বাপ্পা সিঁড়িগুলোর দিকে তাকাল। ছোট্ট খোলা বারান্দায় এখন রোদ। ঢাকা–না-দেওয়া রং চটে যাওয়া কয়েকটা চেয়ার–টেবিল এলোমেলোভাবে রেখে দেওয়া। রাত্রিবেলা অন্ধকারে বারান্দায় আসতে গেলে প্রায়ই কেউ-না-কেউ ওই চেয়ার টেবিলগুলোর সঙ্গে ধাক্কা খায়। কেন যে ওগুলোকে সাজিয়ে রাখা হয় না,বাপ্পা ভাবে। বারান্দায় দুটো দরজা হাট করে খোলা। এখন বাগানের রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতরগুলো অন্ধকার মনে হচ্ছে। কিছু দেখা যাচ্ছে না। দুটো দরজা। একটা ড্রয়িংরুমের, অন্যটা শোওয়ার ঘরের। ঘরে আলো জ্বললে এখান থেকেই স্পষ্ট মাকে দেখতে পেত বাপ্পা।
কম্পাউডের ওপাশে মরা আমগাছটার ডালে বসে অনেকগুলো কাক। বিচ্ছিরি কালো অনেকগুলো কাক মরা আমগাছটার ডালে। অনেক–অনেকগুলো। ক’টা? বাপ্পা গুনতে চাইল। এক, দুই, তিন, চার…
কিন্তু চেষ্টা করেও অন্যমনস্ক হতে পারল না সে! বাবার মুঠোয় ধরে থাকা বাঁ-হাতের কবজিটা এখন প্রায় অবশ। ইচ্ছে করে খুব জোরের সঙ্গে ঝাঁঝিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নেয় কিংবা চিৎকার করে বলে, ‘আমার হাতটা ছেড়ে দাও তুমি।’
কিন্তু বাপ্পা কখনও তা বলে না। লিকলিকে সরু কালো একটা চাবুক আছে বাবার। বাড়ির পেছন দিকে কম্পাউন্ডের শেষে খালি বাবুর্চিখানার দেওয়ালে টাঙানো থাকে চাবুকটা। ঘরটা রেনির, চাবুকটাও রেনির জন্যেই। মাঝে-মাঝে যখন কথা শুনতে চায় না রেনি, ডাকলেও কাছে। আছে না তখন বাপ্পা দেখেছে বাবা রেনির গলার বকলশটা ধরে হিড়হিড় করে টানতে-টানতে নিয়ে যাচ্ছে বাবুর্চিখানার দিকে। তারপর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। তারা কেউ কাছে থাকলে বাবা বলে, ‘তোমরা কেউ এসো না এদিকে।’ তারা কেউ কাছে যায় না কিন্তু এত দূর থেকেও চাবুকের শিক–শিক শব্দটা সে শুনেছে। বাসনপত্র মেঝেতে ফেলে দিলে যেমন হয় তেমনি কর্কশ বিকট একটা চিৎকার করে রেনি কাঁদতে থাকে।
তখন বাপ্পাও কাঁদতে থাকে ভিতরে ভিতরে। তার সমস্ত শরীরটা কাঠ হয়ে থাকে। ‘গেটটা ডিঙিয়ে অনেক দূরে চলে যেতে-যেতে চিৎকার করে বলে : ‘আমি কক্ষনো–কক্ষনো এখানে থাকব না।’
ফিরে-ফিরে বাঁ-হাতের কজিটাকেই মনে পড়ল বাপ্পার। কজিটা অবশ হয়ে–হয়ে এখন ছিঁড়ে যেতে চাইছে। বাবানীচু হয়ে গাছের গোড়া দেখছে। সে এক-পাও নড়তে পারছে না। বাপ্পা জানে বাবা তাকে যেভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছে সেভাবেই তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কখনও সে
বাবার অবাধ্য হয় না। অবাধ্য হওয়ার কথা মনে হলেই চাবুকে বাতাস কাটবার সেই অদ্ভুত শব্দটা তার কানের কাছে বাজতে থাকে। বুকের ভিতরটা ছলাৎছলাৎ করতে থাকে। আর সে তখন খুব শান্ত হয়ে যায়। খুব শান্ত হয়ে থাকে বলেই মাঝে-মাঝে বাবা দুই হাতের মধ্যে তার মাথাটা চেপে ধরে বলে–’কখনও তুমি আবার অবাধ্য হও না, তাই না! এই তো আমি চাই। খুব শান্ত, সংযত, ভদ্র হতে চেষ্টা করো।’
.
‘কচু! কচু’ বাপ্পা মনে-মনে বলল : ‘মোটেই আমি শান্ত হতে চাই না, মোটেই না।’ পা দুটো ঝিনঝিন করছে বাপ্পার। সেঁও পিঁপড়ে কামড়ানোর মতো একটা যন্ত্রণা হাঁটুর কাছে, গোঁড়ালিতে। বাঁ-হাতটা এখন অবশ। কী ব্যথা হাতটায়। আঙুলগুলো আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না।
বাপ্পা এখন রেনিকে দেখছিল। রেনি পথ থেকে নেমে বাগানের উত্তরে কোণটার কাছে চলে গেছে। একটা গঙ্গাফড়িং রেনির নাকের ডগায় উড়ছে। আর সেই ফড়িংটাকে তাড়া করে ঝোঁপঝাড়গুলোর ভিতর দিয়ে এঁকে–এঁকে বেঁকে সরে যাচ্ছে।
ফড়িংটাকে ধরবার জন্যে রেনি লাফিয়ে ওঠে। বাপ্পা তাকিয়ে থাকে। রেনির লম্বা শরীরটা বাতাসে ঢেউ খেয়ে নিঃশব্দে মাটির ওপর পড়ে। ফড়িংটা এক ঝটকায় অনেকটা ওপরে উঠে গেছে।
রেনি লাফিয়ে ওঠে আবার। ফড়িংটা উড়তে–উড়তে উত্তর কোণ থেকে বাগানের বেড়ার কাছে কেয়া ঝোঁপটার পাশে সরে যাচ্ছে।
রেনি লাফাচ্ছে, দৌড়াচ্ছে সরে যাচ্ছে। ডিগবাজি খাওয়ার মতো ভঙ্গি করে মাটির ওপর গড়াগড়ি দিচ্ছে।
ফড়িংটা লাফিয়ে উঠল। ফড়িংটা যেন রেনির সঙ্গে খেলছে। বাপ্পা তার পা দুটো সামান্য নাড়ল। ডান পা–টা বাড়িয়ে দিল। জুতোর ‘হিলটা’ পথের কর্কশ কাঁকরের ওপর ঘষতে লাগল আস্তে-আস্তে! খুব মৃদু সাইকেলের ‘চেন’ ছাড়বার মতো কিরকির কিরকির একটা শব্দ হতে লাগল।
বাপ্পা পা–টা জোরে চেপে ধরে পথের ওপর। জুতোটা ঘষতে থাকে। জুতোর তলায় মিহি ফুরফুরে কাঁকরগুলো গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। বাপ্পার ইচ্ছে করছিল কাঁকরের ওপর ঘষে–ঘষে হিলটা ক্ষয় করে ফেলে তারপর জুতোজোড়া পা থেকে খুলে টান মেরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
রেনি এখন কেয়া ঝোঁপটার পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ফড়িংটা ওর মাথার অনেকটা ওপরে। রেনি ফড়িংটাকে দেখছে। পাতা ঝরে যাওয়া বিশ্রী শুকনো কুচ্ছিত বাগানটার সঙ্গে রেনির গায়ের বাদামি রংটা মিশে আছে।
রেনি পিছনের পা দুটো ভাঙল। ল্যাজটা নামালো। সামনের পায়ে অল্প একটু ভাঁজ। এক্ষুনি। লাফ দেবে রেনি!
ফড়িংটা দূরে সরে যাচ্ছে।
রেনি লাফ দেবে।
জুতোর ‘হিলটা মাটিতে জোরে–জোরে ঠোকে বাপ্পা।
‘আঃ বাপ্পা,’ বাবা সোজা হয়ে দাঁড়াল, ‘এক মিনিট–এক মিনিটও তুমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারো না!’
তার হাতটা ধরে একটা ঝাঁকুনি দেয় বাবা। বাপ্পা টাল খেয়ে পড়ে যেতে-যেতে বাবার হাতটা চেপে ধরে আবার দাঁড়িয়ে পড়ল।
