–রামপদ, কথা আছে।
–আসেন গোঁসাইদা, লনচে আইস্যা বসেন।
–বহনের সময় নাই। মেলা কাম।
–কী কাম?
–তোমারই কাম। ব্রাউন সাহেবের তরোয়ালখান লইয়াই কথা।
রামপদর মুখ উজ্জ্বল হল, কিছু উপায় করলেন? সাহেব তো আমার মাথা খাইয়া ফালাইল। কইয়া দিছে এক মাসের মইধ্যে তরোয়াল না পাইলে আমারে ত্যাজ্যপুত্র করব।
–আমার লগে তোমারে একখানে যাইতে হইব।
–কোনখানে?
–যেইখানে লইয়া যামু। যা কই শোনবা।
–তা যাইতে পারি। বাইশপুর থিক্যা মাল উঠব। লঞ্চ খান দুই দিন এইখানেই থাকব।
–তা হইলে লও, অখনই বাইর হইয়া পড়ি।
–চলেন। তার আগে নদীতে ডুব দিয়া চাইট্টা ভাত খাইয়া লই। আপনেও আসেন, কাজরী মাছের ঝোল দিয়া ভাত।
অনেকদিন পর কাজরী মাছ। জিব থেকে পেট অবধি যেন পদ্মার ঢেউ খেলে গেল আজ কানুর।
–যাইবেন কই গোঁসাইদাদা?
–রাসুর কাছেই যামু।
–সর্বনাশ, আমারে দ্যাখলে তো তার ঊনপঞ্চাশ বায়ু কূপিত হইব।
–জানি, তবে তোমর লিগ্যা একখান শ্যাষ চেষ্টা তো করতে হইব। তোমার ভগ্নীপতিও ঠেকায় পড়ছে তোমারে লইয়া। মাইনকা ঢিপি।
–আইজ্ঞা। তরোয়ালখান না পাইলে সাহেব যে কী করব আর না করব তার ঠিক নাই। আমার সোনার কারবার ছারেখারে যাইব গোঁসাইদা।
–বুঝছি। অখন লও, এখখান ডিঙ্গা ভাড়া করো। রাসুর গ্রাম বেশ দূরে না।
ডিঙেয় বসে কানুর একটু ভাতঘুম হল। তার ফাঁকে-ফাঁকে রামপদর কিছু দুখের কথা। বড়লোকের দুঃখ কানুর ঠিক সয় না। দুঃখ–টুঃখ যা কিছু তা এই তার মতো গরিবরাই করবে। বড়লোকদের দুঃখ হওয়ার দরকার কী? ভগবান তো তাদের দুঃখ করার জন্য পাঠাইনি। এই সাদা সাপটা ব্যাপারটা কানু পাকা বুঝেছে।
রাসুর দেখা পাওয়া গেল তার বাগানে। খুরপি হাতে বাগানে ফুলগাছের জমি উসকোচ্ছে। বিশাল বাগান, বিশাল বাড়ি তবে পড়তি অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়। বাড়ির গায়ে চাপড়া খসে পড়ে খোস পাঁচড়ার মতো দাগ। বাগানের ঘের–পাঁচিল বহু জায়গায় ভেঙে পড়েছে, সেখানে কঞ্চির বেড়া দেওয়া। না, রাসুর অবস্থা খারাপই। শুধু হামবড়াই ছাড়া কিছু নেই।
–নমস্কার রাসুবাবু।
–কেডা রে? আরে গোঁসাই! আবার আইছ?
–আইলাম রাসুবাবু।
–আবার তরোয়ালের খোঁজে নাকি? পরেশ তোমায় কত টাকায় কিনছে কও তো?
–আইজ্ঞা, আমার মতো মাইনষের দাম কী কন?
–তোমারে তো কইয়াই দিছি, টাকার মলম দিয়া আমারে নরম করতে পারব না। টাকা আমি জীবনে মেলা দেখছি।
–আইজ্ঞা, একখান কথার মানে জিগাইতে আইছি।
–কী কথা?
হেইদিন যে কইলেন তরোয়ালখান আপনগো এয়ারলিং–হেই কথাটার মানে কী?
রাসু কিছুক্ষণ বেকুবের মতো চেয়ে থেকে বলল , কইছিলাম নাকি?
–কইছিলেন, পরেশবাবুও কথাটার মানে জানে না।
রাসু মাথা নেড়ে বলল , আমিও জানি না। ব্রাউন সাহেব কইছিল, হেইরেই কইলাম।
কানু হেসে বলল , আমি রামপদরে জিগাইছিলাম। হ্যায় কিন্তু জানে।
–কী জানে?
–এয়ারলিং মানে হইতাছে বংশের স্মারক। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দ্রব্য।
–তাই নাকি?
–আইজ্ঞা।
–তাতে হইল কী?
–কইতাছিলাম, আপনের তো একখান মাইয়া, পোলা নাই। আপনেরটা পাইব কেডা?
–ক্যান কমলি পাবি।
–হেই কথাই কইতে আইলাম। কমলিই যদি পায় তা হইলে তো আর বংশে জিনিসটা থাকব। বেহাতি হইবই।
–তরোয়ালখান লইয়া আর মাথা ঘামাইও না হে গোঁসাই। এখন আস গিয়া। আমার কাম আছে।
–আমি কই কি, তরোয়ালখান দিয়া গিটঠুটা কাইট্যা ফালান।
–তার মানে?
–কমলির বয়স চৌদ্দো গিয়া পনেরোয় পড়ছে। ঠিক কইছি?
–হ, হঠাৎ কমলির বয়স লইয়া কথা ক্যান?
–গিটঠুটা কাটনের লিগ্যা। রামপদ পাত্র ভালো। বছরে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা রোজগার।
–কও কী? পরেশ ঘোষের মতো ছোটলোক যার ভগ্নীপতি তার লগে মাইয়ার বিয়া?
–আইজ্ঞা, পরেশ ঘোষের বংশ খারাপ হইলে কি তার শ্বশুরবাড়িতেও দোষ অর্শায়? আপনে তো আহাম্মক নন, একটু ভাইব্যা দেখেন।
রাসুর মুখটা একটু ঝুলে পড়ল, গলার স্বরটাও নেমে গেল, ফান্দে ফালাইতে আইছ নাকি হে?
–আইজ্ঞা। ফান্দে না ফালাইলে সংসার চলে কেমনে? হল্পলেই হলরে ফান্দে ফালায়। সংসারের নিয়ম।
–দেখো হে, রামপদ পাত্র খারাপ না। কিন্তু তার বাপেও যদি পরেশ ঘোষের বাপের মতো হারামজাদা হয় তা হইলে?
–রামপদর বাপ নাই। বিধবা মা আছে। রামপদ বিয়া টিয়া না করিয়া জীবনটা কাটাইব বইল্যা ঠিক কইরা ফালাইছিল। তারেও ফান্দে ফালাইতে হইছে।
–রাজি আছে?
–আইজ্ঞা, রাজি না হইলে সাহেব যে তারে ত্যাজ্যপুত্র করব।
–নাকি? মাইয়া না দেইখ্যাই রাজি হইল?
–দেখে নাই কে কইল? কমলি ওই জামতলায় এক্কাদোক্কা খেলত্যাছে। লইয়া গিয়া দেখাইয়া দিছি। কী আর কমু, ওইরকম সুন্দরী মাইয়া পছন্দ না হইয়া উপায় কী? রামপদর তো অখন লোল পড়তাছে।
–রামপদ! তারে লইয়া আইছ নাকি?
–আনছি। হ্যায় ডিঙ্গায় বইস্যা আছে। আপনেরে ভয় পায়।
–আরে, আরে, কী কাণ্ড! যাও, যাও, তারে লইয়া আস। এই বাড়ির একটা মান মর্যাদা আছে।
রামপদ এল, ভারী লাজুক মুখ, মুখে রক্তাভাও। আর রাসুর মুখেও আজ অমায়িক হাসি। রামপদরাজি, রাসুরাজি, তলোয়ারও রাজি। চারদিকটায় যেন আজ রাজি–জি ভাব।
কথাবার্তা একরকম পাকাই হয়ে গেল। এমনকি রাসু বিয়েটা মাঘ মাসে পিছিয়ে দিতে চেয়েছিল, রামপদই মৃদু স্বরে বলল , না, অঘ্রানেই হউক।
ফেরার সময়ে রাসু আড়ালে ডেকে বলল , না হে গোঁসাই, তুমি বাহাদুর লোক, এক কোপে দুই গিটই কাটলা। এক গাল হেসে কানু বলল , আইজ্ঞা, আমি বড়লোকের দুঃখ সহ্য করতে পারি না।
সুখদুঃখ
লোকটা সারা দিন তার খেতে কাজ করে। একা-একা সে মাটির সঙ্গে কত ভালোবাসার কথা বলে। আল তুলে জল বেঁধে রাখার সময়ে সে ঠিক যেন এক পিপাসার্তকে জলদানের তৃপ্তি পায়। সে ভালোবাসে গাছগুলিকেও। যারা ফল দেয়, ছায়া দেয়, দূরের মেঘকে টেনে আনে। সে প্রতিটি গাছের সুখদুঃখকে বোধ করার চেষ্টা করে। সে ভালোবাসে তার গৃহপালিতগুলিকেও। সে বোঝে, প্রতি–প্রত্যেকের টান ভালোবাসার ওপর সংসার বেঁচে আছে।
