রাসুর লগে না পাইরা অখন আমার শালা রামপদরে ধরছে সাহেব। যত টাকা লাগে লাগুক, তরোয়ালখান তার লাগব।
–সাহেব কততে উঠব?
–ওই যে তোমারে যা কইয়া দিছি, তিন হাজার। তিন হাজারে ষাইট বিঘা জমি হয়। সোজা কথা নাকি? সাহেবটা পাগল বইল্যা শ্যান টাকাটা জলে ফালাইতে চাইত্যাছে।
খিদেটা হঠাৎ যেন উধাও হল কানু গোঁসাইয়ের। টাকার কথা শুনতে তার ভালোই লাগে। একটা তরোয়ালের এত দাম হতে পারে তা তার ধারণায় ছিল না। সোনার কাজ করা, রুপোর খাপে মোড়া তরোয়ালটা নাকি রাসুদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি। বিস্তর পুরোনো। কিন্তু দামটাও বেজায় বেশি হয়ে যাচ্ছে।
সে বলল , সাহেবটা পাগলই।
–আর কইও না। সাহেব কইছে, তরোয়ারলখানা না পাইলে রামপদর লগে আর কারবারই করব না। আর হেই লিগ্যাই রামপদর গুণধরী বইন, আমার অর্ধাঙ্গিনী আমারে উঠতে বইতে তিষ্ঠাইতে দিতাছেনা।
–রামপদ নিজে যায় না ক্যান?
–গেছিল। খেদাইয়া দিছে।
–খেদাইয়া দিল ক্যান? রামপদ তো আর আমার মতো ছাতামাতা মানুষ না।
–আর কইওনা হে গোসাই। রামপদ একটা বলদামি কইরা ফালাইছিল। গিয়া কথায় কথায় কইয়া ফালাইছে পরেশ ঘোষ আমার ভগ্নীপতি। ভাবছিল আমার নাম কইলে রাসু ভড়কাইব। আর যাইবা কই? এই মারে কি সেই মারে। কইছে কী জানো?
–আইজ্ঞা, ভালো কথা না নিশ্চয়ই?
–কইছে তোমরা ভগ্নীপতির বংশ খারাপ, তোমার ভগ্নীপতি হারামি, আরও কত কথা। মুখ তো না, ফ্যান ছিটাল।
–আইজ্ঞা, রাসুবাবুর বায়ু একটু চড়া। হইব না ক্যান কন। কত বড় বংশ অ্যাছিল। হাতি ফান্দে পড়ছে ঠিকই, তবে অখনও হামবড়াইটা তো যায় নাই।
–আরে রাসু হইল ফোতত কাপ্তান। অর আছেটা কী? বংশ ধুইয়া কী জল খাইব?
–আইজ্ঞা, কথাটা ঠিকই। শোনলাম গত মাসেও পঞ্চাশবিঘা জমি বেইচ্যা কর্জ শোধ করতে হইছে। সোনাদানাও বোধহয় আর বেশি কিছু নাই।
–আরে, থাকব কইথিকা? বেইচ্যা-বেইচ্যাই তো এতকাল খাইল। অকাল কুষ্মাণ্ড আর কারে কয়? তবু ফুটানি ছাড়ে না।
–আইজ্ঞা, যা কইছেন।
মাছের ঝোল নেমে গেছে উনুন থেকে। এবার একটা সোনামুগ ডালের গন্ধ ছড়াচ্ছে। জ্বালাতন আর কাকে বলে। এ সব গন্ধের পর বাড়ি ফিরে কচুর ঝোল দিয়ে আউস চালের মোটা ভাত কি মুখে রুচবে?
–কিছু দিবেন নাকি ঘোষমশায়?
পরেশ কোটা বাঁশের খুঁটির গায়ে ঝুলিয়ে রেখে বলল , আরে রও দিমু। কিন্তু কামটা উদ্ধার কইর্যা দাও।
–ক্যামনে?
–য্যামনে পারো। কথার লড়চড় হইব না। যদি তরোয়ালখানা বাগাইয়া আনতে পারো, তোমারে কড়কড়া পঞ্চাশটা টাকা দিমু।
–পঞ্চাশ?
–ক্যান, পঞ্চাশ কি কম হইল?
–আইজ্ঞা না, কথাটা ভালো শুনতে পাই নাই বইলাই আর একবার শুইন্যা নিলাম।
–যাওন আহনের খরচা আলাদা দিমু। কিন্তু কামটা উদ্ধার কইরা দাও। রামপদ পরশু দিন আইয়া মেলা কাকতি মিনতি কইরা গেছে। সাহেব যদি তারে খেদায় তবে তার গণেশ উল্টাইব। খোঁটার জোরে যেমন মেড়া কোন্দে, তেমন আমাগো রামপদ কোন্দেব্রাউনের জোরে।
–বুঝছি।
–আরও একটু বুইঝা যাও। এই যে কালি মাগিরে লইয়া ঘর করি সেই মাগি কিন্তু আমারে খাবলাইয়া খাইত্যাচে। তার ভাইরে উদ্ধার করতে না পারলে আমার আর শান্তিতে ঘরে বইয়া তামুকটুকু খাওনেরও উপায় থাকব না। কাজ কারবার লাটে উঠব। বোঝলা?
–ভাবতে দ্যান।
–বেশি ভাবতে হইব না। আমি জানি তুমি বুদ্ধিমান লোক। উপায় একটা করতে পারবাই।
–একটা চোরারে কামে লাগামু ঘোষমশায়? –চোর! কও কী?
–আইজ্ঞা, এই মাইনকা টিপি থিক্যা রক্ষা পাইতে হইলে আর উপায় কী? লাটু দাসেরে চিনেন?
–হবিবগঞ্জের লাটু নাকি?
–আইজ্ঞা। তারে লাগাইলে হয়। ব্যাটার খুব নামডাক। আমার লগে চিনা আছে। পরেশ পাল মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলল , আরে বাঃ, এই মতলব তো আমার মাথায় আসে নাই হে গোঁসাই? তা হইলে তারেই লাগাও।
–দশ বিশটাকা খর্চ লাগব কিন্তু।
–ঠিক আছে। জিনিসটা আইন্যা আগে আমার হাতে দাও। খর্চ তো আছে। খাড়াও, তোমার দক্ষিণাটা দিতাছি।
মুগডালের গন্ধ তীব্র হচ্ছে। এ তো শুধু সেদ্ধর গন্ধ। এরপর ফুটন্ত ডালে জিরেবাটা, আদাবটা আর হলুদ পড়বে। তারপর পড়বে ঘি দিয়ে জিরে ফোড়ন। ওঃ, তখন যা গন্ধ ছাড়বে না, গোলাপ ফুলকে বলবে ওদিকে থাক।
পাঁচটা টাকা আশা করেনি কানু গোঁসাই। দুটো-একটা টাকাই জোটে। আজ পাঁচ টাকা পেয়ে বুকটা নেচে উঠল।
–গোঁসাই, কাইল সকালেই গিয়া লাটুরে ধইরা ফালাও। দেরি কইরো না। সাহেবের মতিগতি কুনদিন বদলাইয়া যায় ঠিক কী?
কানু গোঁসাই উঠে পড়ল। তার ট্যাঁকে ঘড়ি নেই ঠিকই, কিন্তু সময়ের আন্দাজ আছে। এখন রাত বড় জোর নটা। এ সময়ে চাঁদিপুরের রতন জেলে নদীয়াল মাছ ধরে এনে ঘাটে বসে। ভাগ বাঁটোয়ারা করে। অনেক সময়ে পাওয়া যায়। চার-ছ’আনার মাছ কিনতে পারলে আজ রাতে পেট ভরে দুটো ভাত খাওয়া যাবে।
–সে বলল , তা হইলে আসি গিয়া ঘোষমশয়।
–আহ গিয়া। মনে থাকে য্যান–
না, মাছ পেল না কানু গোঁসাই, ঘরে ফিরে ঠান্ডা ভাত আর মানকচুর ঝোলই খেতে হল। তা হোক, পকেটে পাঁচটা টাকা থাকায় আজ তেমন খারাপ লাগল না। মনটা নাচলে সবই ভালো লাগে।
মনের নাচ বন্ধ হল যখন হবিগঞ্জের ঘাটে লাটুর সঙ্গে দেখা হল পরদিন দুপুরে। রোগা ছোটখাটো চালাক চেহারার লাটু কথাটা শুনেই বলে উঠল, খ্যাফচেন নাকি গোঁসাই? রাসুবাবুর যে বন্দুক আছে হেইটা নি জানেন?
