–তুমি দরজাটা খুলে বেরিয়ে এসো বাবা। বেরিয়ে এসো।
–আমি বেরিয়ে যেতে পারছি না বাপ্পা। সাপটা দরজার কাছেই। আমি দরজাটা খুলতে পারছি না। নিস্তেজ গলায় বাবা বলে।
–তুমি বেরিয়ে এসো বাবা। বেরিয়ে এসো। শুধু একথাটুকুই বলতে পারল বাপ্পা, ‘তুমি বেরিয়ে এসো।’
–’আঃ বাপ্পা, আমি কেমন করে বেরোব–’ দরজার ওপাশে যেন অনেক দূর থেকে বাবার গলা শোনা গেল, ‘এ-ঘরে কিছুই নেই! তুমি আমাকে একটা কিছু দাও। একটা লাঠি কিংবা ওই ধরনের কিছু।’
বাপ্পা ছুটে জানালাটার কাছে এল। কাচভাঙা ছোট্ট জানালাটার ওপর উপুড় হয়ে পড়ল প্রায়। ‘বাবা মরে যাচ্ছে। মরে যাচ্ছে’–বাপ্পা বলে।
ঘরের ভিতরটা অন্ধকার। বাপ্পা চোখ বড়-বড় করে তাকাল।
–কোথায় তুমি বাবা? কাঁদতে থাকে বাপ্পা!
–এই যে বাপ্পা। বাবা সিমেন্টের তৈরি বেদির মতো উনুনটার কাছ থেকে জানালার দিকে তাকাল। বাবার চোখ দুটো বড়-বড়। বাবা ভয় পেয়েছে।
–বাপ্পা দেখতে পায় উনুনটার ওপরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে রেনি। বাবার হাতের চাবুকটা স্থির। বাবা এতটুকু নড়ছে না।
–বাপ্পা, আমি নড়তে পারছি না। তুমি দাঁড়িয়ে থেকো না। একটা কিছু এনে আমার হাতে দাও। বাবার গলাটা কাঁপছে।
সাপটা দরজার কাছে। সমস্ত শরীরটা দুটো বাঁক খেয়ে গোল হয়ে রয়েছে। ফণাটা উঁচু করে আস্তে-আস্তে দুলছে সাপটা। ফণাটা এত উঁচুতে যে সেটা অনায়াসে তার বাবার বুকের কাছে বোধহয় ছোবল দিতে পারে। বাবা পিছন দিকে হাত বাড়িয়ে কিছু খুঁজছে। সেই হাতদুটো থরথর করে কাঁপে। বাপ্পা দেখে।
‘বাপ্পা।’ বাবা স্থির দৃষ্টিতে সাপটাকে দেখছে।
সাপটা একটু ঝাঁকানি দিয়ে পিছু হটে গেল। মাথাটা পিছন দিকে হেলাল।
‘বাপ্পা দাঁড়িয়ে থেকো না,’ বাবা চাপা গলায় বলে।
সাপটা চাবুকের মতো ছিটতে লাফিয়ে পড়ল সামনের দিকে। বাবা ডান দিকে সরে গেল। সরতে গিয়ে উনুনটার ওপর টাল খেয়ে পড়ে গেল বাবা। সাপটা সরে যাওয়ার আগেই বাবা হামাগুড়ি দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
রেনির দাঁতগুলো বিশ্রীভাবে বেরিয়ে এল। ঘ্যাক করে একটা অদ্ভুত শব্দ করে রেনি। দেয়ালের দিকে সরে যায়। তারপর সেখানেই দাঁড়িয়ে থেকে গোঁ–গোঁ করতে থাকে। সাপটা একটা দোল খেয়ে সোজা হয়। আবার দরজার দিকে সরে যেতে থাকে। বাবার কপালের কাছে। দুটো শিরা জোঁকের মতো ফুলে আছে। চোখ দুটো বড়-বড়। ‘বাপ্পা, দাঁড়িয়ে থেকো না’ বাবা বলে। চকচকে আঁশ আর হলদে ডোরাকাটা সাপটা তার বাবার দিকে ফেরে। উঁচু ফণাটা দুলতে থাকে।
বাপ্পা চোখ বোজে, ‘আমি নড়তে পারছি না বাবা, নড়তে পারছি না। আমার হাত-পা গুলো অবশ।’ বাপ্পা ফিসফিস করে বলে। জানলার কাছে থেকে সরে আসে বাপ্পা। দাঁতে–দাঁত চাপে। কোমরটা অবশ। দুটো হাত মুঠো পাকিয়ে ছুটতে শুরু করে বাপ্পা। ‘একটা লাঠি–একটা লাঠি একটা লাঠি’ বাপ্পা যন্ত্রের মতো বলতে থাকে। আর ছুটতে থাকে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে তার।
বাপ্পা দেখে ছুটে বাগানটা পার হতে অনেক সময় লেগে যাবে। বাড়ির ভিতর থেকে লাঠি আনতে। বাপ্পা থেমে বাঁ-দিকে ছোটে। কিন্তু কোথাও একটা লাঠি নেই। কিছু খুঁজে পায় না বাপ্পা। জিওল গাছটার তলায় এসে দাঁড়ায় বাপ্পা। এখন হাঁফাতে-হাঁফাতে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। নিমগাছটার সঙ্গে ঠেস দিয়ে একটা মস্ত বড় ঘুণে ধরা বাঁশ দাঁড় করানো। বাপ্পা এক লাফে নিমগাছটার কাছে চলে আসে।
বাঁশটা নিয়ে আবার জানলার কাছে আসে বাপ্পা। বাবা এখন উনুনটার ওপর দাঁড়িয়ে। রেনি গোঁ–গোঁ করে দেওয়ালের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। উঃ বাপ্পা’–বাবা চিষ্কার করে বলে–’বাঁশ দিয়ে কী হবে? বাঁশ নয়। একটা লাঠি এনে দাও। তাড়াতাড়ি বাপ্পা। তাড়াতাড়ি।’ বাঁশটা ফেলে দিয়ে বাপ্পা পা বাড়ায়। কিন্তু পা অবশ। একদম নড়তে পারছে না সে। তার বুক মাথা গলা জুড়ে একটা কল চলবার মতো শব্দ। সাপটা পিছলে–পিছলে এগিয়ে আসে। ফণাটা বাতাসে দুলে চাবুকের শব্দ করে।
‘বাপ্পা, দেরি কোরো না, দেরি কোরো না।’ বাবা বলে। অস্পষ্টভাবে বাপ্পা দেখতে পায় বাবা রেনির বকলশটা চেপে ধরে ঠেলে রেনিকে সামনে এগিয়ে দিচ্ছে।
অন্ধের মতো বাপ্পা পা বাড়ায়। তার গাল বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। চোখে কিছু দেখছে সে। চোখ দুটো জলে ভরা। বাড়াতে গিয়ে বাপ্পা পড়ে যেতে থাকে। ‘সাপ, সাপ, সা–আ–প’ চিৎকার করতে-করতে বাপ্পা ছোটে। কোথায় ছুটে যাচ্ছে বুঝতে পারবার আগেই চত্বরটার ওপর তার ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরটা টলে পড়ে যেতে থাকে।
.
যখন অনেক বড় হয়েছিল বাপ্পা তখন সে তার ছেলেমেয়েদের কাছে কিংবা নাতি–নাতনিদের কাছে ফিরে-ফিরে এই গল্পটাই বলত। কিন্তু যখন বলত বাপ্পা, তখন গল্পটার কোনও-কোনও অংশকে সে ঢাকা দিত। ঢাকা দিত তার কারণ, এই স্মৃতির কোনও-কোনও অংশকে সে বুঝতে পারত না। এই বুঝতে না পারা অংশগুলো ছিল ছোট্ট–ছোট্ট, অস্পষ্ট, অন্ধকার গর্তের মতো। এই গর্তে কী আছে, কোন অদ্ভুত রহস্য তা বাপ্পা বুঝতে পারত না। তাই গল্পটা বলতে-বলতে মাঝে মাঝে থামত সে। অনেক কিছুই তো আমরা ঢাকা দিই, ঢাকতে চাই–ভাবত বাপ্পা। ভাবতে ভাবতে অদ্ভুতভাবে একটু হাসত সে। বুকের ভিতরে ছলাৎছলাৎ রক্তের শব্দ শুনত। তীব্র একটা উত্তেজনাকে অনুভব করত দেহের ভিতরে। তারপর থেমে–থাকা গল্পটাকে শুরু করবার জন্য মনে-মনে প্রস্তুত হত। মনে-মনেই সেই অদ্ভুত রহস্যময় অন্ধকার গর্তগুলোকে লাফ দিয়ে পেরিয়ে আসত বাপ্পা।
সাহেবের তলোয়ার
গোঁসাইনি?
