–আইজ্ঞা।
–আইলানি?
–আইজ্ঞা আইলাম।
–বহ বহ, খবর বার্তা কও।
–খবর বার্তা ভালো নয়। রাসুবাবু ঘাড় কাইত করলেন না।
–কও কী? মাইনকা ঢিপির মইধ্যে পড়লাম নাকি হে গোঁসাই?
–আইজ্ঞা মাইনকা ঢিপি বইলাই তো মনে হয়।
–পাকঘরে একখান চুপি মাইরা দেইখ্যা আসো তো, তাইন পাকঘরে নাকি!
–আইজ্ঞা চুপি মারতে হইব না। এইখান থিক্যাই ছ্যাক ছোঁক শব্দ পাইতেছি।
–তা হইলে নিশ্চিন্তে কথা কওন যায়। রাসুবাবু কয় কী?
–এয়ারলিং মানে জানেন?
–এয়ারলিং? না হে গোঁসাই। ইংরাজি শব্দ নাকি?
–তাই তো মনে হয়। কইলেন, এইটা হইল আমাগো এয়ারলিং। বেচুম ক্যান? এইটা বেচলে তো নিজেরেও বেচন যায়।
–ঘাড়খানা অখনও তেড়াই আছে, না?
–আইজ্ঞা। আমারে তো একরকম খেদাইয়াই দিলেন। কইলেন, পরেশরে গিয়া কইও, তার যে টাকার গমর হইছে হেইটা আমি জানি। কিন্তু টাকা দিয়া কি সব কিনন যায় হে?
–এত বড় কথা?
–আইজ্ঞা, কথা উনি বড়ই কন।
–ফুটানি যায় নাই। আর সব গেছে, ফুটানি যায় নাই।
অন্ধকার চেপে বসেছে চারদিকে। ঘর থেকে একটা লণ্ঠনের আলোর চৌখুপি এসে পড়েছে। উঠোনে। তার আভায় দেখা যাচ্ছে, উঠোনে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে দুটো দিশি কুকুর। উত্তর আর পুবদিকে আরও দু-খানা ঘর। আশেপাশে কচু বন, বাঁশঝাড়। জোনাকি পোকা উড়ছে খুব। মশার শব্দ হচ্ছে। শীতের প্রথম দিককার কুয়াশাও ঘন হয়ে আছে চারদিকে। একটা মাছ ভাজার গন্ধ ভাসছে চারদিকে। পরেশ ঘোষ তার নিবন্ত কোটায় দুটো নিষ্ফল টান দিয়ে একটা হাঁক মারল, বুচি রে, তামুক সাইজ্যা দিয়া যা।
ফ্রক-পরা আট নয় বছরের একটা মেয়ে এসে হুঁকো থেকে কলকেট তুলে নিয়ে গেল। মাছ। ভাজার গন্ধটা বড়ই ভালো লাগছিল কানু গোঁসাইয়ের। সারাদিন ঘুরে তার পেটে এখন উথাল। পাথাল খিদে। বাড়ি ফিরতে এখনও দেড় মাইল পথ। নাকটা তুলে গন্ধটা প্রাণ ভরে শুকছিল সে। বুচি এসে হুঁকোর মাথায় কলকে বসিয়ে গেল।
–তামুক খাইবা গোঁসাই?
–ন, থাউক গা।
–রাসু আমার টাকা দেখত্যাছে, কিন্তু আর কিছু দেখে না ক্যান কও না? প্যাটে গামছা বাইন্ধা, উদয়াস্ত খাইট্যা তবে না দুইটা পয়সার মুখ দেখছি। কেউ কইতে পারব পরেশ ঘোষের ফুটানি আছে?
–আমি কই কী, আপনি নিজে একবার গিয়া খাড়ান। আপনে গিয়া খাড়াইলে রাসুবাবু না কইতে পারবেন না।
পরেশ মাথা নেড়ে বলল , উপায় নাই হে গোঁসাই।
–ক্যান, কাইজ্যা হইছে নাকি?
–কাইজ্যা বলে কাইজ্যা? তার সামনে যাওনের উপায় নাই।
–হইছে কী কইবেন তো?
–শোনবা?
–কইয়া ফ্যালান।
অখন কওন যায়। পুরোনো ঘটনা তো, অখন কইলে দোষ নাই।
পরেশ ঘোষ কিছুক্ষণ তামাকে টান দিল। গুড়ুক গুড়ুক মিষ্টি শব্দের সঙ্গে এসে মিশল প্যাঁচার ডাক। মাছ ভাজার গন্ধটা মিইয়ে গিয়ে জিরা বাটা লঙ্কা আর হলুদের টগবগ করা ঝোলের টাটকা গন্ধটা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। কানু গোঁসাইয়ের পেটের অস্বস্তিটা বাড়ল। এই শীতের মরসুমে মেলা মাছ উঠছে বাজারে। তেলাল সরপুঁটি, ভ্যাদা, ট্যাংরা, কই। একটু ধনেপাতা ছিটিয়ে রাঁধলে অমত। কিন্তু কানু গোঁসাইয়ের ট্যাঁকের জোর নেই। বাড়ি ফিরে চারটি ভাত আর একটু শাকপাত, কচু, ঘেঁচু জুটলেই বহুত। পরেশ ঘোষ আজ কিছু দেবে। দিলে কাল না হয় দুর্গা বলে কিনেই ফেলবে একটু মাছ। গন্ধটা তাকে বড় কাহিল করে ফেলেছে।
–রাসুর বইন চন্দ্রিমার কথা শোনছ?
–খুব শুনছি। কুসারি পাড়ায় শ্রীশদাসের লগে বিয়া হইছে যার।
–হেই। তার লগে আমার একখান সম্বন্ধ আইছিল।
–নাকি?
–সতেরো আঠারো বছর আগেকার কথা। বিয়া পাকা, আশীর্বাদও হইয়া গেছিল, নিমন্ত্রণের চিঠিও বিলি হইয়া গেছে, এমন সময়ে আমার পিতৃদেব একখান কাণ্ড কইরা বইলেন। পাঁচ হাজার টাকা নগদের কথা আছিল, কিন্তু তাইন হঠাৎ বাইক্যা বইস্যা কইলেন, আমাগো দক্ষিণের ঘর ভাইঙ্গা পড়ছে, ঘর না মেরামত করলে পোলা আর বউ থাকব কই? সুতরাং ঘর তোলনের লিগ্যা আরও পাঁচ হাজার লাগব।
–ছিল না?
–পাঁজ হাজার কি ফাইজলামি নাকি হে, গোঁসাই? রাসুর বাপের অবস্থা তখন পড়তি, ঘরে কর্জ কইরাই বিয়া দিতাছিল। গেল বিয়া ভাইঙ্গা।
–ইস রে! চন্দ্রিমা তো শুনছি খুব সুন্দরী।
–আরে হেই লিগ্যাই তো বাবার লগে আমার বনে নাই। বুড়া টাকা–টাকা কইরা দাপাইয়াই মইরা গেল। শ্যাষে কুলতলির এই কুচ্ছিৎটারে আমার গলায় আইন্যা ঝুলাইয়া দিল।
–কী যে কন! বউঠাইন তো লক্ষ্মীপ্রতিমা।
–তোমার মাথা। যেমন রূপ তেমনই গলার জোর। মাথার চুলগুলি কি আমার উইঠ্যা গেল সাধে? এই মাগির লিগ্যা উঠতে–বসতে অশান্তি।
কী যে কন ঘোমশায়? –মাগির গায়ের রংখান দেখছ? লণ্ঠনের কালি, ধলা না হইল, এমন কালাও মানুষ হয়? আর দেখো এই মাগির লিগ্যাই রাসুর পায়ে তেল দিতে হইতাছে।
–বৃত্তান্তখান কী?
–কী লেন, কী দেন, কী বৃত্তান্ত কইতে গেলে রাইত ফুরাইব। সংক্ষেপে কই, আমার শালা ব্রাউন নামে কোন এক সাহেবের লগে নারায়নগঞ্জে স্টিমার কোম্পানি খুলছে। পয়সা লুটতাছে মন্দ না। তবে সাহেবটার বাতিক আছে। গ্রামে গঞ্জে ঘুররা কেবল পুরোনো জিনিস খুইজ্যা বেড়ায়। রাসুর বাড়িতে গিয়াও হানা দিচ্ছিল। পুরোনো তরোয়ালখান দেইখ্যা খুব পছন্দ। শুনছি এক হাজার টাকায় কিনতেও চাইছিল। রাসু দেয় নাই।
–তাই কেন?
–খাড়াও, কথা অখনও শেষ হয় নাই।
