–কী হয়েছে? জুতোটা ঘষছিলে কেন? বাবা খুব জোর গলায় বলে।
রেগে গেলে বাবা এভাবেই চিৎকার করে। অবাধ্য রেনিকে বাবা এভাবেই চেঁচিয়ে ডাকে। বাবার দুটো চোয়াল শক্ত হয়ে ঢিপির মতো উঁচু হয়।
অস্পষ্টভাবে চাবুকে বাতাস কাটবার একটা শব্দ বাপ্পার কানের কাছে বাজতে থাকে।
–একটা কাঁকর আমার জুতোর মধ্যে ঢুকে গেছে।
–কাঁকর! বাবার জ দুটো জোড়া লাগে।
এবার বাবা তার হাতটা ছেড়ে দেয়।
–কাঁকরটা বের করে ফেলো।
বাপ্পা নীচু হয়ে হাঁটু ভেঙে লাল কাঁকর ছড়ানো পথের ওপর বসে জুতোটা খুলতে যাচ্ছিল।
বাবা একটা হাত তার দিকে বাড়িয়ে দেয়, ‘অসভ্য, নোংরা, জানোয়ার কোথাকার।’ বাবা বলে। বাড়ানো হাতটা দিয়ে তার ঘাড়ের কাছে শার্টের কলারটা ধরে তাকে আবার দাঁড় করিয়ে দিল বাবা।
–ধুলোর ওপর বসতে তোমার ঘেন্না হল না। দাঁতে–দাঁত চেপে বাবা বলে, ‘অসভ্য। ছোটলোকদের ছেলের সঙ্গে মিশলে এরকমই হয়।’
আপন মনে মাথা নাড়ে বাবা, ‘নাঃ, তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। তোমার ওপর আমার কোনও আশাই নেই। তুমি নষ্ট হয়ে যাবে, একদম নষ্ট হয়ে যাবে।’
বাপ্পা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এখন সে বাবাকে দেখছিল না। বাবার কথাও শুনছিল না। সে দেখতে পেল ফড়িংটা কেয়া ঝোঁপের পাশ দিয়ে উড়ে কম্পাউন্ডের বেড়ার ওপর দিয়ে বাইরে চলে গেল। রেনি দৌড়ে বেড়াটার ধারে গেল।
রেনি এখন বাইরে যাওয়ার একটা পথ খুঁজছে।
বাপ্পা তাকিয়েই রইল।
রেনি অস্পষ্ট শব্দ করল। বাবা ফিরে তাকাল।
রেনি এদিক-ওদিক ছুটে একটা পথ খুঁজছে। বাপ্পা তাকিয়ে রইল।
বাবা ডাকল, ‘রেনি।’ চোখের পলক না ফেলতেই তারের আর মেহেদি পাতার বেড়ার ভিতরে ছোট একটা গর্তের মধ্যে রেনির বাদামি লম্বা শরীরটা ঢুকে গেল।
রেনি এখন ওপাশে।
বাবা ডাকল, ‘রে–ই–নি–ই–ই।’
ছোট একটা নিশ্বাস ফেলল বাপ্পা। এতক্ষণ ধরে যে এইটেই চাইছিল।
বাবার আঙুলগুলো পাক খেল, জোঁকের মতো জড়িয়ে গেল। বাবার মুখটা লাল। চোয়ালের ওপর দুটো ঢিপি।
বাবা গেটের কাছে এগিয়ে গেল।
আবার ডাকল, ‘রেই–নি–ই–ই।’
শব্দটা শিস দেওয়ার শব্দের মতো তীব্রতর হল। তারপর অনেকগুলো তিরের মতো বাতাস চিরে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু রেনি ফিরল না। রেনির বাদামি রঙের হিলহিলে লম্বা শরীরটা দুলতে দুলতে দূরে চলে যেতে লাগল।
বাবা ‘গেটটা খুলে বাপ্পার দিকে ফিরল, ‘তুমি এখানেই থেকো। বাড়ির বাইরে যাবে না।’ বাপ্পা মাথা নাড়ল।
বাবা গেটটা বন্ধ করে রাস্তা পার হয়। জোরে–জোরে হাঁটতে থাকে মাঠটার মধ্যে। রেনি এখন ছুটছে। সহজে ধরা দেবে না রেনি–বাপ্পা জানে।
বাপ্পা মাঠটার দিকে একবার তাকাল, তারপর শুকনো ঘাসফুলের বেড়া ডিঙিয়ে এক দৌড়ে বাড়ির পিছন দিকটায় চলে এল। এখানে গাছগুলো বড়-বড়। একবার সমশেরের বাড়ি গেলে হয় –ভাবল বাপ্পা। কিন্তু সামনের দিকে গেট পেরোতে গেলে খোলা মাঠ থেকে বাবা তাকে দেখে ফেলতে পারে।
ভাবতে-ভাবতে জামগাছটার তলায় চলে এল বাপ্পা। খুব নির্জন এদিকটা। কেউ নেই। কম্পাউন্ডের পাশ দিয়ে টেলিগ্রাফের তার চলে গেছে।
বাঁ-হাতটা কবজির কাছে এখনও লাল। যেন কোনও সাড় নেই হাতে। হাতটা পুরোপুরি অবশ হয়ে গেছে কি না দেখবার জন্যই বাপ্পা বাঁ-হাত দিয়ে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নেয়। চারদিকে তাকায় বাপ্পা। কেউ নেই।
সবচেয়ে কাছে যে টেলিগ্রাফের পোস্টটা ছিল বাপ্পা সেটার দিকে নুড়িটা ছুঁড়ে মারে। নুড়িটা অনেক দূর দিয়ে চলে গেল।
বাঁ-হাতের কজিটাতে তেমন জোর পাচ্ছে না সে। সে আর সমশের প্রায়ই এইখানে দাঁড়িয়ে ওই পোস্টটার গায়ে ঢিল মারে। সমশেরের চেয়ে আমি ভালো পারি’–এই ভেবে যেখানে জামগাছের তলায় নুড়িগুলো জড়ো করে দেখত তারা সেদিকে এগোয়।
নুড়ি তোলবার জন্যে হাত বাড়ায় বাপ্পা।
গাছের তলায় ঘাসগুলো লম্বা, ঘন সবুজ। নুড়িগুলো একপাশে জড়ো করা। বাপ্পা নীচু হতে গিয়ে ঝুঁকতেই দেখতে পেল জড়ো করা নুড়িগুলোর পাশে ঘাসগুলো সরু একটা রেখার মতো দুপাশে সরে যাচ্ছে। ‘সাপ’ বাপ্পা ফিসফিস করে বলল ,–’সাপ। একটা সাপ।’ তার প্রসারিত হাতটা ঠান্ডা।
বাপ্পা স্থির হয়ে থাকে। খুব স্বচ্ছন্দ গতিতে কালো সাপটা এগিয়ে এসে পাথরগুলোর কাছে থামল। চওড়া মস্ত বড় ফণাটা ভেসে উঠল ঘাসের ওপর। আবার ডুব দিল।
বাপ্পা পিছিয়ে আসবার জন্য একটা পা আলগা করল।
সমস্ত শরীরে ঢেউ তুলে, যেন তেল মাখানো কোনও জায়গার ওপর চলছে এমনি পিচ্ছিল গতিতে সাপটা সেই পাথরের স্কুপের ওপর উঠল। চকচকে আঁশগুলোর ওপর হলদে রঙের আলপনা।
বাপ্পা পেছন দিকে একটা প্রকাণ্ড লাফ দিল। ঠিক লাফ নয়, যেন কেউ তাকে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
মাটির ওপর পড়ে গেল বাপ্পা। সাপটা এখনও পাথরগুলোর ওপর মুখ তুলে। সেই মুখ থেকে পেট পর্যন্ত ছাই–রঙা।
হামাগুড়ি দিয়ে বাপ্পা সরে যেতে থাকে। খুব তাড়াতাড়ি সরে আসবার জন্যেই মাটিতে ছোট্ট পাথরের টুকরো আর বালিতে তার হাঁটু আর হাতের তেলোছড়ে যেতে থাকে।
অনেকটা দূর চলে এসে বাপ্পা সোজা হয়ে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে আবার দৌড় দিয়ে আরও খানিকটা পিছিয়ে এল বাপ্পা। খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে করে বাপ্পার। দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বুকের ভিতর ছলাৎছলাৎ রক্তের শব্দ শোনে।
