সাপটা ফণা তুলেছিল। ফণাটা তুলে যেন তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেই অল্প-অল্প পিছিয়ে যেতে থাকে সাপটা। ফণাটাকে দুলিয়ে ঝাঁকানি দিয়ে–দিয়ে সাপটা পিছিয়ে যেতে থাকে।
এবার বাপ্পা হাসে। সাপটা ভয় পেয়েছে।
একটা ঢিল তুলে নিয়ে বাপ্পা হাতটা দোলাতে থাকে। সাপটাকে আরও ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য বলে–’এই হ্যাট–হ্যাট। যাঃ’–
সাপটা একটু করে পেছোয়।
বাপ্পা একটু করে এগোয়।
সাপটা মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে থাকে। ঘাসের ওপর তেমনি আঁকাবাঁকা সরু রেখা উঠল।
বাপ্পা এগোতে থাকে।
বাবুর্চিখানার সামনে ছোট্ট বাঁধানো চত্বরটায় আবার মুখ তোলে সাপটা।
–হ্যাট, হ্যাট। যাঃ—
ধীরে-ধীরে চত্বরটা পেরিয়ে যায় সাপটা। মজা লাগে বাপ্পার। কেন যেন হাসি পায়।
সাপটা এগোচ্ছে।
বাবুর্চিখানার দরজাটা খোলা। সাপটা একবার মাথা তোলে।
–হ্যাট, হাট–বাপ্পা বলে। এখন বুকের ভিতর সেই ছলাৎছলাৎ শব্দটা নেই। কেমন যেন উত্তেজনা বোধ করে বাপ্পা। তার কান দুটো গরম এখন।
পকেটে হাত গুঁজে বাপ্পা দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে দেখতে পায় সাপটা আস্তে-আস্তে বাবুর্চিখানার চৌকাঠ ডিঙিয়ে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে।
এবার ফিরে আসে বাপ্পা। ফিরে সামনের বাগানের দিকে চলতে থাকে। পা দুটো ঝিনঝিন করছে হাঁটুর কাছে ছড়ে যাওয়া জায়গাটা লাল পুঁতির দানার মতো রক্ত জমে আছে। হাতের তেলো দুটো জ্বলছে। এতক্ষণ এই ছড়ে যাওয়া জায়গাগুলো টের পাচ্ছিল না বাপ্পা। এখন তার চলতে কষ্ট হচ্ছে। হাঁটু দুটোয় ব্যথা, হাতের তেলোয় জ্বলুনি।
সামনের বাগানের গেটটার কাছে এসে দাঁড়াল সে। অনেক দূরে মস্ত উদোম খোলা মাঠটার ওপর বাবাকে দেখতে পায় বাপ্পা। মস্ত বড় আকাশ আর ভোলা উদোম মাঠটার মাঝখানে বাবাকে ছোট্ট মতো দেখায়। বাবা রেনির গলার বকলশটা ধরে তাকে টেনে নিয়ে আসছে।
বাবা খুব কাছ এসে পড়ার আগেই বাপ্পা গাঁদা গাছগুলোর কাছে এসে দাঁড়ায়। গাঁদা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে হাঁটুর ওপর ঘষতে থাকে।
গেটের কাছে বাবার গলা শোনা যায় : ‘অবাধ্য–অবাধ্য কুকুর! চাবুক দিয়ে শায়েস্তা করতে হয় তোমাকে।’ বাবা বাগানের মধ্যে দিয়ে রেনিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে।
–বাপ্পা, বাপ্পা–আ। বাবা ডাকে।
বাপ্পা দৌড়ে বাবার কাছে চলে আসে।
বাবা তার দিকে তাকায়। বাবার চোয়ালের ঢিপি দুটো এখন উঁচু। মুখটা লাল টক–টক করছে।
–কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ? বাবা বলে।
–এখানেই।
তার হাঁটুর দিকে তাকায় বাবা। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে ‘ওগুলো কী? অ্যাাঁ। কেটে গেল কেমন করে?’
–আমি পড়ে গিয়েছিলাম।
বাবা আর কিছু বলে না। শুধু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আবার রেনিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। বাবা এখন পেছন দিকের বাগানে যাবে।
বাবা, আমি কি আসব? বাপ্পা চেঁচিয়ে জিগ্যেস করে।
বাবা তার কথা শুনতে পায় না। রেনিকে বকতে–বকতে বাবা এগিয়ে যাচ্ছে। এবং তারপর বাবা আর রেনি বাড়ির পিছন দিকটায় চলে যায়।
নির্জন শুকনো ম্যাড়ম্যাড়ে বাগানটায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে বাপ্পা। সাপটা–সাপটা–ও ঘরেই আছে–ভাবে বাপ্পা। তার বাবা এখন ও ঘরেই যাবে।
–বাবা–প্রাণপণে চেঁচিয়ে ডাকে বাপ্পা, তারপর ছুটতে শুরু করে। বুকের ভিতরে ছলাৎ ছলাৎ শব্দটা শুনতে পায় সে। ‘বাবা’–প্রাণপণে ছুটতে থাকে বাপ্পা। ছুটে এসে জামগাছটার তলায় দাঁড়ায়। বাবুর্চিখানার চত্বরে বাবা আর রেনি। বাবা রেনিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে। রেনি যাবে না। রেনি চারটে পা ছড়িয়ে দিয়ে জেদি ছেলের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। বাবার মুখটা ভয়ঙ্কর লাল। চোয়ালের টিপি দুটো খুব উঁচু।
–বাবা প্রায় ফিসফিস করে বলে বাপ্পা। বাবা রেনিকে দরজার কাছে নিয়ে গেল। বাবা তাকে দেখতে পেল, চেঁচিয়ে বলল –’বাপ্পা, এখন এখানে এসো না, চলে যাও।’
তবু বাপ্পা দাঁড়িয়ে থাকে। তার পা দুটো থরথর করে কাঁপে। ঠোঁট দুটো শুকনো, গলাটা শুকনো। প্রাণপণে চেঁচাতে ইচ্ছে করল বাপ্পার। সে বলতে চাইল–’বাবা, বাবা গো, ও-ঘরে একটা সাপ। মস্ত বড় ভয়ঙ্কর একটা সাপ; এখন ও-ঘরে তুমি যেও না, যেও না।’ কিন্তু সে বলল না। ভাবল–’থাক। দেখাই যাক কী হয়।’
‘একটা ভীষণ মজা হবে এক্ষুনি। কী মজা–সাপটা ও-ঘরে আর বাবাও এখন ও-ঘরে।’ ভাবে বাপ্পা। তার সমস্ত শরীরটা উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে।
বাবা ভিতর থেকে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। সেই ‘দড়াম’ শব্দটা বাপ্পাকে যেন ধাক্কা দিল। তার প্রায় অবশ হাঁটু দুটো ভেঙে সে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। জামগাছটার গুড়িতে নিজের হাতটাকে চেপে ধরে সে। ‘আমি বলে দিইনি, বলে দিইনি, ও-ঘরে কী আছে। আমি বলে দিইনি, বলে দিইনি–বলিনি’–যন্ত্রের মতো বাপ্পা এই কথাটাই বারবার বলতে লাগল। চাবুকের কি শিক শব্দটা শুনতে পেল সে। বাসনপত্রের কর্কশ শব্দের মতো শব্দ করে রেনি কান্না শুরু করল।
বাপ্পা কাঠ।
চাবুকের শব্দটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। রেনির কান্নাও।
‘বাবা’ চিৎকার করল, বাপ্পা, ‘বাবা, বাবা গো। বাবা, বাবা’–প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল বাপ্পা। লম্বা ঘাসগুলোয় তার পা আটকে যাচ্ছিল। পড়তে–পড়তেও ছুটতে লাগল বাপ্পা। বাঁধানো চত্বরটা পার হয়ে দরজার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল সে, ‘বাবা, বাবা। আমি বাপ্পা।’
‘বাপ্পা’–বাবার গলা শোনা গেল। স্থির গম্ভীর গলা, ‘বাপ্পা, এ-ঘরে একটা মস্ত বড় বিষাক্ত সাপ।’
