গর্তের মুখ বুজিয়ে দিচ্ছে লজ্জায়। আবার দ্যাখো,
আধবুড়ো লোকটা টেলিভিশনের কাছ থেকে হতাশ হয়ে সরে যেতে নিজেকেই নিজে বলছে, ওই বদমাশ গুন্ডা লোচ্চা এলটাকে কেন দ্বীপান্তরে পাঠানো হচ্ছে না! কেউ কি নেই যে ওকে খুন করে শহীদ হতে পারে! ওরা আমার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে বাজি ধরে জিতছে, কিংবা হেরে যাচ্ছে। ওরা এই সময়ে, রাগে, হতাশায় চেয়ে দেখছে আমি উড়োজাহাজ থেকে নামতে–নামতে দু-হাত তুলে ওদের দেখাচ্ছি ছটা আঙুল। ছয় রাউন্ড–তার বেশি না। এবার এই লড়াইতে আমার প্রতিপক্ষের আয়ু ছয় রাউন্ড মাত্র। ওরা জানে, আমি কথা রাখব। ওরা চেঁচিয়ে বলে, নরকে যা, বেজন্মা! ওরা সব সাজ–বদল করা মানুষ। শূন্য ঘরে আমার ছবির দিকে তাক করে ওরা গুলি ছুড়ছে। রাস্তার মোড়ে–মোড়ে দাঁড়িয়ে বিক্রি করছে আমারই ছবি। ওরা আমাকে ভয় করে, ঘেন্না। করে, ভালোবাসে। ওরা সব সাজ বদল করা মানুষ। জানে না যে, যে এল–কে ওরা খুঁজে বেড়াচ্ছে আমি সে নই। সে নই।
আসলে আমি সেই শহরতলির রাস্তার ছোট্ট এল, যে পাথর কুড়িয়ে বেড়ায়, নিশানা ঠিক করে গাছে বা ল্যাম্পপোস্টে ছুঁড়ে মারে। কোন রাস্তায় যে সে যাবে তার কোনও ঠিক–ঠিকনাই নেই! একদিন গ্রীষ্মের এক সুন্দর সকালে যে এল পাথর কুড়িয়ে অভ্যাস মতো ছুড়বার আগে নিশানা ঠিক করে নিতে গিয়ে টের পেয়েছিল তার কোনও নিশানা, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বলতে কিছু নেই! রাস্তার একধারে তাদের কালো মানুষদের বস্তি, অদূরে বিশাল হাইওয়ের ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে গাড়ি চলে যাচ্ছে, আর এক পাশে–এল দেখেছিল–মিশনারি স্কুলের উঠোনে নীল ইউনিফর্ম পরা কালো মেয়েরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে বেদির মতো উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন মাদার–তাঁর সাদা পোশাক, মাথা ঢাকা আলগা ঘোমটার মতো কালো কাপড় তাঁর কাঁধ আর পিঠের ওপর পড়ে আছে, তাঁকে তাই পেঙ্গুইন পাখির মতো দেখায়। সাদা সুন্দর সেই পেঙ্গুইন পাখির মতো নান আর তাঁর সামনে প্রার্থনারত নীল পোশাক পরা কালো মেয়েদের সারি, একধারে হাইওয়ে আর অন্যদিকে তাদের নোংরা বস্তি–এইসব কিছুর ওপর সুন্দর সকালের আধ–ফোঁটা রোদ পড়ে আছে। কোনদিকে, কোথায় যে হাতের পাথরখানা ছুঁড়ে মারবে এল, ছোট্ট এল তো ভেবেও পেল না। তার কুড়ানো পাথর হাতে রয়ে গেল অনেকক্ষণ। সেই প্রথম সে বুঝতে পেরেছিল, তার সত্য কোনও লক্ষ্যবস্তুও নেই, কোনও ল্যাম্পপোস্ট, কোনও গাছই তার শত্রু নয়, তার হৃদয় ওই সকালের মতোই পবিত্র ও সুন্দর। তাই সে হাতের পাথরখানা আবার গড়িয়ে দিল রাস্তায়। না, কোনও কিছুকেই সে আর আঘাত করতে চাইল না। আমি এল, আমি সেই ছোট্ট এল, পাথর কুড়িয়ে নিয়েও যে আবার সে পাথর রাস্তায় গড়িয়ে দিয়েছিল একদিন।
এল, তুমি যখন হাঁটছ, তখন তোমার পায়ের অত শব্দ হয় কেন? চোরের মতো হাঁটতে শেখো, এল। নইলে একদিন ওই পায়ের শব্দই তোমার মৃত্যু ডেকে আনবে। এই কথা একদিন আমাকে বলেছিল সেই লোকটা যে ছিল একজন হাটুরে পটুয়া, যার কোনও ছবিরই দাম পঞ্চাশ সেন্টের বেশি ছিল না। যার ব্যাবসা ছিল ছবি নকল করে বিক্রি করা, যে লোকটা বিখ্যাত সব ছবি স্কেচ আর কপি করতে-করতে মাঝে-মাঝে ছুঁড়ে ফেলে দিত তার রঙের ব্রাশ আর তুলি, কখনও খেপে গিয়ে পাগলের মতো দেয়ালের গায়ে আবোল-তাবোল রং মাখাত, গভীর রাতে মদ খেয়ে বাড়ি ফেরার সময়ে যে আবেগ–ভরে গাইত নিগ্রো লোক–সংগীত! এই লোকটা ছিল আমার বাবা। হাতের রং ঝাড়নে মুছতে-মুছতে যে সবজান্তার মতো হেসে বলত, এল, চোরের মতো হাঁটতে শেখো, ঠিক চোরের মতো। সবসময়ে এই কথা ভেবে যে রাস্তার প্রতি মোড়ে, প্রতিটি দেয়ালের আড়ালে তোমার জন্য শান্তভাবে অপেক্ষা করছে বন্দুকের ব্যারেল, রিভলবারের নল, আঙুলের মধ্যে লুকোনো ধারালো ব্লেড, বুটের তলায় লাগানো লোহার নাল। অত অহংকার করে হেটোনা, অপরাধবোধ নিয়ে হাঁটতে শেখো, চোরেরা যেভাবে হাঁটে। ছায়ার মতো চলাফেরা করো, ভেবে নাও তোমার শরীর নেই, তুমি ছায়া মাত্র! ভাবতে-ভাবতে ক্রমে ক্রমে ছায়া হয়ে যেয়ো। পালাতে শেখো, খুব জোরে দৌড়োতে শেখো। দেখো, যেন পায়ের শব্দ না হয়, গলার শব্দ না হয়, তোমার হৃৎপিন্ড যেন খুব জোরে শব্দ না করে। জীবন–মরণ এল, এর ওপর তোমার জীবন–মরণ। বলতে-বলতে টপ করে হঠাৎ লাফিয়ে উঠত সেই পাগল পটুয়া, এল, পায়ের পাতার ওপর তুমি হাঁটতে পারো না? খুব গম্ভীর মুখে নিজেই সে হেঁটে দেখাত আমাকে, এইভাবে…ঠিক এইভাবে পায়ের শব্দ গোপন করা যায়। পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে হাঁটতে শেখো। তখন দেখবে তুমি দ্রুত হাঁটতে পারছ, শরীরকে ইচ্ছে মতো হালকা করে নিতে পারছ। আবার কখনও কখনও লোকটা চোখ পিটপিট করে আমার দিকে চেয়ে থেকে খুব হতাশ হয়ে বলত, হায় এল, তুমি এত লম্বা–চওড়া কেন? ভিড়ের ভিতরে তোমাকেই যে সকলের আগে চোখে পড়ে যাবে! হায়, তুমি আরও ছোট খাটো হলে না কেন, আরও রোগা, আরও বিষণ্ণ হলে না কেন, এল?
