দ্বিধাগ্রস্ত মধুশ্রী দরজা মেলে ধরে বলল , এসো।
শান্তশীল ঘরে ঢুকল। মস্ত বড় বসবার আর খাওয়ার ঘর। ইন্টিরিয়র ডেকরেটর দিয়ে সাজানো হয়েছিল। অবিশ্বাস্য রকমের চকচকে। এত সাজানো যে, এই অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে তেমন স্বস্তি হয় না।
শান্তশীল ঘরে ঢুকে বুঝল, মধুশ্রী ভীষণ রকমের নার্ভাস। মুখ বিবর্ণ।
শান্তশীল খুব ঠান্ডা মাথায় বলল , আমি একটু বাথরুমে যাব।
ওঃ, আচ্ছা।
শোওয়ার ঘরের দরজাটা আপনা থেকেই কি বন্ধ হয়ে গেল? নিঃশব্দে? শান্তশীল একটু থামল। মধুশ্রীর দিকে চেয়ে বলল , দশ মিনিটের জন্য।
অ্যাঁ?
দশ মিনিটের জন্য বাথরুমে গেলে তোমার হবে তো? মধুশ্রী অবোধ জন্তুর মতো চেয়ে রইল। বোবা।
দশ মিনিটের বেশিই সময় নিল শান্তশীল। বুকটায় আবার ভার। একটা ঘুনঘুনে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছে বুকে। বেসিনে উপুড় হয়ে শান্তশীল মুখেচোখে জলের ঝাঁপটা দিল অনেকক্ষণ। তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছবার সময় টের পেল, শরীর ভেঙে আসছে ক্লান্তিতে, অবসাদে। কিন্তু ঈর্ষা নেই, ক্রোধ নেই, অপমান নেই।
যখন বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল শান্তশীল তখন মধুশ্রীর মুখ বিবর্ণ, চোখে ভয় তবে সামলে নিয়েছে অনেকটা। হাউসকোটের বোতাম ঠিকঠাক লাগানো, চুল এলোখোঁপায় বাঁধা, শুধু বাঁ গালে একটা দাঁতের দাগ জ্বলজ্বল করছে। সামান্য পাউডারের প্রলেপ সেটা ঢাকতে পারেনি।
শান্তশীল এই শরীরে কী করে নার্সিংহোম থেকে চলে এল, কেন এল এইসব জরুরি প্রশ্ন মধুশ্রী করল না। সে শান্তশীলের দিকে তাকাতেই পারছেনা।
শান্তশীল বাইরের ঘরেই সোফায় বসল। বুকে ঘনিয়ে উঠছে ব্যথা। ঘাম হচ্ছে। ঘাড়ে দপদপ করছে একটা রগ। মাথার মধ্যে চক্কর। তবু শক্ত গলায় বলল , বিছানার চাদরটা পালটে দাও। যাও।
মধুশ্রী ছুট পায়ে চলে গেল।
শান্তশীল বুকে হাত রাখল। দুষ্ট হৃদযন্ত্র এখনও রক্ত পাম্প করে যাচ্ছে। কিন্তু বড্ড দ্রুত। বড্ড বেশি দ্রুত। কান ঝাঁঝা করছে। সে কি মরে যাচ্ছে?
মাথাটা একবার ঝাঁকাল শান্তশীল। একবার ককিয়ে উঠল। তারপর হঠাৎ টের পেল, তার ভারী ঈর্ষা হচ্ছে। ভীষণ। তার রাগ হচ্ছে। তার খুন করতে ইচ্ছে করছে–
মধুশ্রী যখন তাকে নিতে এল ঘরে তখন এলিয়ে পড়ে আছে শান্তশীল। চোখ বোজা। ঘামে ভিজে যাচ্ছে গা।
মধুশ্রী ফোনের কাছে ছুটে গেল।
শান্তশীল তার যন্ত্রণার মধ্যেও বুদ্ধের মতো শান্ত গলায় বলল , আমি ভালো আছি। ফোন কোরো না। বরং কিছু খেতে দাও।
খুব ধীরে-ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল মধুশ্রী। তারপর স্বামীর দিকে ফিরে তাকাল।
শান্তশীল মৃদুস্বরে বলল , আরোগ্য।
কিছুই বুঝল না মধুশ্রী। শুধু মনে হল, তার পাথরের মতো প্রতিক্রিয়াশীল স্বামী বোধ হয় আসলে রক্তমাংসেরই মানুষ।
আশ্চর্য প্রদীপ
অনিকেত চাকরি করে একটা আধা-বিদেশি ফার্মে, কেটেকুটে নিয়ে মাসে বেতন পায় সাতশো ছাব্বিশ টাকা। তার মধ্যে বাড়ি ভাড়াতে যায় একশো আশি, দুধ পঞ্চান্ন, ঝি পনেরো। খবরের কাগজ, ইলেকট্রিসিটি, ছেলের ইস্কুলের মাইনে এসব বাদ-সাদ গিয়ে হাতে যা থাকে তা দিয়ে বেঁচে থাকা যায়। তার বউ ঝুমুর আবার একটু বড়লোকের মেয়ে। খুব বড়লোক নয়, তবে কলকাতায় বাড়ি আছে, ওর এক দাদা গাড়িও কিনেছে। ঝুমুর তাই একটু নাক-উঁচু। প্রায়ই বলে —গ্যাসের উনুন কেনো। কিস্তিবন্দিতে একটা ফ্রিজ কেনা যায় না? বাইরের ঘরটায় ভাড়ার টেবিল ফ্যান রেখে মাসে-মাসে টাকা গচ্চা যাচ্ছে, একটা পাখা কিনলেই তো হয়।
ঝুমুর এসব বলে-বলে অনিকেত রাগ করে না। বরঞ্চ তার মনের মধ্যেও ওসব ইচ্ছে হয়। নিজস্ব পাখা, গ্যাসের উনুন, ফ্রিজ এসব আজকাল মধ্যবিত্ত ঘরেও দেখা যায়। তার বন্ধুদেরও অনেকের আছে। একটা তিনশো টাকার ইনক্রিমেন্ট যদি দৈবক্রমে পেয়ে যেত তাহলে বেশ হত। কিন্তু সে আশা নেই। বরং এবছর নাকি বোনাসও কমে যাবে। মনটা নিশপিশ করে। বড্ড গরিবিয়ানামতে তারা থাকে। অনেকদিন ধরে ভালো জামা-প্যান্টও করায় না সে। কত নতুন ধরনের প্যান্ট-জামার কাপড় বেরিয়েছে গত এক বছর ধরে।
পুরোনো বাড়ি ছেড়ে মাসচারেক হল অনিকেত নতুন বাড়িতে এসেছে বন্ডেল গেটে। নতুন বাড়ি বলতে কিন্তু বাড়িটা নতুন নয়। বরং বেশ পুরোনো বাড়ি। দেড়খানা একতলার ঘরের জন্য একশো আশি টাকা গুনতে হয়। এর আগে শেয়ালদার কাছে ছিল, দুখানা ঘরের ভাড়া একশো দশ। কিন্তু ছেলেটাকে সাউথের ভালো স্কুলে ভরতি করার পর থেকেই ঝুমুর সাউথে আসার জন্য। অস্থির। তাই আরও সত্তর টাকা মাসিক গুনাগার দিয়ে চলে আসতে হয়েছে দক্ষিণে। ছেলের ইস্কুলটাই এখন বড় কথা।
বাড়িটা ভালো লাগে না অনিকেতের। বড্ড অন্ধকার। একটা ঘর নীচের তলায়, আর আধখানা ঘর পেয়েছে গ্যারেজের ওপর। গ্যারেজের ওপরকার ঘরটা বড়ই ছিল, বাড়িওয়ালা দেওয়াল তলে সেটাকে দু-টুকরো করে বাকি আধখানা ঘরে তার অনেক পুরোনো জিনিসপত্তর ডাঁই করে রেখেছে। তবু এই ঘরটায় কিছু আলোবাতাস আসে। অনিকেত এটাকেই তার বসার ঘর করেছে, যদিও তার বাসায় লোকজন বড় আসে না। অনিকেতও কাউকে ডাকে না। লোকজন এলে ভদ্রতা-টদ্ৰতা করতে ঝুমুর বড় খুশি হয় না। বউয়ের খুশিটাই তো এখন বড় কথা।
অনিকেত খুব ভাবতে ভালোবাসে। বলতে কি ভাবাটাই হচ্ছে তার সবচেয়ে প্রিয় নেশা। একটা সিনেমা দেখল, কি একটা বই পড়ল, অমনি সিনেমা বা বইয়ের গল্পের সুতো ধরে কত কী চিন্তা তার মাথায় মায়াজাল ছড়িয়ে দেয়। আর সেসব চিন্তার মধ্যে প্রধান হয়ে দাঁড়ায় একটা চিন্তা—আমার যদি অনেক টাকা থাকত!
