অফিস থেকে ফিরে এসে প্রায় সময়েই সে একটু রাতের দিকে এই আধখানা ঘরটায় এসে বসে সিগারেট খায় আর ভাবে। ছুটির দুপুরে এখানেই এসে মেঝেয় পড়ে ঘুমোয়।
গ্রীষ্মকাল পড়ে গেছে। রবিবার। বেলা করে খেয়ে অনিকেত চুপচাপ চলে এল দেড়তলার ঘরখানায়। একাবোকা শুয়ে থাকল মেঝেয় শতরঞ্জি পেতে। একটা সিগারেট শেষ হয়েছে, আর একটা ধরাবে কি না ভাবতে-ভাবতে ঘুমের আমেজ চলে এল। ঘুম আসার এই সময়টা বড় ভালো লাগে অনিকেতের। বাস্তবের সঙ্গে স্বপ্ন কেমন গুলিয়ে যায়। এসব ব্যাপারগুলো আছে। বলেই মানুষের বেঁচে থাকাটা একরকম সওয়া যায়।
ঘুমঘোরে অনিকেত আবোল-তাবোল আধোচেতনায় অনেক হিজিবিজি দেখছিল। এ সময়ে একটা ঠুনঠুন শব্দে চটকা ভাঙল তার। পাশ ফিরে দেখল, একটা ধেড়ে ইঁদুর একটা বেশ বড়সড় প্রদীপের মতো কী একটা জিনিস টেনে এনেছে মেঝেয়। প্রদীপটা তাদের নয়, অনিকেত জানে। বোধহয়, বাড়িওয়ালার গুদামঘরটা থেকেই এনেছে। “যাঃ, যাঃ” বলে তাড়া দিতেই ইঁদুরটা প্রদীপ ফেলে পালিয়ে গেল।
অনিকেতের কাছ থেকে খুব দূরেও নয় প্রদীপটা। সে হাত বাড়িয়েই নাগাল পেল। হাতে তুলে নিয়ে দেখল, বেশ ভারী। ‘সলিড মেটাল! সোনা-টোনা নয়তো!’ বলে হাতলওয়ালা মস্ত প্রদীপটা একটু নাড়াচড়া করল সে। প্রদীপটার গায়ে ময়লা পড়েছে বহুদিনের। এটা যে দীর্ঘকালের ব্যবহার হয়নি তা দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু জিনিসটা সুন্দর। এখনও বেচে দিলে পাঁচ-দশ টাকা পাওয়া যাবে। অবশ্য বেচবার কথা এমনিই ভাবল সে। বেচবার প্রশ্নও ওঠে না। অন্যের জিনিস। কিছুক্ষণ প্রদীপটা হাতে নিয়ে শুয়ে রইল সে। হঠাৎ মাথায় ভাবনা এল—আচ্ছা, এটা যদি সেই আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হত। যদি এটাতে হাতে ঘষলেই এখন একটা দৈত্য এসে দাঁড়ায় আর বলে—কি চাও বলো, এক্ষুনি এনে দিচ্ছি!
ভাবনা-চিন্তারও একটা শক্তি আছে। অনিকেত উঠে বসল। যদি সত্যিই এরকম কিছু হয়। যদিও বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এসে এসব বিশ্বাস কোনও কাজের নয়, তবু যদি হত! অ্যাঁ! যদি হত?
প্রদীপটা হাতে নিয়ে আঙুলে একটা ঘষা দেয় সে। একা ঘরেও তার হাসি পাচ্ছিল, আর বোকা-বোকা লাগছিল নিজেকে। জানে তো এসব সত্য নয়। এরকম হয় না তবু সে কয়েকবার প্রদীপটার ভিতর দিকে ডান হাতের বুড়ো আঙুল জোরে বারকয়েক ঘষা দিল।
না, কিছুই ঘটল না। কিন্তু হঠাৎ ভেজানো দরজাটার কড়া খুটখুট করে আস্তে নড়ে উঠল। ঝুমুর এল নাকি চা নিয়ে? চট করে হাতের ঘড়িটা দেখে নিল অনিকেত। না, ঝুমুর এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে না। মোটে দুটো পঁচিশ।
–কে?
উত্তর নেই।
অনিকেত প্রদীপটা রেখে গিয়ে দরজা খুলে অবাক। খুব লম্বাচওড়া আর খুব দামি পোশাকপরা একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত ছ’ফুট তিন-চার ইঞ্চি লম্বা তো হবেই। বিশাল কাঁধ, প্রকাণ্ড বুক, ইয়া চওড়া হাতের কবজি। বিদেশি সিনথেটিক কাপড়ের সাদা স্যুটপরা গলায় টাই, মৃদু একটা ইনটিমেট সেন্টের গন্ধ ছড়াচ্ছে লোকটার গা থেকে। বোধহয় বকসিং বা কুস্তি করে। কিন্তু খুব ফরসা আর সুপুরুষ, মুখে মৃদু বিনীত একটু হাসি।
অনিকেতকে দেখেই দু-হাত জড়ো করে বলল—আমাকে চিনবেন না। আমি প্রদীপের দৈত্য।
অনিকেত বলল—প্রদীপ দত্ত? প্রদীপ দত্ত! আপনার সঙ্গে কোথাও কী পরিচয়—?
লোকটা মাথা নেড়ে বলল—প্রদীপ দত্ত নয়। প্রদীপের দৈত্য! আপনি এক্ষুনি ওই প্রদীপটা ঘষেছিলেন, তাই না?
স্তম্ভিত অনিকেত মাথা নাড়ল—আজ্ঞে হ্যাঁ।
লোকটা বলল—তাই আসতে হল। বলুন, এখন আপনার জন্য কী করতে পারি?
যদিও অনিকেত বিশ্বাস করতে পারছিল না, লোকটাকে, তবু বলল—ভিতরে আসুন।
প্রকাণ্ড এবং সুপুরুষ লোকটা মাথা নীচু করে ঘরে এল। চারিদিকে চেয়ে বলল—ঘরটা— ভীষণ ছোটো আর স্টাফি, এই ঘরে থাকেন কী করে?
—অভ্যেস। তা ছাড়া পাচ্ছিই বা কোথায়?
লোকটা অনিকেতের সোফা সেটে পা ছড়িয়ে বসল, কিন্তু মুখে সেই অতিবিনীত হাসি আর হাবভাবে নম্রতা ছড়িয়ে আছে।
অনিকেত মুখোমুখি বসল, তার সস্তা সিগারেটের প্যাকেটটা লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল—আমরা গল্পে পড়েছি, আশ্চর্য প্রদীপ ঘষলে তার ভিতর থেকে ধোঁয়ার মতো বিশাল চেহারার দৈত্য বেরিয়ে আসত। এই বড়-বড় দাঁত, তালগাছের মতো উঁচু চেহারা!
লোকটা সিগারেট দেখে হাতজোড় করে বলল—ওটা পারব না মিস্টার বোস। এখন থেকে আপনি আমার বস। বসের সামনে ধূমপান করাটা বেয়াদবি।
অনিকেত খুশিই হল। প্যাকেটে গোনাগুনতি ছ’টা সিগারেট আছে, আজ আর কিনবার কথা নয়। একটা ফালতু খরচ হয়ে গেলে অসুবিধে হত। সকালে চায়ের পরের সিগারেটটায় টান পড়ত।
লোকটা বলল, হ্যাঁ, যে কথা জিগ্যেস করছিলেন। চেহারার কথা তো! সেই ধোঁয়ার মতো বড় নিয়ে দেখা দিলে, আপনিও খুশি হতেন না, পাঁচজনে চেঁচামেচিও করত। তা ছাড়া ইভোলিউশন বা বিবর্তন বলেও তো একটা কথা আছে। তাই যে-যুগের যেমন দরকার, তেমনি হয়েই আমাকে আসতে হয়। ক্লায়েন্টরা ঘাবড়ে গেলে বা হার্টফেল করলে ফায়দা কী? বলে লোকটা হাঁ করে দাঁতগুলো দেখিয়ে বললেন—এই দুপাশে দুটো মস্ত দাঁত ছিল, সব ছোট করে ফেলেছি স্ক্রেপ করিয়ে। এ যুগে ওসব প্রি-হিস্টোরিক দাঁত কি চলে?
অনিকেতের নিজের এখন সিগারেট খাওয়ার কথা নয়। একটু আগেই খেয়েছে। হিসেব করে না চললে!
