–বন্দুক? বন্দুকের ভয় পাও নাকি রে বাসি? তা হইলে আর কাজটা করলা কী?
–না মশয়, পাঁচ-সাত টাকায় আমার পোষাইব না।
–কত চাও?
–পঞ্চাশ টাকা দিলে ভাইব্বা দেখতে পারি।
পঞ্চাশ? পঞ্চাশ দিলে আর কানুর থাকে কী? সে বলল , এক বিঘা জমির দাম চাও?
–আমি চামু ক্যান? আপনে চুরিধারি করেন নাই, আপনে বুঝবেন ক্যামনে চোরের কাম কত কঠিন।
–আইজ্ঞা, বিশটাকাই দিমু।
–আপনার এত পয়সা হইল কবে? করেন তো পুরুতগিরি।
–আরে কাম আমার না, আমি নিমিত্ত মাত্র।
–হেইরে বুঝছি। আপনার পিছনে কেডা আছে কন তো।
–কওন যাইব না হে।
–তা হইলে মাপ করবেন মশয়, পারুম না।
–পোষাইল না নাকি হে? কামটা তো কঠিন না হে। একখান তরোয়াল বাইর কইরা আনবা।
–বন্দুক ফুটাইলে তো প্রাণটা আপনার যাইব না, যাইব তো আমার। বালবাচ্চা লইয়া ঘর করি মশয়, গুল্লি খাইয়া মারতে পারুম না।
লাটুকে যতটা বীর ভেবেছিল কানু, ততটা বীর সে নয় দেখে একটু হতাশই হল। সন্ধেবেলা ফের পরেশ ঘোষের কাছে এসে বলল , না ঘোষমশয়, লাটু একখান ভেড়ুয়া।
পরেশ ঘোষ তামাকটা একটু ঘন ঘনই খায়। উত্তেজিত হলে টানটাও দেয় উপর্যপুরি। বেশ কিছুক্ষণ তামাক খেয়ে বলল , তুমিই একবার চেষ্টা কইরা দেখবানাকি?
আজ ফুলকপি সাঁতলানোর মাতাল গন্ধটা আসছিল। আহা, নতুন কপি, তার গন্ধই আলাদা। ঘোষের কথাটা কানেই গেল না। ফুলকপির গন্ধ কথাটা খেয়ে নিল।
–কিছু কইলেন নাকি ঘোষমশয়?
–কইলাম। ঠেকায় পড়লে মাইনষে কী না করে?
–যা কইছেন। কিন্তু কামটা কী?
–লাটুর বদলে তুমিই লাইমা পড়।
–বুঝাইয়া কন।
–আরে, কৃষ্ণও তো ননী মাখন চুরি করত। করত না?
–আইজ্ঞা।
–হেই কথাই কই। তুমি চালাক মানুষ, লাটু পারলে তুমিই বা না পারবা ক্যান? রাসুর বাড়ির তো ঝুরঝুরা অবস্থা, বিড়ালের লাথিতে কপাট ভাইঙ্গা পড়ে। আমি কই রাত বিরাইতে গিয়া যদি ভিতরে ঢুইক্যা পড়, কাম ফরসা।
কানু গোঁসাই বিষণ্ণ মুখ করে বলল , চোরও হইতে কন? এই দুই হাতে পূজা করি।
–শোনো হে বাপু, মূল্য দিলে দোষ থাকে না। চুরি তো নিজের লিগ্যা করবা না, আমার লিগ্যা করবা। তার মূল্য ধইরা দিলে আর দোষ থাকব না। তুমি নিমিত্ত মাত্র।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কানু বলে, আমি গরিব ঠিকই, তবে পইচ্যা যাই নাই ঘোষমশয়।
–চুরির বুদ্ধিটা কিন্তু তুমিই দিছিলা।
–তা দিছিলাম।
–তা হইলে আমার দোষ কী কও।
–দোষ আমার কপালের।
–চেইতো না হে গোঁসাই। মাথা ঠান্ডা কর।
–চেতি নাই। ভাবতাছি আসলে কথাটা কইলেন কেমনে। গরিবরে কি হলই কওন যায়?
–দোষের কথা কিছু কই নাই। মাথা ঠান্ডা কইরা ভাবলেই দিশা পাইবা। যাউকগা, কাজটা তো উদ্ধার করতে হইব। একখান বুদ্ধি বাইর কর।
কানু গোঁসাই ফের ফুলকপির গন্ধ পাচ্ছিল। এবার ঝোলের গন্ধ। নতুন আলু দিয়েই বোধ হয় হচ্ছে ঝোলটা। কই মাছ দিয়ে কি? হতেও পারে। ফুলকপি দিয়ে কই মাছ দেবভোগ্য। একটা ঢোঁক গিলে ফেলল কানু গোঁসাই।
–কিছু ভাবলা গোঁসাই? আগে ব্রাহ্মণরাই আছিল পরামর্শদাতা। তাগো বুদ্ধিতেই সমাজ চলত। তাগো ট্যাকে পয়সা নাই, গায়ে জোর নাই, কিন্তু বুদ্ধি আছিল ক্ষুরধার।
–আইজ্ঞা।
–কামটা উদ্ধার কইরা দাও গোঁসাই।
–রামপদর কি খুবই বিপদ ঘোষমশয়?
–বছরে ব্রাউন সাহেবের টার্ন ওভার জানো? লাখ টাকার ওপরে। রামপদ কম কইরাও বছরে ত্রিশ চল্লিশ হাজার টাকা কামায়। ব্রাউন যদি তারে ছাড়ে তা হইলে রামপদরে গলায় দড়ি দিতে হইব। বোঝলা?
–মেলা টাকা।
টাকার গল্প শুনতে কানু গোঁসাই খুবই ভালোবাসে। রামপদ বছরে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা কামায় শুনে কান জুড়িয়ে গেল। বড়লোকের দুঃখ সে সইতে পারে না। বড়লোকেরা তো আর এমনি–এমনি বড়লোক হয়নি, ভগবান তাদের দিয়েছেন বলেই না তারা বড়লোক।
পরেশ ঘোষ কোটা মুখ থেকে সরিয়ে বলল , হ, মেলা টাকা। এখন তুমিই কও গোঁসাই, ব্রাউন সাহেব রামপদরে ছাড়লে রামপদ যদি গলায় দড়ি দেয়, তা হইলে তার বইন আমারে পিছার বাড়ি না দিয়া ছাড়ব?
–ব্রাউন সাহেব তিন হাজার টাকার ওপরে উঠব?
–কইতে পারি না। তবে তিন হাজারে যে উঠেছে এইটাই আমার বিশ্বাস হইতে চায় না।
–সমস্যা কী জানেন? রাসুবাবু টাকারে টাকা মনে করে না। ছিড়া ত্যানা পইরা থাকলেও অহঙ্কার যায় নাই।
–ঘাড় ত্যাড়া হারামজাদা। একখান জং ধরা তরোয়াল পইড়া আছে, হেইটা দিয়া তর হইব কী রে নিব্বইংশার পো?
–এয়ারলিংনা কী জানি কইছিল।
–হ, এয়ারলিং না ঘোড়ার ডিম।
তরোয়ালখান অর ইসের মইধ্যে ঢুকাইয়া দিতে পারলে মেজাজটা আমার ঠান্ডা হইত।
–আইচ্ছা, ঘোমশয়, রামপদর বিয়া দিতে আছেন না ক্যান? সাতাইশ-আটাইশ বছর বয়স তো হইল।
–নবাবপুত্তুর বিয়া করলে তো? কইয়া দিছে বিয়া টিয়া করব না, কেবল টাকা কামাইব। টাকারেই বিয়ে করছে ধইরালও।
হ্যাঁ, কইমাছই বটে। এইবার ঝোলের গন্ধে কই মাছের গায়ের গন্ধও যেন পেল কানু গোঁসাই। কই মাছের সঙ্গে ফুলকপির বিয়েটা যেন রাজযোটক। নাঃ, আর বসে থাকলে কচুর ঝোল আর ভাত মুখে রুচবে না। কানু উঠে পড়ল।
–গেলা গিয়া নাকি? –
-আইজ্ঞা।
–খাড়াও, তোমারে কিছু দিই।
আজ দুটো টাকা এল হাতে। খারাপ কী!
পরদিন বাইশপুরের ঘাটে গিয়ে রামপদকে ধরল কানু। ধরা সোজা কথা নয়। রামপদ ব্যস্ত মানুষ। মালের স্টিমারে এখানে সেখানে বেঘোরে ঘুরতে হয়। তাকে ধরতে তিন চার জায়গায়। হানা দিতে হল কানুকে। শেষে খবর পেল, ব্রাউন সাহেবের লঞ্চ বাইশপুরের ঘাটে মাল নামাচ্ছে। রামপদ সেখানে। দুপুরে সেইখানে গিয়ে হাজির হল কানু। রামপদ দাঁড়িয়ে পাটের গাঁট গুনছিল। গোনা শেষ করতে সময় লাগল। ততক্ষণে নদীর ঠান্ডা হাওয়ায় ফের শীত ধরে গেছে কানুর।
